বিজয় দিবস
ফজলে মিনহাজ
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৩৪ এএম
‘সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি / ও আমার বাংলাদেশ প্রিয় জন্মভূমি।’ আমাদের প্রাণের প্রিয় এদেশের রয়েছে গৌরবগাথা ইতিহাস। ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে সময়ের প্রয়োজনে বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা পিছনে না গিয়ে সগর্বে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে নিজেদের বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে এসে পৃথিবীর বুকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের মানচিত্র এঁকেছেন। বাংলাদেশের যেমন রয়েছে রক্তঝরা ইতিহাস তেমনি রয়েছে সোনালি প্রাকৃতিক সম্পদ আর সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব।
স্বাধীনতার
প্রায় ৫৫ বছরে এসে তরুণ প্রজন্ম যদি আমাদের দেশের কর্তাদের (যারা স্বাধীনতার পর
থেকে কয়েক ধাপে পালাবদল করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে) কাছে জানতে চায়Ñ দেশের
অগ্রগতি কতদূর ? চুপ থাকা ছাড়া কোনো কর্তাই মুখ খুলতে পারবেন না।
অনেক
ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে জাতীয় স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে সত্যিই, কিন্তু
জাতীয় মুক্তির সাফল্য এখনও অর্জিত হয়নি। তার কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, যখনই যারা ক্ষমতায় আসেন তারা ক্ষমতার দম্ভ ও অহংকারে জনগণের
ভাষা বুঝতে চান না, ক্ষমতায় আসা ও ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াই, নতজানু পররাষ্ট্রনীতি এবং সে সঙ্গে ক্ষমতাবাজদের
দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ভেংচিবাজি তো আছেই।
ধনী-দরিদ্রের
ব্যবধান বেড়েছে। বেকারত্ব, সুশাসনের অভাব, উৎপাদনের অভাব, শিক্ষাব্যবস্থায় নানা সমস্যা, রাজনৈতিক দলগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিবেশের অভাব ইত্যাদি
কারণেই অর্থনৈতিক মুক্তি বা জাতীয় মুক্তি যে যেটাই বলি না কেনÑ আজও বাস্তবায়িত
হয়নি।
আমাদের
দুর্ভাগ্য যে, স্বাধীনতার প্রায় এতগুলো বছর অতিবাহিত
করেও দেশের সংবিধান ‘সংস্কার
নাকি বাতিল’Ñ এমন আলোচনা
করতে হয়। বিচারব্যবস্থা নিয়ে বির্তক হয়। মানবাধিকার রক্ষার জন্য এখনও রাস্তায়
নামতে হয়। এসবের জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতাই দায়ীÑ এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
‘মুক্তিযুদ্ধের
চেতনায় বিশ্বাসী’Ñ এই বাক্যটি পতিত স্বৈরাচারের উত্তরাধিকারমূলক বক্তব্য হিসেবে ব্যবহৃত
হয়ে আসছিল, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখাতে পারে
নাই।
আমরা
আজ যারা তরুণ, কী জবাব দেব সে শহীদদের কাছে, যারা
নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন এই মা, মাটি ও মানুষের জন্য। আর কতটুকুই-বা
হাসি ফোটাতে পেরেছি সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসে থাকা সেই আহত জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের? আমরা সকলেই তাদের কাছে ঋণী। তাদের ঋণ শোধ করা যাবে না বলে কি আমরা আমাদের দায়বদ্ধতা
থেকেও দূরে সরে যাব?
এখন
আর পেছনে ফিরে দেখার সময় নেই, আমাদের দেশপ্রেমকে পাথেয় করে এবং
শুধু কথায় নয় বস্তুত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করেই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে জুলুমবাজ পাকিস্তানের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করলেও হাজারো
দেশীয় আন্তর্জাতিক আগ্রাসনবাদী তৈরি হয়ে গেছে আমাদের শোষণ করে সর্বস্ব শেষ করার
জন্য। সেসব আন্তর্জাতিক আধিপত্যবাদের মিত্র হিসেবে আমাদের মাঝেই ঘাপটি মেরে আছে
দেশপ্রেমের বড় বড় স্লোগান নিয়ে এদেশীয় পরজীবী দালালরা।
শুধু
ক্ষমতার মসনদে যাওয়ার জন্য কারও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে তামাশাকেও আমরা পছন্দ
করি না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে
মুক্তিযোদ্ধাদের লাঞ্ছিত করাও আমরা সইব না। সেই সঙ্গে সময় এসেছে ভারতীয় আগ্রাসন ও
আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হওয়ার।
গত
১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ বাস্তবায়ন
আদেশের ওপর গণভোটের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঘোষণা দেশের রাজনীতিতে নতুন এক
প্রত্যাশার সঞ্চার করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতির অন্যতম একটি হলো গণতন্ত্র।
অথচ বিগত সতেরো বছর ফ্যাসিবাদী শাসনামলে
সেই গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার কুক্ষিগত ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জনগণকে তাদের
মৌলিক অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল। সদ্য ঘোষিত তফসিল রাজনৈতিক দল ও সাধারণ
মানুষের মধ্যে আবারও নির্বাচনী আবহ ও অংশগ্রহণের আমেজ ফিরিয়ে এনেছে, যা নিঃসন্দেহে
আশাব্যঞ্জক।
২০২৬
সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে দেশ
একটি নতুন গণতান্ত্রিক ধারায় প্রবেশ করবে। দীর্ঘ ১৭ বছর ভোট দিতে না পারার যে ক্ষত
ও আক্ষেপ, এই নির্বাচন তা কিছুটা হলেও পূরণ করবেÑ এমনটাই
জাতির প্রত্যাশা।
তবে
তফসিল ঘোষণার পরদিনই তরুণ প্রার্থী ও জুলাইযোদ্ধা ওসমান হাদিকে সন্ত্রাসীরা গুলি
করে নির্মমভাবে আহত করে। এই ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট
করেছে এবং আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরাপদ হবে কি নাÑ সে বিষয়ে জনমনে আতঙ্ক ও
উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই বাস্তবতায় সরকারের প্রতি প্রত্যাশাÑ তারা যেন দ্রুত
নিজেদের দুর্বলতা ঝেরে ফেলে। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত
করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
চব্বিশের
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পঁচিশ সালের বিজয়ের এই মাস হোক
৭১-এর মহান স্বাধীনতাকে রক্ষা করার শপথ।
রচিত হোক সত্যিকারের ইতিহাস। মহান স্বাধীনতা ও
মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে নতুন বাংলাদেশ
বিনির্মাণের রূপরেখা হোক স্পষ্ট ও দৃঢ়। আমাদের দেশÑ আমরাই গড়ব।
চোর-বাটপার-দালালের
দিন হোক শেষ!
গড়ে উঠুক তরুণ প্রজন্মের বাংলাদেশ!
ফজলে মিনহাজ
রাজনীতি পর্যবেক্ষক