মব সন্ত্রাস
হাবিব বাবুল
প্রকাশ : ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৩২ পিএম
১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকা কার্যালয়ে যে তাণ্ডব সংঘটিত হয়েছে, তা দেখে অনেকের মনেই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জেগেছে- রাতের বেলায় কি দেশে কোনো সরকার ছিল না? রাষ্ট্র কি তার নাগরিক ও প্রতিষ্ঠান রক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে পড়েছে? আমরা মনে করি, এই হামলা কেবল দুটি সংবাদমাধ্যমের ওপর আঘাত নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং সভ্য সমাজের ভিত্তির ওপর সরাসরি আক্রমণ।
প্রথম আলো ও দ্য
ডেইলি স্টার দীর্ঘদিন ধরেই মুক্তচিন্তা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের
পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। ফলে ‘এক শ্রেণির’ উগ্রবাদী গোষ্ঠীর একটি অংশ আগে থেকেই এই
পত্রিকাগুলোর প্রতি ক্ষিপ্ত ছিলÑ এ কথা নতুন নয়। ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে
সৃষ্ট আবেগ ও গুজবকে পুঁজি করে পরিকল্পিতভাবেই রাতের আঁধারে আগুন দেওয়া ও ভাঙচুর চালানো
হয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। এই ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সামনে একটি ভয়ংকর বাস্তবতা উন্মোচন
করেÑ মব সন্ত্রাস এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি প্রায় নিয়মিত এক সামাজিক ব্যাধিতে
রূপ নিয়েছে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক
বছরগুলোতে আমরা বারবার দেখেছি, কোনো ঘটনা ঘটলেই মুহূর্তের মধ্যে ‘মব’ তৈরি হয়। কখনও
ধর্মের নামে, কখনও রাজনীতির ছায়ায়, কখনও আবার ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে জনতাকে
উস্কে দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব, অর্ধসত্য ও উস্কানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে
পরিস্থিতিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। দুঃখজনক হলো, এসব ঘটনার পর অধিকাংশ
সময়েই সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ থাকে। কোথাও দেরিতে পুলিশ আসে, কোথাও আবার
অভিযুক্তরা রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পরিচয়ের আড়ালে সহজেই পার পেয়ে যায়। ফলে অপরাধীরা
আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
মব সন্ত্রাসের
মূল সমস্যাটি কেবল আইনশৃঙ্খলার নয়; এটি এক গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের প্রতিফলন।
যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শেখে যে আইনের চেয়ে শক্তিশালী হলো দলবল ও জনতার রোষ, তখন রাষ্ট্রের
কর্তৃত্ব ভেঙে পড়তে শুরু করে। এই অবস্থা চলতে থাকলে কোনো সংবাদমাধ্যম, কোনো সংখ্যালঘু
গোষ্ঠী, এমনকি সাধারণ নাগরিকও নিরাপদ থাকবে না। সভ্য সমাজের জন্য এটি এক অশনিসংকেত।
তাহলে প্রশ্ন
হলো, বাংলাদেশ কীভাবে মব সৃষ্টিকারীদের হাত থেকে মুক্তি পেতে পারে?
প্রথমত. আইনের
শাসনকে দৃশ্যমান ও কার্যকর করতে হবে। মব সহিংসতার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে, সে যত প্রভাবশালীই
হোক না কেন, দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এই সংস্কৃতি
বন্ধ হবে না। মামলা ঝুলে থাকা বা ‘তদন্ত চলছে’Ñ এই অজুহাত দিয়ে সময় ক্ষেপণ করা বন্ধ
করতে হবে।
দ্বিতীয়ত. প্রশাসনের
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ঘটনায় যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সময়মতো ব্যবস্থা নিতে
ব্যর্থ হয়, তবে তার দায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিতে হবে। নির্লিপ্ততা বা নীরব দর্শকের
ভূমিকাও এক ধরনের অপরাধÑ এই বার্তাটি স্পষ্টভাবে দিতে হবে।
তৃতীয়ত. সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ও উস্কানি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের
স্বাধীনতা রক্ষা করেই ভুয়া তথ্য ছড়ানো ও সহিংসতায় উস্কানি দেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ
নিতে হবে। এখানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রযুক্তি কোম্পানি ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ
দরকার।
চতুর্থত. দীর্ঘমেয়াদে
শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক সচেতনতার ওপর জোর দিতে হবে। সহনশীলতা, যুক্তিবোধ এবং ভিন্নমতের
প্রতি শ্রদ্ধাÑ এই মূল্যবোধগুলো যদি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে
চর্চা না করা হয়, তবে মব মানসিকতা বারবার মাথাচাড়া দেবে।
সবশেষে, সরকারকে
বুঝতে হবেÑ সংবাদমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্রের
সাংবিধানিক দায়িত্ব। গণমাধ্যমের ওপর হামলা মানে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ
করা। আজ যদি সরকার নির্লিপ্ত থাকে, কাল সেই আগুন আরও বিস্তৃত হবে।
মব সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়া অসম্ভব নয়, কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং সচেতন নাগরিক সমাজ। অন্যথায়, রাতের আঁধারে বারবার আমাদের মনে হবেÑ এই দেশে কি সত্যিই কোনো সরকার আছে?
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক: শুদ্ধস্বর ডটকম