ইমেইল থেকে
তানজিদ শুভ্র
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৪১ এএম
আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরই ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে শুরু হবে ইংরেজি নববর্ষ ২০২৬। নতুন বছর মানেই নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি নববর্ষ বা ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ উদযাপন নিয়ে তরুণ প্রজন্মের উন্মাদনা এখন উৎসবে কম, আর আতঙ্কে বেশি রূপ নিচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে ঢাকাসহ সারা দেশে নতুন বছরকে বরণ করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা এক কথায় ‘ভয়াবহ’। উৎসবের নামে বিকট শব্দের আতশবাজি আর পটকা ফোটানো এখন এমন এক ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে, যা অনেকের জন্য আনন্দের বদলে নিয়ে আসছে বিভীষিকা।
আমরা মুখে বলি, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু উৎসব পালনের রুচি আর মানবিকতায় আমরা কতটুকু এগোলাম? একবার ভেবে দেখুন তো, শহরের দালানে বা গাছের ডালে আশ্রয় নেওয়া হাজারো পাখির কথা। দিনের কোলাহল সইলেও রাতের গভীর ঘুমে তারা থাকে নিঃশব্দ। মধ্যরাতে যখন যুদ্ধক্ষেত্রের মতো বিকট শব্দে আতশবাজি ফোটে, তখন এই পাখিরা দিশাহারা হয়ে যায়। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের বর্ষবরণের রাতে শব্দ ও বায়ুদূষণের কারণে শতাধিক পাখির মৃত্যু হয়েছে। আতশবাজির আকস্মিক শব্দে দিকভ্রান্ত হয়ে দেয়ালে বা বিদ্যুতের তারে ধাক্কা খেয়ে প্রাণ হারায় নিরীহ চড়ুই, শালিক বা কাক। রাস্তার কুকুর-বিড়ালরা আতঙ্কে ছোটাছুটি করতে গিয়ে গাড়ির নিচে চাপা পড়ে। যে আনন্দ অন্য প্রাণীর প্রাণ কেড়ে নেয়, তা কি আসলেই উৎসব হতে পারে?
ক্ষতি শুধু প্রাণীর নয়, মানুষেরও। সহনীয় শব্দের মাত্রা সাধারণত ৪৫-৫০ ডেসিবল। কিন্তু থার্টি ফার্স্ট নাইটে যে হাই-ফ্রিকোয়েন্সি পটকা ফোটানো হয়, তার মাত্রা ৯০ থেকে ১২০ ডেসিবল ছাড়িয়ে যায়। পরিসংখ্যান বলছে, এই রাতে হৃদরোগীদের হাসপাতালে ভর্তির হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে, নবজাতক শিশুদের জন্য এটি এক বড় ট্রমা। ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতে আতশবাজির বিকট শব্দে অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিল চার মাস বয়সি শিশু তানজিম উমায়ের। ২০২৬-কে স্বাগত জানাতে গিয়ে আমরা কি আর কোনো মায়ের কোল খালি করতে চাই?
এ ছাড়া বয়স্ক মানুষ, যারা শ্বাসকষ্ট বা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, তাদের জন্য এই রাতের বাতাস হয়ে ওঠে বিষাক্ত। আতশবাজির ধোঁয়ায় বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা এজমা রোগীদের জন্য প্রাণঘাতী।
আতশবাজির পাশাপাশি ফানুস ওড়ানোকেও অনেকে নিরাপদ মনে করেন। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে ফানুস এখন আতঙ্কের আরেক নাম। বিগত বছরগুলোতে ফানুসের ঘটনায় মেট্রোরেল চলাচল বিঘ্নিত হওয়া থেকে শুরু করে বস্তি ও বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আমরা দেখেছি।
দুঃখের বিষয় হলো, ক্ষণিকের আনন্দের জন্য আমরা যে আইন ভাঙছি, তা হয়তো অনেকেই জানি না। ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬’ অনুযায়ী অননুমোদিতভাবে আতশবাজি ও পটকা ফোটানো দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইন অমান্য করলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ কোথায়? প্রতিবছর পুলিশ প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও পাড়া-মহল্লায় বা ছাদের ওপর যে তাণ্ডব চলে, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।
আমরা নতুন বছরকে বরণ করব, অবশ্যই করব। তবে তা হতে হবে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে। প্রশাসনকে কেবল প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সীমাবদ্ধ না থেকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ৩১ ডিসেম্বরের আগেই অবৈধ আতশবাজি বিক্রি ও মজুদ বন্ধে অভিযান চালানো জরুরি। পাশাপাশি প্রতিটি হাউসিং সোসাইটি ও মহল্লা কমিটিকে সচেতন করতে হবে।
তানজিদ শুভ্র
গণমাধ্যমকর্মী, মিরপুর, ঢাকা