× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হাদির মৃত্যু

শোক আজ উদ্বেগে বদলে যাচ্ছে

ড. তানভীর মুশতাফী

প্রকাশ : ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৪০ পিএম

শোক আজ উদ্বেগে বদলে যাচ্ছে

বৃহস্পতিবার রাতের খবরটা খুব দ্রুতই একটা ব্যক্তিগত শোককে জাতীয় অস্থিরতায় বদলে দিয়েছে। ঢাকার বাতাসে আজ এক ধরনের টান টান অনুভূতি, অনিশ্চয়তা, ক্ষোভ, আর ভয় একসঙ্গে ঘুরছে। ‘ওসমান হাদি’ এখন কেবল একজন ব্যক্তি নন; অনেকের চোখে তিনি একটা সময়ের প্রতীক, একটা প্রজন্মের আশা-হতাশার নাম। তার মৃত্যুর পর যেসব প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তাতে বোঝা যায়, ঘটনাটা শুধু একজনের মৃত্যু নয়, বরং দীর্ঘদিন জমে থাকা সামাজিক-রাজনৈতিক চাপের ওপর একটা তীব্র আঘাত।

তবে শুরুতেই একটা কথা খুব পরিষ্কার রাখা দরকার। এই মুহূর্তে আবেগ যতই প্রবল হোক, আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, কারণ তথ্য ও গুজব পাশাপাশি দৌড়ায়। দায়িত্বশীল লেখা মানে কাউকে দোষারোপ না করে, যাচাইযোগ্য তথ্য, প্রেক্ষাপট, আর মানুষের বাস্তব অনুভূতির জায়গা বোঝা। সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, তিনি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার সময় মারা যান। এই মৃত্যু ঘিরে দেশজুড়ে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, এমনকি কিছু জায়গায় অগ্নিসংযোগও হয়েছে বলে প্রতিবেদন এসেছে। তাহলে প্রশ্নটা থাকে, কেন এই মৃত্যু দেশকে এত গভীরভাবে নাড়িয়ে দিল?

প্রথমত. এটি বিশ্বাসের সংকটকে সামনে এনে দিয়েছে। যখন মানুষ মনে করে ‘সত্যটা জানা যাবে না’, ‘বিচার হবে না’, বা ‘ক্ষমতাবানরা দায় এড়াবে’, তখন একটা মৃত্যুও রাষ্ট্র-সমাজের ওপর অনাস্থার রায়ের মতো নেমে আসে। হাদির মৃত্যু নিয়েও তদন্ত ও বিচার নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা, ভয়, সন্দেহ একসঙ্গে কাজ করছে। অন্তর্বর্তী প্রশাসন তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় শোক পালনের কথাও এসেছে। কিন্তু বাস্তবে মানুষ দেখতে চায় দ্রুত, স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া।

দ্বিতীয়ত. তরুণদের রাজনৈতিক স্মৃতি এখনও ‘খোলা ক্ষত’। বাংলাদেশে ছাত্র-রাজনীতি এবং ছাত্র-আন্দোলনের ইতিহাস খুব ভারী। আমাদের অনেক অর্জন, অনেক রক্তক্ষয়, অনেক হতাশা এই ইতিহাসের ভেতর। সাম্প্রতিক সময়েও ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল এক বড় বাঁক, যেখানে তরুণরা শুধু দাবি তোলেনি, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে নতুন গতি দিয়েছিল।

এখানে আমি বিশেষভাবে বলব, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরাও ওই সময় দৃশ্যমান ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। শুধু ছাত্ররা নয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বহু শিক্ষকও একসময় প্রকাশ্যে সংহতি জানিয়েছিলেন, যা দেশের উচ্চশিক্ষা পরিসরে একটা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল। এই বাস্তবতা মনে রাখলে বোঝা যায়, হাদির মৃত্যু তরুণদের কাছে ‘আরেকটি রাজনৈতিক ঘটনা’ নয়; এটা তাদের সাম্প্রতিক স্মৃতি, রাস্তায় নামা, ভয়কে জয় করা, বন্ধুকে আহত হতে দেখা, এ সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই প্রতিক্রিয়াটা তীব্র।

তৃতীয়ত. এই মুহূর্তে সমাজ ভীষণভাবে ‘পোলারাইজড’। একদিকে ক্ষোভ, অন্যদিকে ভয়; একদিকে প্রতিশোধের ভাষা, অন্যদিকে দমনের আশঙ্কা। এই ধরনের ভাঙা সমাজে একটি মৃত্যু খুব দ্রুত প্রতীক হয়ে ওঠে এবং প্রতীক মানেই আবেগের বিস্ফোরণ। এ অবস্থায় সংবাদমাধ্যমের ওপর আঘাত, অফিস ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের খবর আরও উদ্বেগজনক, কারণ সত্য জানার পথটাই দুর্বল হয়ে যায়।

কিন্তু আমি শিক্ষক হিসেবে এবং একজন নাগরিক হিসেবে, এই লেখায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিয়ে। আজ দেশের বহু ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ক্লান্ত, আতঙ্কিত, ক্ষুব্ধ। কেউ প্রতিবাদ করতে চায়, কেউ চায় নিরাপদে বাড়ি ফিরতে, কেউ শুধু পড়াশোনায় ফিরতে চায়। এই তিনটা চাওয়াই বৈধ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর উচিত এখন কয়েকটা কাজ খুব স্পষ্টভাবে করা :

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা প্রোটোকল : ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া, জরুরি সহায়তা, নিরপেক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা।

কাউন্সেলিং ও মানসিক সহায়তা : ট্রমা, উদ্বেগ, আতঙ্ক, রাগ, এসবকে ‘দুর্বলতা’ বানানো যাবে না।

অ্যাকাডেমিক নমনীয়তা : পরীক্ষা-অ্যাসাইনমেন্টকে অস্ত্র বানানো নয়। এই সময়টা মানবিকভাবে হ্যান্ডেল করতে হবে।

ডায়লগ স্পেস : শিক্ষার্থীরা কথা বলবে, শুনবে, যুক্তি করবে। তর্ক হবে, কিন্তু অপমান নয়।

একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রতিও আমার অনুরোধ থাকবে। প্রতিবাদ যদি করতেই হয়, অহিংস থাকুন, সত্যকে অগ্রাধিকার দিন, গুজবকে খাবার বানাবেন না। ক্ষোভ বোঝা যায়, কিন্তু সহিংসতা শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে শিক্ষার্থীদেরই; আহত, গ্রেপ্তার, ভবিষ্যৎ নষ্ট, শিক্ষা থেমে যাওয়া, আর একটা প্রজন্মের স্বপ্ন ধ্বংস। আমাদের দেশ আর কোনো তরুণকে হারানোর বিলাসিতা রাখে না। সবশেষে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ সম্ভবত একটাই : হাদির মৃত্যুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার না বানিয়ে, একটি বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জোরালো করা, আর একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা এবং ক্যাম্পাসগুলোকে মানবিক সংলাপের জায়গা হিসেবে টিকিয়ে রাখা। অন্তত এটুকু করলে, শোকটা কিছুটা অর্থ পাবে।

আমরা শিক্ষকরা প্রায়ই বলি, ‘তরুণরাই ভবিষ্যৎ’Ñ কথাটা শুনতে সুন্দর কিন্তু এর মানে একটা ভারী অঙ্গীকার। আজ সেই অঙ্গীকারের পরীক্ষা। আজ যদি আমরা ছাত্রদের কণ্ঠ না শুনি, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করি, তাহলে কাল আমরা শুধু শোক করব, বদলাব না কিছুই। এই দেশের তরুণদের স্বপ্নকে আগুনে পুড়ে ছাই হতে দেওয়া যাবে না। কারণ স্বপ্ন পুড়ে গেলে শুধু একজন ছাত্র নয়, একটা প্রজন্ম হারিয়ে যায়।

 

ড. তানভীর মুশতাফী

সহযোগী অধ্যাপক, পুরকৌশল ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগ, 

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় , ঢাকা

 

 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা