শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:৩৩ এএম
১৪ ডিসেম্বর এলেই আমরা থমকে দাঁড়াই! কারণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় উল্লাসের ঠিক আগমুহূর্তে এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সবচেয়ে গভীর ক্ষতটির কথা। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশের অনেক মেধাবী সন্তানকে বেছে বেছে ঘাতকরা নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। আজ ১৪ ডিসেম্বর আমাদের মহান বুদ্ধিজীবী দিবস। আমরা বিনম্র শ্রদ্ধায় জাতির সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ করছি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই বিশাল আত্মত্যাগের দিনটি স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে এসেও কেবল আনুষ্ঠানিক স্মরণেই যেন সীমাবদ্ধ। অথচ দিনটি হওয়া উচিত আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথ-নির্দেশক হিসেবে।
উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা পরিকল্পিতভাবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করে। সেদিন শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, প্রকৌশলী, যারা নতুন রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হতে পারতেন তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট, স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করে দেওয়া। যেন বিজয়ের পরও দেশটি নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা হারায়। সেই নৃশংসতা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় সম্ভাবনার ওপর আঘাত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শুধু ওই দিনটিই নয়, মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন ২৫ মার্চ কালরাত থেকেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা আমাদের বিজয় অর্জনের আগ-মুহূর্ত পর্যন্ত বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ চালিয়েছিল। সাধারণ মানুষও এর বাইরে ছিল না।
এটা বাস্তব যে, যেকোনো রাষ্ট্র কিংবা সমাজে বুদ্ধিজীবীদের অগ্রগণ্য ভূমিকা থাকে। আমাদের ক্ষেত্রেও এর ঘাটতি ছিল না। তাদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোয় নিঃসন্দেহে দেশ-জাতি আলোকিত হয়েছে। মূলত ঘাতকরা সেদিন এই ধারাবাহিকতা থামিয়ে দেওয়ার জন্যই বুদ্ধিজীবীদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়। বুদ্ধিজীবীরা রাষ্ট্রে-সমাজে যে প্রজ্ঞার আলো, আদর্শ ছড়িয়েছেন তা আজও আমাদের পাথেয় এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশেও অমলিন থাকবে। তবে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সেই ক্ষতির দায় যথাযথভাবে উপলব্ধি করেছি? বুদ্ধিজীবী দিবস পালন কি কেবল ফুল দেওয়া, আলোচনা সভা আর আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নাকি আমরা সত্যিই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও নৈতিক নেতৃত্বকে রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি? বাস্তবতা হলো, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় বিনিয়োগ এখনও পর্যাপ্ত নয়; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে; আর বুদ্ধিজীবীদের সমাজে প্রাপ্য মর্যাদা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত।
আমরা মনে করি, বুদ্ধিজীবী মানে কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক পেশায় নিয়োজিতরাই নন, যিনি সকল অনিয়মকে প্রশ্ন করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, যুক্তি ও মানবিকতার পক্ষে কথা বলেন তিনিই বুদ্ধিজীবী। আমরা জানি, বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার একটি ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের অংশ। তবে ন্যায়বিচার কেবল আদালতেই শেষ হয় না। ন্যায়বিচার পূর্ণতা পায় তখনই, যখন রাষ্ট্র বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশকে সুরক্ষিত করে। বিশেষ করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, শিক্ষাব্যবস্থায় সমালোচনামূলক চিন্তা জোরদার করা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং চিন্তাবিদদের নিরাপত্তা ও সম্মান দেওয়া। কিন্তু আমরা কি ভিন্নমতকে সহনশীলভাবে গ্রহণ করতে শিখেছি? নাকি বুদ্ধিজীবী পরিচয় দলীয় তকমায় আটকে যাচ্ছে? এই বিভাজন বুদ্ধিজীবী দিবসের শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মানবতাবিরোধী যেকোনো অপরাধ যেকোনো দেশের নাগরিকের জন্য অত্যন্ত মর্মন্তুদ। বাংলাদেশের মানুষ এই পরিস্থিতিতে বহুবার পড়েছে। দেশে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণের যে পথ খুলেছে সেই পথে যেন আমরা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের চেতনার মশাল নিয়ে হাঁটতে পারি। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলরা যেন যথাযথ ভূমিকা পালনে তাদের দায়বদ্ধতার কথা ভুলে না যান।
এ কথা সত্য, ফেলে আসা ৫৪ বছরে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রযুক্তিতে অগ্রগতি এসেছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তিই হচ্ছে তার চিন্তাশক্তি। যে জাতি তার বুদ্ধিজীবীদের কথা শোনে না, তাদের প্রশ্নকে ভয় পায়, সে জাতির অগ্রগতি মন্থর হয়। উন্নয়নের দৌড়ে টেকসই হয় না। আমরা মনে করি, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তখনই জানানো হবে, যখন আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক, যুক্তিবাদী ও মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিতে পারব। জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞাময় সমাজ গড়তে পারবে। মনে রাখা দরকার, ১৪ ডিসেম্বর আমাদের শোকের দিন, কিন্তু তা হতাশার নয়। এটি প্রতিজ্ঞার দিন, মেধা ও মননের বাংলাদেশ গড়ার দিন। শোক থেকে শক্তি, স্মৃতি থেকে দায়িত্বÑ এই হোক আমাদের বুদ্ধিজীবী দিবসের অঙ্গীকার।