× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

অভিবাসী : মানবিক পৃথিবীর দায়

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০৪ পিএম

অভিবাসী : মানবিক পৃথিবীর দায়

মানুষ স্থির নয় মানুষ চলমান। জীবনের প্রয়োজনে, স্বপ্নের টানে কিংবা বাধ্যতার ভারে মানুষ এক জায়গা ছেড়ে আরেক জায়গায় যায়। এই চলাচলই অভিবাসন। বিশ্ব ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে অভিবাসনের ছাপ রয়েছে। সেই বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিতেই প্রতিবছর ১৮ ডিসেম্বর পালিত হয় আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস। ২০০০ সালে জাতিসংঘ এই দিবস ঘোষণা করে, যাতে অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও অবদান বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পায়।

আজকের পৃথিবীতে অভিবাসন কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং এটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও বিশ্বায়নের ফলে মানুষের চলাচল বেড়েছে। কেউ যাচ্ছেন কাজের খোঁজে, কেউ শিক্ষা বা নিরাপত্তার জন্য, আবার কেউ বাধ্য হচ্ছেন যুদ্ধ, দারিদ্র্য বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশ ছাড়তে। অভিবাসন তাই একদিকে সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়, অন্যদিকে সৃষ্টি করে গভীর মানবিক সংকট।

বর্তমান বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ নিজ দেশের বাইরে বসবাস করছে। কেউ বৈধ পথে, কেউ অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে। উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি অনেকাংশেই অভিবাসী শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। হাসপাতালের নার্স, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিক্ষেতের কর্মী, প্রযুক্তিবিদ সবখানেই অভিবাসীদের উপস্থিতি স্পষ্ট। অথচ এই মানুষগুলোর জীবন প্রায়ই থেকে যায় আড়ালে, আলোচনার বাইরে। অভিবাসনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ অর্থনৈতিক। নিজ দেশে কাজের সুযোগ সীমিত হলে মানুষ বাধ্য হয় দূরে যেতে। তবে শুধু অর্থ নয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মীয় নিপীড়ন, জাতিগত সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতাও মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। এই বাস্তবতায় অভিবাসন অনেক সময় পছন্দ নয়, হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার কৌশল।

অভিবাসীরা যে শুধু নিজেদের পরিবার নয়, পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয়Ñ এ কথা আজ আর অজানা নয়। প্রবাসী আয় অনেক দেশের অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ। উন্নয়নশীল দেশগুলোর গ্রামাঞ্চলে শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনমান উন্নয়নে অভিবাসীদের পাঠানো অর্থ বড় ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে অভিবাসীরা নতুন সমাজে নিয়ে যায় নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা ও মূল্যবোধ। এতে সমাজ হয় বহুমাত্রিক ও প্রাণবন্ত। খাবার, সংগীত, সাহিত্য ও চিন্তাধারার আদান-প্রদানে গড়ে ওঠে এক বৈশ্বিক সংস্কৃতি, যা মানুষকে কাছাকাছি আনে।

অভিবাসনের এই ইতিবাচক ছবির আড়ালে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। অনেক অভিবাসীকে অমানবিক পরিস্থিতিতে কাজ করতে হয়। ন্যায্য মজুরি না পাওয়া, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনÑ এসব তাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। ভাষাগত দুর্বলতা ও আইনি জ্ঞানের অভাব তাদের আরও অসহায় করে তোলে। বিশেষ করে, নারী অভিবাসীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। গৃহকর্মে নিয়োজিত অনেক নারী শ্রমিক নিগ্রহের শিকার হন, অথচ অভিযোগ করার সুযোগ পান না। আবার অবৈধ অভিবাসনের পথে যারা পাড়ি দেন, তারা মানবপাচার চক্রের হাতে পড়েন, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

অভিবাসনের আরেকটি রূপ হলো শরণার্থী সংকট। যুদ্ধ ও সহিংসতা থেকে বাঁচতে লাখো মানুষ প্রতিবছর দেশ ছাড়ছে। শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবন, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও নাগরিক অধিকারহীনতা তাদের বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক সহায়তা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব। নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বহু মানুষ স্থায়ীভাবে ঘরছাড়া হচ্ছে। এই মানুষগুলো কোনো দেশের আইনে স্পষ্টভাবে ‘শরণার্থী’ হিসেবে স্বীকৃত নয়। ফলে তাদের সুরক্ষা আরও জটিল হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ অভিবাসননির্ভর একটি দেশ। লাখো মানুষ বিদেশে কাজ করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তাদের ঘামে গড়া অর্থ জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এই শ্রমিকরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হন দালালচক্র, দক্ষতার অভাব, আইনি জটিলতা ও প্রবাসে সুরক্ষাহীনতা। আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রবাসী কর্মীদের শুধু রেমিট্যান্সের উৎস হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করা জরুরি। তাদের প্রশিক্ষণ, সঠিক তথ্য ও কূটনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

একটি ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব গড়তে হলে অভিবাসন ব্যবস্থাকে মানবিক করতে হবে। নিরাপদ অভিবাসন পথ তৈরি, মানবপাচার দমন, অভিবাসীদের আইনি সহায়তা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে, যাতে অভিবাসীদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন না করা হয়। পরিশেষে বলতে চাই, আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রাখে- আমরা কি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখছি, নাকি কেবল সংখ্যায় পরিণত করছি? অভিবাসনের পেছনে থাকে আশা, ভয় ও সংগ্রামের গল্প। সেই গল্পকে সম্মান জানানোই মানবিক সভ্যতার পরিচয়।

মানুষের চলাচল থামবে না। কিন্তু যদি সেই চলাচল নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়সংগত হয়, তবেই বিশ্ব হবে আরও মানবিক। আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস সেই মানবিক অঙ্গীকারকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে।

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা