চিকিৎসাসেবা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৩৮ এএম
চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু রূঢ় সত্য হলো, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। আর যারা চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন তাদেরও বড় অংশ সন্তুষ্ট নয় প্রাপ্ত সেবায়। কারণ দেশে মানসম্মত ও রোগীবান্ধব সেবা নিশ্চিতে এখনও কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসার চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেসরকারি ব্যবস্থা বাড়লেও বাড়েনি সরকারি ব্যবস্থা। ফলে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বর্তমানে সেবার যে পরিকাঠামো, তাও যথেষ্ট নয়। এমনকি আমাদের জনসংখ্যার অনুপাতে হাসপাতালগুলোতে শয্যা এবং কত চিকিৎসক ও নার্স প্রয়োজন, সে বিষয়ে যদি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সূচক মানা হয়, তাহলেও সংখ্যাটি যে একেবারেই অপ্রতুল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে আমাদের সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়েই রয়েছে একধরনের অনিশ্চয়তা। আর সেই অনিশ্চয়তার ধাক্কা পড়ছে দেশের অর্থনীতিতেও। প্রশ্ন উঠতে পারে, কীভাবে? তার উত্তর রয়েছেÑ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত ‘বিদেশে চিকিৎসায় বছরে খরচ ৫ বিলিয়ন ডলার’ শিরোনামের প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়েছে, চিকিৎসা ব্যয়ে প্রতিবছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কেন চলে যাচ্ছে? তার বড় কারণÑ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় আস্থার অভাব, সঠিক রোগ নির্ণয় না হওয়া ও অনুন্নত সেবা ব্যবস্থাপনা। এ ছাড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী আমাদের জিডিপির মাত্র ১ শতাংশেরও কম বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতে। ফলে স্বাস্থ্য খাতে দুর্বলতা চিহ্নিত হলেও তা থেকে উত্তরণ ঘটছে না। চিকিৎসাসেবা নিয়ে এই অসন্তুষ্টির কারণে প্রতিবছর দেশ থেকে পার হয়ে যাচ্ছে ৫ বিলিয়ন ডলার। অঙ্কটি আমাদের মতো ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশে উদ্বেগজনক তো বটেই, সেই সঙ্গে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্দশাকেও স্পষ্ট করে তোলে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে আস্থা বৃদ্ধি; মান নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত কাঠামো নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছেÑ সরকারি-বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্যসেবা মানের অসমতা, প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের ঘাটতি, অনুমোদনহীন ক্লিনিক ও ফার্মেসির সম্প্রসারণ, ভুল ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট, ভুয়া ওষুধ ও তদারকি দুর্বলতা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা এবং সর্বোপরি বিদ্যমান আইনে বাস্তবায়নে উদাসীনতা আমাদের জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং আস্থাকে ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
চিকিৎসায় সবারই সমান অধিকার। তাহলে দেশের সব মানুষ সরকারি হাসপাতালের সুবিধা ও উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবে না কেন? আমরা মনে করি এক্ষেত্রে প্রশ্নটি যতটা না নীতির তার চেয়ে বেশি অর্থনীতির। কারণ নৈতিক দৃষ্টিতে সবারই উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সমস্যা অর্থের বরাদ্দে। স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ জিডিপির এক শতাংশেরও কম। আবার এই বরাদ্দেরও সবসময় যে সদ্ব্যবহার হয়, তাও জোর দিয়ে বলার জো নেই। এক্ষেত্রে দুর্নীতিও একটি বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। তাই স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি উন্নত চিকিৎসার জন্যে বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। চিকিৎসায় আরও উন্নত যন্ত্র ও উন্নতি প্রযুক্তির ব্যবহারও ঘটাতে হবে। সেই সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগ ‘অব্যবস্থাপনা’। তা দূর করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে পেশাদার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ জিডিপির ৫ শতাংশের মতো অর্থ বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের। আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি এবং আস্থা ফেরাতে বাজেটে এই বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ, তার বড় অংশই ব্যয় হয় বেতন-ভাতার মতো অনুন্নয়নমূলক খাতে। বাকি অংশ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ব্যবহৃত হওয়ার কথা তাও অব্যবস্থাপনা তা অব্যবহৃত থেকে যায়। ফলে স্বাস্থ্য খাত যেমন তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তেমনি চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশীদেরও আস্থা অর্জন করতে পারছে না।
স্বাধীনতা অর্জনের ৫৪ বছর পেরিয়ে এসে স্বাস্থ্য খাতে এখনও যথাযথ উন্নতি না হওয়ার কারণগুলো এখন যেমন খতিয়ে দেখার সময় এসেছে, তেমনি জনসাধারণের সামগ্রিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য সঠিক পরিকল্পনা ও তার দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়নও সময়ের দাবি। আমাদের স্বাস্থ্যসেবায় যে অর্জন সামগ্রিকভাবে তা কাঙ্ক্ষিত মানে নিয়ে যেতে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় বিশ্বাসের যে ঘাটতি তা দূর করতেও উদ্যোগী হতে হবে।