ক্রীড়াঙ্গন
ইকরামউজ্জমান
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:৩১ এএম
দেশে নারী ফুটবলাররা মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর। কোচ ও টিম ম্যানেজমেন্ট যখন র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে খেলার সিদ্ধান্ত নেয়Ñ বিষয়টিকে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে স্বাগত জানিয়েছেন ফুটবলাররা। শক্তিশালী এবং এগিয়ে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে খেলা মানেই নিজকে যাচাই করার উত্তম সুযোগ এবং পাশাপাশি খেলার মানোন্নয়ন। ফুটবলাররা বুঝতে পেরেছেন সাফের ‘লেভেলের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে এশিয়ান পর্যায়ে কিছুই করা যাবে না। আর তাই ‘সাফের’ গণ্ডিকে অতিক্রম করা ছাড়া উপায় নেই। দেশে নারী ফুটবলাররা খেলার সুযোগ খুব কম পান। দেশে নিয়মিতভাবে লিগও অনুষ্ঠিত হয় না। আর মাঠে গড়ালেও লিগের মান নিচু। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলতে যা বুঝায় এই এ ক্ষেত্রে ভীষণ ঘাটতি। গত মওসুম থেকে কয়েকজন নারী ফুটবলার ভুটানের পেশাদার লিগে খেলছেন, তবে এই লিগের মান কিন্তু মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়। সম্প্রতি ফুটবল ফেডারেশন থেকে জানানো হয়েছে নারী ফুটবল লিগ মাঠে গড়াবে চলতি ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে। এখন সেই আশায় তাকিয়ে থাকা! আর কামনা করা লিগ যাতে আবার পিছিয়ে না যায়।
প্রথমবারের মতো সাফ নারী ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ নেপালে অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধিত্ব করবে নাসরিন স্পোর্টস একাডেমি। ২০২৩-২৪ মৌসুমে লিগ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলার সুযোগ পেয়েছে নাসরিন স্পোর্টস একাডেমি। জাতীয় দলের ক্যাম্প চলছে আগামী বছর মার্চে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠেয় এএফসি উইমেন্স এশিয়ান কাপের ফাইনাল রাউন্ডে খেলার জন্য। এতে করে মারিয়া-মণিকাদের পাবে না নাসরিন ক্লাব। তাই জুনিয়র খেলোয়াড়দের নিয়ে দল গঠন করা ছাড়া উপায় নেই। সানজিদা আক্তারদের প্রথম খেলা স্বাগতিক দেশের আর্মড পুলিশ ফোর্স ক্লাবের (এপিএফ) বিপক্ষে। যতটুকু জেনেছি দলটি যথেষ্ট গোছানো এবং শক্তিশালী। নাসরিন স্পোর্টিং এই দলের বিপক্ষে মাঠে শক্ত লড়াই করতে পারবে বলে মনে হয় না। রাউন্ড রবিন লিগের পরবর্তী খেলা পাকিস্তানের করাচি সিটি ক্লাবের বিপক্ষে। এই ক্লাবের বিপক্ষে যদি জয় নিশ্চিত করা সম্ভব না হয় তাহলে সাফ ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের নাসরিন স্পোর্টিং উল্লেখ করার মতো কিছু করতে পারবে না এবার। ফুটবল মাঠের খেলা। দলীয়ভাবে একাগ্রতার সঙ্গে লড়তে পারলে অবশ্য অনেক কিছুই অর্জন করা সম্ভব। তা ছাড়া খেলার সঙ্গে সব সময় ভাগ্যের বিষয়টিও জড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশ জাতীয় নারী দল র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা দল মিয়ানমার, বাহরাইন এবং তুর্কিমিনিস্তানকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো এএফসি এশিয়ান উইমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপে কোয়ালিফাই করেছে। পর পর দু’বার সাফ শিরোপা বিজয়ীদের জন্য এটি অনেক বড় ‘বুস্টআপ’। তবে সাফ লেভেলের সঙ্গে এশিয়ান লেভেলের কোনো তুলনাই চলে না। আগামী বছর ১ থেকে ২১ মার্চ অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে এশিয়ান উইমেন্স ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বেশি। ‘বি’ গ্রুপে বাংলাদেশের তিন প্রতিদ্বন্দ্বী হলোÑ চীন, উত্তর কোরিয়া এবং উজবেকিস্তান। চীন ও উত্তর কোরিয়া তো বিশ্ব উইমেন্স ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে খেলে। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশকে কঠিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হবে। আর এর জন্য ভালো প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে দারুণ কিছু করে ফেলতে পারবেÑ এমনটি অবশ্য ভাবা হচ্ছে না। নারী দল যাতে র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে যাওয়া দলগুলোর বিপক্ষে মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টিতে সক্ষম হয় সেই লক্ষ্য বাস্তবায়িত করার চেষ্টায় কাজ করছে। ব্রিটিশ ফুটবল কোচ পিটার বাটলার। পিটার বাটলার মনে করেন তারা তাদের পরিকল্পনামাফিক চলছেন এবং চূড়ান্ত চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য স্কোয়ার্ড সেট করার জন্য কাজ করছেন। এখনও সময় আছে আড়াই মাসের বেশি। এই সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন যত বেশি হওয়া সম্ভব হবে খেলোয়াড়রা শিখতে পারবেন, তাদের অভিজ্ঞতাও বাড়বে। বাড়বে বড় দলের বিপক্ষে খেলার মতো মানসিক বল এবং সাহস। অতএব দ্বিপাক্ষিক এবং ফিফা ফ্রেন্ডলি ম্যাচ দেশে এবং বাইরে খেলার কোনো বিকল্প নেই।
এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করার পর বাফুফে ‘মিশন অস্ট্রেলিয়া’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট অর্থের প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত সরকারি বিশেষ অনুদান মেলেনি। বাণিজ্যিক স্পন্সররা উৎসাহ দেখিয়েছেন তবে তেমন ব্যাপক আকারে নয়। সম্প্রতি ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাসের জন্য মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইনফিনিক্স’ নারী ফুটবলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।
জানা গেছে, এশিয়ান কাপের জন্য বাফুফের যে বাজেট ধরা হয়েছে তার ৪০ শতাংশ দেবে ইনফিনিক্স। যেসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নারী ফুটবলের সঙ্গে আছে তারা তো আছেই, এ ছাড়া নতুন কোনো স্পন্সর নারী ফুটবলে এগিয়ে এসেছে এমন খবর জানা নেই। দেশে ব্যবসা করছে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে আসা উচিত।
গত অক্টোবরে বাংলাদেশ নারী দল দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে থাইল্যান্ডে। হেরেছে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ৩-০ এবং ৫-১ গোলে। এরপর ঢাকায় ত্রিদেশীয় সিরিজ। আজারবাইজান, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষরা বাংলাদেশ থেকে র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে। আজারবাইজান তো ইউরোপিয়ান ফুটবলের সঙ্গে (উয়েফা) সংশ্লিষ্ট। এই দলের প্রায় সব খেলোয়াড় ইউরোপের বিভিন্ন লিগে নিয়মিতভাবে খেলেন। মালয়েশিয়ার সঙ্গে বেশ কিছু সুযোগ পেয়ে সুযোগ কাজে না লাগানোর ব্যর্থতার জন্য বাংলাদেশ নারী দল শেষ পর্যন্ত হেরেছে ১-০ গোলে। ফুটবল গোলের খেলা। গোল করার সুযোগ কাজে না লাগাতে পারলে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ পেতেই হবে। শক্তিশালী আজারবাইজানের সঙ্গে দারুণ লড়াই করেছে। প্রথমে গোল খাওয়ার পরও গোল দিয়েছে বাংলাদেশ। খেলায় সমতা এনেছে (১-১)। ৮৩ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করার পর শেষ পর্যন্ত হেরেছে ২-১ গোলে। লড়াই করে এই হারার মধ্যে গ্লানি নেই বরং এই খেলা থেকে শেখা এবং অভিজ্ঞতা অনেক বেশি কাজে লাগবে আগামীতে। যারা ভাবছেন থাইল্যান্ডে দুটি খেলায় পরাজয়ের পর আবার দেশের মাটিতে দুটি খেলায় পরাজয় বিষয়টিকে এভাবে দেখা উচিত নয়। নারী ফুটবল প্রস্তুতির মধ্যে আছে। এবং সঠিক পথেই চলছে। হেরে গেছে বলেই সবকিছু শেষ হয়নি। সবাই এখন প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। ব্যস্ত উৎকর্ষতা বৃদ্ধির জন্য। বাংলাদেশ প্রস্তুতি নিচ্ছে ২০২৬ সালের মার্চে এএফসি উইমেন্স এশিয়ান কাপের জন্য। মালয়েশিয়া প্রস্তুতি নিচ্ছে আসন্ন সাউথ এশিয়ান গেমসের জন্য। আজারবাইজান প্রস্তুতি নিচ্ছে ২০২৭ সালের ফিফা উইমেন্স বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার জন্য। সবার জন্য প্রস্তুতি খুব গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন এবং সংশোধিত হওয়ার তো এটি উত্তম সুযোগ। বাংলাদেশ আগামীতে আরও কয়েকটি ম্যাচ খেলার কথা ভাবছে।
কোচ পিটার বাটলার আজারবাইজানের সঙ্গে খেলার পর বলেছেন, আমরা এমন একটা দলের বিপক্ষে খেলেছি, যারা অনেক ফান্ডিং পায়, যাদের পেশাদার লিগ আছে এবং দারুণ সব সুযোগ-সুবিধা পায়। বিপরীতে আমাদের কোনো ট্রেনিং সুবিধা নেই, মানসম্মত জিম নেই, এমনকি কোনো লিগও নেই। আমি তো আর জন্মদিনের পার্টির সেই জাদুকর নই যে টুপি থেকে সাদা খরগোশ বের করে দেখাব। আমি বাস্তববাদী মানুষ। নারী ফুটবলাররা সঠিকভাবে এগোচ্ছে সময়ের সঙ্গে।
আজারবাইজান দলের অধিনায়ক সেভিঞ্জ জাফারজাদের বক্তব্য হলো বাংলাদেশের ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলার খুব কৌশলী। তার দলটি আমাদের বিপক্ষে ভালোভাবেই লড়াই চালিয়ে গেছে। বিশ্বাস করি, এই কোচের অধীনে আগামীরা তারা আরও ভালো খেলবে।
কোচ পিটার বলেছেন, আমরা টানা চার ম্যাচ হেরেছি। বাস্তবতা তো বুঝতে হবে। আজারবাইজানের মেয়েরা যেখানে লাখ লাখ ডলার আয় করে এবং নিয়মিত ইউরোপের দলের সঙ্গে খেলে, সেখানে আমাদের মেয়েরা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও লড়াই করে চলেছে। তারা সাবির্কভাবে চেষ্টা করছেÑ তারা ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে। তার কথা হলো, সহজ প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জয়ের চেয়েও কঠিন প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করে শেখা অনেক ভালো। এশিয়ান লেভেলে ভালো করতে হলে সেই মানের দলের বিপক্ষেই খেলতে হবে। হারলে সমস্যা নেই, যতক্ষণ আমরা তা থেকে শিখতে পারি। এবং পরবর্তীতে কাজে লাগাতে পারি।
মেয়েরা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ফুটবল খেলেছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতি ম্যাচে চেষ্টা করেছেন অস্ট্রেলিয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। আমরা সেই লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছি। আড়াই মাস সময় আছে নারী দল মাঠের ফুটবলে আরও উন্নতি করতে সক্ষম হবে এই বিশ্বাস আমাদের আছে বলেছেন বাফুফের সভাপতি তাবিথ আউয়াল। তার আরও কথা হলো এশিয়ান কাপের আগে যতটা সম্ভব শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলতে চাই। হারলেও সমস্যা নেই, শিখতে পারব। সাফের টুর্নামেন্টগুলো মানের দিক থেকে খুবই নিচে। এশিয়ান পর্যায়ে টিকে থাকতে হলে সেই মানের প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়তে হবে নিয়মিতভাবে। এতে করে নারী ফুটবলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘টেকসই’ বিষয়টি বাস্তবে বাস্তবায়িত হবে। নারী ফুটবলে ইচ্ছাশক্তি সব সময় ইতিবাচক। খেলোয়াড়রা চান তাদের ভেতরের বারুদটা বাস্তবে জ্বালাতে। তারা বিশ্বাস করেন, উন্নতির জন্য শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ম্যাচ খেলাটা সঠিক সিদ্ধান্ত। এতে করে বারবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ মিলছে। মিলছে নিজেদের পরখ করে নেওয়ার সুযোগ।
ইকরামউজ্জমান
কলাম লেখক, সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া