× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বায়ুদূষণ

নির্মল বায়ু চাই, চাই আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:১৭ পিএম

 নির্মল বায়ু চাই, চাই আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু

দক্ষিণ এশিয়ার আকাশ আজ আর নীল নয়, ধোঁয়ায় ঢাকা। শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও লাগামহীন যানবাহনসহ নানা মাধ্যমের ধোঁয়া সব মিলিয়ে বায়ুদূষণ এ অঞ্চলের মানুষের জন্য এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে, ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি ও হিমালয় পাদদেশীয় অঞ্চলে বায়ুদূষণ জনস্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার জন্য রীতিমতো হুমকি। ফলে এই দূষণ এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান উন্নয়ন চ্যালেঞ্জও বটে। বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত ‘এ ব্রেথ অব চেঞ্জ : সলিউশনস ফর ক্লিনার এয়ার ইন দি ইন্দো-গাঙ্গেটিক প্লেইন্স অ্যান্ড হিমালয়ান ফুথিলস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। অবশ্য বিশ্বব্যাংক বলছে, এর সমাধান আমাদের হাতের নাগালেই। সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিলেই এই দূষণ কমানো সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না, কলকারখানায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং বর্জ্যের সঠিক পুনর্ব্যবহার।

১৯ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘শতকোটি মানুষ অসহনীয় দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলের প্রায় ১০০ কোটি মানুষ বর্তমানে অসহনীয় মাত্রার দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে। এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। শুধু তাই নয়, দূষণজনিত কারণে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে তা এ অঞ্চলের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশ। আরও বলা হয়, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটান নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলে বায়ুদূষণের প্রধান পাঁচটি উৎস হচ্ছে রান্নায় লাকড়ি বা কয়লার ব্যবহার, ফিল্টারহীন শিল্পকারখানা, পুরনো ইঞ্জিনের যানবাহন, ফসলের খড় পোড়ানো এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

জানা গেছে, সংকট নিরসনে বিশ্বব্যাংক দূষণমুক্ত বায়ুর সমাধানগুলোকে তিনটি পরিপূরক ক্ষেত্রে ভাগ করেছে : প্রথমত, রান্না, শিল্প, পরিবহন, কৃষি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যেখানে দূষণ তৈরি হয়, ঠিক সেই উৎসস্থলেই নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বায়ুমানের উন্নতির এই রূপান্তরকালীন সময়ে শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে এই অগ্রগতি টিকিয়ে রাখতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো, বাজারভিত্তিক প্রণোদনা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বব্যাংক বলছে, দূষণমুক্ত বাতাস পেতে হলে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতাও প্রয়োজন। সম্মিলিতভাবে কাজ করলে লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো এবং সবার জন্য নির্মল বাতাস নিশ্চিত করা সম্ভব।

বলা প্রয়োজন, বায়ুদূষণের প্রভাব শুধু শ্বাসতন্ত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুস ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাস মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়, স্বাস্থ্যব্যয় বাড়ায় এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বায়ুদূষণজনিত রোগে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শীত মৌসুম এলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ইটভাটা, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, নির্মাণকাজের ধুলো, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো এবং পুরনো যানবাহনের কালো ধোঁয়া বাতাসকে বিষিয়ে তোলে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।

দুঃখজনক হলো, এই ভয়াবহতা নতুন নয় তবুও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি এখনও বিদ্যমান। সবগুলো দেশেই আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল। পরিবেশ অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও সীমিত পর্যায়ে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে দূষণকারী শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে ‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’ অবস্থা। অর্থাৎ আইন কাগজে থাকলেও বাতাস দূষণমুক্ত হয় না।

আমরা মনে করি, এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। এই ক্ষেত্রে ইটভাটা ও শিল্পকারখানায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। গণপরিবহন আধুনিক ও বিদ্যুচ্চালিত করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ জরুরি। নগর পরিকল্পনায় সবুজায়ন বাড়াতে হবেÑ গাছই পারে বাতাসের বিষ শোষণ করতে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বায়ুদূষণ সীমান্ত মানে না।

মনে রাখতে হবে, বায়ুদূষণ দক্ষিণ এশিয়ার জন্য শুধু পরিবেশগত সমস্যাই নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকটে জরুরি অবস্থাও। প্রতিবছর ১০ লাখ মৃত্যুর মাশুল দিয়ে এভাবে উদাসীন থাকা ঠিক নয়, উচিতও নয়। তাই এখনই যদি দৃঢ় সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা রেখে যাবÑ ধোঁয়াচ্ছন্ন আকাশ আর শ্বাসরুদ্ধ এক বাস্তবতা। সময় এসেছে নীরব এই ঘাতকের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধের। তার জন্য ধারাবাহিক সহযোগিতা, টেকসই অর্থায়ন এবং স্থানীয়, জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি। আমরা মনে করি, দেশগুলোর সরকার একসঙ্গে কাজ করলে দূষণ কমানো, লাখো প্রাণ বাঁচানো এবং সবার জন্য পরিষ্কার বাতাস নিশ্চিত করা সম্ভব।

পরিশেষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলি:

অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু

চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা