জলবায়ু
ড. নিয়াজ মো. ফারহাত রহমান
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:২৫ এএম
কৃষি ও প্রকৃতি একটি আরেকটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত; যা আর্দ্র, উষ্ণ ও মৌসুমি জলবায়ুর অন্তর্ভুক্ত। এখানে বছরের একাংশে প্রচণ্ড বর্ষা আর অন্য অংশে শুষ্ক মৌসুম বিরাজ করে। কিন্তু এই স্বাভাবিক মৌসুমি রূপ প্রতিবছর একই রকম থাকে না। এর প্রধান কারণ বৈশ্বিক জলবায়ুর বড় চলক এলো নিনো সাউদার্ন অসিলেশন (ইএনএসও) এবং ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল (আইওডি)। এই দুটি প্রভাব যখন প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরে সক্রিয় হয়, তখন তা বাংলাদেশের আবহাওয়া থেকে শুরু করে কৃষি উৎপাদন পর্যন্ত বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে।
২০২৫-২৬ সালের শীত সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাইমেট প্রিডিকশন সেন্টার এক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সময়ের মধ্যে ৬০ শতাংশ লা নিনা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে; যার প্রভাবে এ বছর স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি শীত, ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন দিন ও রাত এবং ঠান্ডা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। লা নিনা হলো দোদুল্যমানতার ঠান্ডা দিক, যখন প্রশান্ত মহাসাগরের কেন্দ্রীয় ও পূর্বাংশে, সাগরের তাপমাত্রা গড় তাপমাত্রার চেয়ে কমে যায়। দূর মহাসাগরের এই পরিবর্তন জেট-স্ট্রিমের গতিপথ বদলে দেয়, ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা, বৃষ্টি এবং বাতাসের প্রবাহে বড় পরিবর্তন দেখা দেয়। বাংলাদেশ যদিও প্রশান্ত মহাসাগর থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে, তবুও লা নিনার প্রভাব আমাদের শীতকাল ও রবি মৌসুমে স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।
লা নিনা তৈরি হলে দেশে শৈত্যপ্রবাহ বাড়ার, রাতের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার এবং হঠাৎ শীতকালীন বৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (বিএমডি) দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসও বলছে, শীত স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি হতে পারে। ঘন কুয়াশা, ঠান্ডা বাতাস, হালকা বৃষ্টি এবং তাপমাত্রার ওঠানামা এসব কারণে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের জনজীবন ব্যাহত হতে পারে। নভেম্বর ২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ সময়ে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। একই সময়ে বঙ্গোপসাগরে দুই থেকে চারটি নিম্নচাপ তৈরি হতে পারে, যার মধ্যে দুটি গভীর নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। বিএমডি আরও জানিয়েছে, এ বছর দুই থেকে তিনটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ উত্তর-পশ্চিম, উত্তর-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে আঘাত হানতে পারে। দিন-রাতের তাপমাত্রা শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও কমতে থাকবে। তাই যেসব এলাকা শৈত্যপ্রবাহপ্রবণ বিশেষ করে নীলফামারী, দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী, পাবনা ইত্যাদি তাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান ও আবহাওয়াবিদদের অভিজ্ঞতা বলছে, লা নিনা শীতে সাধারণত বেশি কুয়াশা, কম সূর্যালোক এবং জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে সামান্য বৃষ্টিপাত দেখা যায়। সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো খুব বড় বিষয় মনে না হলেও বোরো ধান চাষের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোরো ধানের ভালো ফলন অনেকটাই নির্ভর করে তাপমাত্রা, রোদ, সেচ, সার প্রয়োগ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণÑ এসব বিষয়ের ওপর। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে যখন সূর্য দেখা যায় না, তখন চারাগাছ সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে না। ফলে গাছের বৃদ্ধি শ্লথ হয়ে যায়, কুশির সংখ্যা কম হয় এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। উত্তরাঞ্চলের শীতল অঞ্চলগুলোয় রাতের তাপমাত্রা নেমে গেলে চারার বৃদ্ধিও থেমে যায়। সেক্ষেত্রে পানি জমে থাকলে চারা মরে যেতে পারে। লা নিনা শীতে রোদ কম এবং আর্দ্রতা বেশি থাকায় ব্লাস্ট, ব্যাকটেরিয়াল ব্লাইট, শিথ ব্লাইট, চারার পচনÑ এসব রোগ দ্রুত ছড়াতে পারে। তাই এ মৌসুমে রোগ নিয়ন্ত্রণে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হবে। আবার শীত শেষে হঠাৎ বৃষ্টি হলে কোথাও কোথাও সেচের প্রয়োজন কমে যাবে ঠিকই, কিন্তু আগে লাগানো ধানে লজিংয়ের ঝুঁকি থাকে। আরেকটি গুরুতর বিষয় হলো রোপণ বিলম্ব। ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে অনেক এলাকায় চারা রোপণ উপযোগী হতে দেরি হয়। ফলে ধানের ফুল আসা মার্চের শেষ বা এপ্রিলের দিকে চলে যেতে পারে। তখন তাপমাত্রা বাড়ে, আর ধানের ফুল গরমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ মৌসুমের শুরুতে ঠান্ডা আর শেষে গরম দুই দিক থেকেই ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
তবে লা নিনার কিছু ইতিবাচক দিকও আছে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় ইভাপোট্রান্সপিরেশন কম হয়, ফলে পানি কম নষ্ট হয় এবং সেচের খরচ কমে। যদি মাঝ মৌসুমে রোদ ভালো পাওয়া যায়, তবে ঠান্ডা আবহাওয়া ধানের গাছকে আরও শক্ত করে তোলে। তাই লা নিনার প্রভাব ভালো-খারাপ যাই হোক, চূড়ান্ত ফল নির্ভর করে আমরা কতটা প্রস্তুত তার ওপর। এই পরিস্থিতিতে বোরো মৌসুম রক্ষায় এখন থেকেই দৃঢ় মাঠ ব্যবস্থাপনা শুরু করতে হবে। প্রথমত, বীজতলা অবশ্যই উঁচু জায়গায় করতে হবে। উত্তরাঞ্চলে রাতে ঠান্ডা মোকাবিলায় বীজতলায় পলিথিন দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কুয়াশাপ্রবণ নিচু জমি একেবারেই এড়িয়ে চলতে হবে। বীজতলায় ২-৩ সেন্টিমিটার পানি ধরে রাখতে পারলে ঠান্ডার প্রভাব কমে। চারা বড় হলে হার্ডেনিং করতে হবে এবং খুব তাড়াতাড়ি রোপণ করা যাবে না। রোগ পর্যবেক্ষণে নজরদারি বাড়াতে হবে। ব্লাস্ট বা ব্যাকটেরিয়াল ব্লাইট দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কুয়াশা বা বৃষ্টির আগে কখনোই ইউরিয়া প্রয়োগ করা যাবে না। সেচ ব্যবস্থাপনায় পর্যায়ক্রমিক ভেজানো ও শুকানো (এডব্লিউডি) ব্যবহার করলে পানি সাশ্রয় হয় এবং শিকড় শক্ত হয়। দস্তা ও সালফারের ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করলে গাছ চাপ সহ্য করতে পারে।
সবশেষে সঠিক জাত নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি ইকোসিস্টেম ও ভূমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে সঠিকজাত নির্বাচন করতে হবে। মাঠপর্যায়ে কৃষকরা অনেক সময় এলাকা ভিত্তিক সঠিক জাত নির্ধারণ করতে পারেন না। ঠান্ডাপ্রবণ অঞ্চলে বীজতলা ঠান্ডার প্রকোপে নষ্ট হয়ে যায় ফলে চারার গুণগত মান খারাপ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে ফলন কমে যায়।
লা নিনার মতো প্রকৃতির যেকোনো বিরূপ প্রভাব আমাদের নিয়ন্ত্রণে নয়, কিন্তু প্রস্তুত থাকা আমাদের আয়ত্তের মধ্যে। আধুনিক কৃষি শুধু জমি চাষ নয়; বৈশ্বিক জলবায়ুর সংকেত বুঝে মাঠের সিদ্ধান্ত নেওয়াই টেকসই উৎপাদনের মূল চাবিকাঠি। বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস ব্যবহার করে যদি আমরা বীজতলা, রোপণ, রোগবালাই, সেচ এবং সঠিক জাত নির্বাচনÑ এসব ক্ষেত্রে আগেভাগেই প্রস্তুতি নিই, তাহলে কঠিন শীতেও বোরো মৌসুমকে নিরাপদ রাখা সম্ভব। কৃষক, নীতিনির্ধারক ও সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের জন্য বার্তা একটাইÑ আগেই প্রস্তুতি নিন, বৈজ্ঞানিক পথ অনুসরণ করুন, তাহলেই শীত মৌসুম এড়িয়েও ভালো ফলন হবে, জিতবে কৃষক ও দেশ।
ড. নিয়াজ মো. ফারহাত রহমান
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কৃষি পরিসংখ্যান বিভাগ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), গাজীপুর