বিজয় দিবস
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:৩৮ এএম
জাতীয় স্মৃতিসৌধ
আজ ১৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশি জাতির মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। এদিন গৌরবময় বিজয়ের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে ‘বাংলাদেশ’। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে একটি জাতি পৌঁছে যায় রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সোপানে। এই বিজয় দিবস কেবল একটি উৎসবের দিনই নয়; এটি আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও ইতিহাসের দায় স্মরণ করার দিন।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৭১
সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের জনগণের ঐক্য ছিল
দৃঢ় এবং অবিচ্ছেদ্য। ধর্মবর্ণশ্রেণিনির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে
ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। দীর্ঘ ৯ মাসের লড়াই-আত্মত্যাগের পর পাকিস্তানি হানাদারদের হটিয়ে আমরা
অর্জন করি স্বাধীন সার্বভৌমত্ব। এই বিজয় আমাদের জন্য শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতা এনে
দেয়নি; এটি আমাদের দিয়েছে সাম্য, মানবিকতা এবং অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে একটি
নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের দিকনির্দেশনা- যার লক্ষ্য ছিল সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সমাজ
গড়ার অঙ্গীকার, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং গণতন্ত্রের
চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় ঐক্য সংহত করার পথে অগ্রসর হওয়া। কিন্তু স্বাধীনতার পর
বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের কারণে এই চেতনা অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত
হয়েছে।
তাই ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে বিজয় দিবস আমাদের সামনে
নতুন করে প্রশ্ন তোলেÑ ৫৪ বছরের পথচলায় আমরা কতটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে
পেরেছি? এ কথা সত্য যে, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিকÑ
সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে অস্ত্র হাতে কিংবা মননে এক হয়েছিল। আরও সত্য যে, সেই ঐক্যের শক্তিতেই
অর্জিত হয়েছিল বিজয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সময়ের ব্যবধানে সেই ঐক্য অনেক ক্ষেত্রে
বিভক্তির শিকার হয়েছে। রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজজীবনে বৈষম্য, দুর্নীতি ও অসহিষ্ণুতা
মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। স্বভাবতই যে স্বপ্ন নিয়ে লাখো শহীদ জীবন
উৎসর্গ করেছিলেন, মা-বোনরা সম্ভ্রম হারিয়েছেনÑ সেই অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত
বাংলাদেশ কতটা গড়ে উঠেছেÑ এই আত্মসমালোচনাই আজ সবচেয়ে জরুরি।
আসলে স্বাধীনতা মানে কেবল ভূখণ্ডের স্বাধীনতা
নয়Ñ এটি ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানুষের নিরাপদ জীবনের অধিকার নিশ্চিত
করার নাম। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে
জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ করাÑ এই কাজগুলোই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত সম্মান রক্ষা করবে। আমরা
মনে করি, তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানতে হবে, চব্বিশের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাস্তবতায়
তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। তবে ইতিহাসকে অস্বীকার
নয়, বরং ১৯৭১-এর সত্যকে ধারণ করেই আগামীর বাংলাদেশ গড়তে হবে। তাই একাত্তরকে খণ্ডিতভাবে দেখলে হবে না।
মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দেওয়ার বা বিকৃত করার যেকোনো অপচেষ্টা জাতির জন্য বিপজ্জনক।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বিজয়
দিবস শুধু উদযাপনের দিন নয়Ñ এটি আত্মসমীক্ষা ও প্রতিশ্রুতির দিন। মুক্তিযুদ্ধের যে
মূল্যবোধগুলো জাতিকে পথ দেখিয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নই আমাদের প্রধান কাজ। সমাজের
প্রতিটি স্তরে মানবিক মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার
প্রসার ঘটাতে হবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ গঠনে আমাদের সচেতন পদক্ষেপ
নিতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয় ঐক্য এবং
আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সমন্বয় ঘটাতে হবে। আসুন, এই মহান বিজয় দিবসে আমরা জাতীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের
চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের শপথ গ্রহণ
করি। আমরা বিশ্বাস করি, সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই সম্ভব হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়
একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।
মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ই আমাদের
অস্তিত্ব। সেখান থেকেই আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। বারবার সেখানেই ফিরে যেতে হবে। ৫৪
বছরে যত ভুলভ্রান্তি হয়েছে ভবিষ্যতে যেন তার পুনরাবৃত্তি না হয়Ñ সেটা নিশ্চিত করতে
হলে একাত্তরকেই স্মরণ করতে হবে। বিজয় দিবস ২০২৫-এ তাই আমাদের অঙ্গীকার হোকÑ শহীদদের
স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণ। যেখানে কোনো নাগরিক পরিচয়, মত বা বিশ্বাসের কারণে বঞ্চিত
হবে না। যেখানে রাষ্ট্র জনগণের, ক্ষমতার নয়। ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা আর ভবিষ্যতের
প্রতি দায়িত্ববোধ মিলিয়েই বিজয়ের অর্থ পূর্ণতা পায়। আজ বিজয়ের পতাকা হাতে নিয়ে আমাদের
শপথ হোকÑ বিজয় দিবসকে কেবল স্মৃতিতে নয়, প্রতিদিনের জীবনে ধারণ করব। এটাই হবে বিজয়
দিবসের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন।