× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

সাগরের বর্জ্য থেকে দৃষ্টিনন্দন পণ্য

তৌহিদ-উল বারী

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৪১ পিএম

সাগরের বর্জ্য থেকে দৃষ্টিনন্দন পণ্য

জেলেপাড়ার সকালের হাওয়া আজকাল যেন অন্য রকম। আগের মতো শুধু মাছের গন্ধ বা নৌকার কাঠের শব্দ নয়, এখন সেখানে ভেসে আসে সম্ভাবনার নতুন স্পন্দন। সেখানে তৈরি হয়েছে আর্থিক সচ্ছলতা ও নতুন সম্ভাবনা। সাগরের বুকে বছরের পর বছর জমতে থাকা যে বর্জ্য এতদিন ছিল মানুষের বিরক্তি, পরিবেশের বোঝা আর জেলেদের অসহায়তার কারণ, সেসবই আজ হয়ে উঠছে জেলেপাড়ার সম্পদ। ছেঁড়া জাল, প্লাস্টিক বোতল, ফেলনা কাগজ কিংবা ঠোঙার সঙ্গে পাটের দড়ি, মাছের আঁইশ, ম্যাক্রম দড়ি, কার্ডবোর্ড ইত্যাদির মিশ্রণে তৈরি হচ্ছে নান্দনিক ব্যাগ, চমৎকার অলংকার (কানের দুল), এমনকি ঘর সাজানোর আধুনিক ক্র্যাফট, যা শহরের বুটিকেও টক্কর দিতে পারে। এই উদ্যোগ শুধু ব্যবসা নয়; এটি রীতিমতো এক সামাজিক বিপ্লব। বহু বছর ধরে সাগর দূষণ নিয়ে আলোচনা হলেও, উপকূলের মানুষের হাতে ছিল না প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি বা দিকনির্দেশনা। আর এই ফাঁকেই বাড়তে থাকত প্লাস্টিক, মাছ ধরার জাল, পলিথিন, বোতলসহ হাজারো বর্জ্যের স্তূপ, যা সমুদ্রজীবনকে যেমন বিপন্ন করেছে, জেলেদের জীবনযাত্রাকেও তেমনিভাবে করেছে কঠিন। 

সাম্প্রতিক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক গবেষণা দলের ‘কমিউনিটি-ভিত্তিক প্লাস্টিক দূষণ হ্রাস : বাংলাদেশের সার্কুলার ইকোনমি ও বায়োডিগ্রেডেবল পণ্যের প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে প্রায় ১৯,০০০ ট্রলার ও নৌকা বছরে প্রায় ৪০,১১০ টন প্লাস্টিক-ভিত্তিক ফিশিং গিয়ার ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে। এর মধ্যে প্রায় ২,৭৪০ টন হয়ে যায় সমুদ্রে ফেলে দেওয়া। একই প্রেক্ষাপটে, চট্টগ্রাম শহরকে কেন্দ্র করে প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে তাদের প্রতিবেদন বলছে বছরে প্রায় ২,৫৭,৯১৩ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মধ্যে প্রায় ৭০,৮৩৩ টন (প্রায় ২৭%) বিষয়বস্তু ‘অম্যনেজড’ থেকে যায়। তবে এ পরিস্থিতির বিপরীতে পরিবেশ ও ছিন্নমূল মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে কাজ করছে একটি তারুণ্যনির্ভর উদ্যমী প্রচেষ্টা। ব্রাকের ইয়ুথ প্লাটফর্ম ‘আমরা নতুন নেটওয়ার্ক’র একটি গ্রুপের প্রজেক্ট মূলত এই সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। যেটির নাম ত্রি-জ (জল-জেলে-জীবন)। যেখানে উদ্যোক্তার ভূমিকায় আছেনÑ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটি ও পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ৭ জন শিক্ষার্থী। 

জেলেপাড়ার নতুন এই উদ্যোগটি শুধুমাত্র পরিবেশ রক্ষার একটি প্রচেষ্টা নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন এবং সামাজিক ক্ষমতায়নেরও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বছরের প্রায় ৩ মাস সমুদ্রের মাছ ধরতে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে কিংবা শীত মৌসুমে তুলনামূলক মাছ কমে আসার সময়ে বাড়িতে বসেই নতুন একটি উপার্জনের পথ খুঁজে পেলেন জেলে সম্প্রদায়। মূলত, জেলেরা এখন মাছ ধরার পাশাপাশি সমুদ্র থেকে ভেসে আসা বা জালে জড়িয়ে থাকা প্লাস্টিকের বোতল, নিজেদের ছেঁড়া জাল সংগ্রহ করে বাসায় নিয়ে আসছেন। যে ছেঁড়া মাছের জাল গতকালও সাগরের পানিতে ভাসছিল, আজ সেটাই দড়ির কারুকাজে পরিণত হচ্ছে নানা দৃষ্টিনন্দন পণ্যে। যে বোতল একসময় জেলেদের জালের ফাঁক গলে সাগরকে দূষিত করত, আজ সেটি থেকে তৈরি হচ্ছে ফুলদানি। যে প্লাস্টিকের টুকরো কিংবা ছেঁড়া জাল অপ্রয়োজনীয় ভেবে ফেলে দেওয়া হতো, আজ সেটাই পিসওয়ার্ক হয়ে দেয়ালে ঝুলছে শিল্পকর্ম হয়ে। এ ছাড়া মাছের উচ্ছিষ্ট আঁইশ ফেলে না দিয়ে, তা দিয়েই তৈরি হচ্ছে ঝলমলে গয়না, ফুলদানির ফুল, ঘর সাজানোর নানা উপকরণ। এ উদ্যোগ পরিবেশগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। বর্জ্য আর শুধু ফেলনা জিনিস নয়, এখন তা সম্পদ। সমুদ্রের প্লাস্টিক কমছে, তীরে জমে থাকা জালের স্তূপ হ্রাস পাচ্ছে, আর মানুষ বুঝতে পারছে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের প্রকৃত অর্থ। তবে সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক অংশ হলো মানসিক পরিবর্তন যেখানে বর্জ্য মানে ছিল ‘ঝামেলা’, সেখানে এখন তা মানে ‘সুযোগ’। যেখানে জেলেপাড়া ছিল শুধু কষ্টের গল্পে ভরা, সেখানে এখন আছে পরিবর্তনের গল্প।

এই উদ্যোগের কারণে একদিকে যেমন সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের ওপর চাপ কমছে, অন্যদিকে তেমনই স্থানীয় জেলে পরিবারগুলোতে আসছে বাড়তি রোজগারের সুযোগ। বিশেষত, যেসব মহিলা আগে ঘরের কাজ ছাড়া আর কোনো অর্থনৈতিক কাজের সুযোগ পেতেন না, তারা এখন এই কাজের মাধ্যমে স্বনির্ভর হয়ে উঠছেন। জেলেপাড়ার এই নতুন উদ্যোগ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, কঠিন সমস্যাগুলোকেও সৃজনশীলতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সুযোগে পরিণত করা সম্ভব। এই মডেল প্রমাণ করে যে, পরিবেশ রক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা তীরবর্তী আকমল আলী ঘাটের গোল চত্বর এলাকায় ছোট্ট একটি জেলেপাড়ায় গড়ে ওঠা ও উদ্যোগ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালীসহ সমুদ্র তীরবর্তী নানা উপকূলে ছড়িয়ে গেলে বদলে যেতে পারে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি, পরিবেশ, আর মানুষের চিন্তাভাবনার ধরন। সমুদ্রের বর্জ্য থেকে জীবিকার এমন নতুন গল্প এ যেন আশা আর সৃজনশীলতার এক নিখুঁত মিলন, যেখানে প্রতিটি রঙিন পণ্যের ভেতর লুকিয়ে আছে উপকূলের মানুষের নতুন স্বপ্ন। 

আমাদের প্রত্যাশা, এই ছোট্ট জেলেপাড়ার সফল উদ্যোগ একদিন দেশের অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে। কারণ, সাগরের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে, ভালো থাকবে আমাদের অর্থনীতিও। আমাদের সবার উচিত, এই ধরনের উদ্যোগকে সমর্থন করা এবং পুনর্ব্যবহারের সংস্কৃতিকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলা।


তৌহিদ-উল বারী 

শিক্ষার্থী, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা