ইইউ পর্যবেক্ষক দল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০৫ পিএম
বহু বছর পর বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনকালে দীর্ঘদিন ধরে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন থাকায় ইইউসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ইইউর এই পদক্ষেপ শুধু একটি কূটনৈতিক ঘটনা নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। ১৭ ডিসেম্বর, বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওস্থ নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব আখতার আহমেদ।
তিনি আরও জানান, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশনের একটি প্রশাসনিক চুক্তি হয়েছে। ওই চুক্তির আলোকেই আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষক প্রতিনিধিদল পাঠাবে।
উল্লেখ্য, চুক্তির আওতায় ইউরোপীয়
ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক দলের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া হবে। বিশেষ করে,
পর্যবেক্ষকদের যাতায়াতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সহযোগিতা করবে।
স্বীকার করতেই হবে, বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এমন এক রাজনৈতিক
বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে নির্বাচন শব্দটির প্রায়োগিক অর্থ ও বিশ্বাসযোগ্যতা
নতুন করে সংজ্ঞায়িত হওয়ার দাবি রাখে। কেননা ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের
ক্ষমতাসীন গণবিরোধী সরকারের পতনের পর এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের সাংবিধানিক
প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সত্তা পুনরুদ্ধারের অগ্নিপরীক্ষাও। গত পনেরো
বছরে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল নামেই ছিল,
বাস্তবে ছিল ক্ষমতা সংরক্ষণের আনুষ্ঠানিক প্রহসন মাত্র। ভোটারদের অংশগ্রহণ করতে দেওয়া
হয়নি, বিরোধী দল কার্যত অনুপস্থিত ছিল। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেই প্রহসনে সহায়ক
যন্ত্রের ভূমিকায় ছিল। সেসব নির্বাচনে বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদেরও উপস্থিতি ছিল
না। ওইসব নির্বাচনের ফলে যে সংসদ গঠিত হয়েছে, তা জনগণের প্রতিনিধিত্বের বদলে ক্ষমতার
একচেটিয়া নিবর্তক কাঠামোকেই বৈধতা দিয়েছে। এই বাস্তবতায় ত্রয়োদশ নির্বাচন ঘিরে
মানুষের প্রত্যাশা গুরুত্ব বহন করে। আসলে রাষ্ট্র পরিচালনায়
জন-আস্থা সবচেয়ে বড় মূলধন। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক
ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি মানুষের আস্থায় ভাটা পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলোÑ জনগণের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা।
বলে
রাখা ভালো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সাধারণত তখনই নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠায়, যখন তারা মনে করে,
সংশ্লিষ্ট দেশ অন্তত ন্যূনতম রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। তাই নির্বাচন
পর্যবেক্ষণ ইইউর কাছে কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; জনগণের অধিকার ও গণতান্ত্রিক সহায়তার প্রক্রিয়া।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক পরিবেশ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, প্রচারণার সুযোগ, গণমাধ্যমের
স্বাধীনতা এবং নির্বাচনের পরে ফলাফল গ্রহণযোগ্যতাÑ সবকিছুই তারা পর্যবেক্ষণ করে। ফলে
ইইউর উপস্থিতি মানেই নির্বাচনের প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যাচাইয়ের মুখে পড়বে।
আমরা
মনে করি, দেশের জন্য এটি একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ। সুযোগ এই কারণে যে, একটি
গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার
হতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইইউ বাংলাদেশের
অন্যতম বড় অংশীদার। নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিনের অনাস্থা কাটিয়ে উঠতে পারলে ইউরোপীয় বাজারে
বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। নির্বাচন পর্যবেক্ষক
থাকলে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আরও বেশি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক
হতে হবে। ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি, সকল দলের অংশগ্রহণ, প্রার্থীদের নিরাপত্তা এবং
ফল ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতাÑ সবকিছুতেই আন্তর্জাতিক নজরদারি থাকবে। অতীতে যেসব অভিযোগ
উঠেছেÑ ভোটারদের ভয়ভীতি, কেন্দ্র দখল বা প্রশাসনিক পক্ষপাতÑ এসব বিষয়ে আর কোনো শৈথিল্যের
সুযোগ থাকবে না।
রাজনৈতিক
দলগুলোর জন্যও এটি একটি পরীক্ষা। দলগুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা সত্যিকার অর্থেই
অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। একই সঙ্গে সকল দলের দায়িত্ব হবে নির্বাচনী
প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করা এবং গণতান্ত্রিক পথে দাবি আদায়ে অগ্রাধিকার দেওয়া।
সহিংসতা বা বর্জনের রাজনীতি আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক বার্তা দেয়Ñ এ বাস্তবতা রাজনৈতিক
নেতৃত্বকে বুঝতে হবে।
আমরা মনে করি,
দীর্ঘ সময় পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠানোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য
এক ধরনের আশাবাদ। দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি প্রমাণ করে,
আন্তর্জাতিক সমাজ এখনও বাংলাদেশের গণতন্ত্রে আস্থা ফেরানোর সুযোগ দেখছে। এখন দায়িত্ব
আমাদেরÑ রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজের। সবাই মিলে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু
ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া। কারণ গণতন্ত্র কেবল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির
বিষয় নয়; এটি জনগণের অধিকার ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন।