× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

অঙ্গীকার হোক সমৃদ্ধ দেশ গড়ার

জনি সিদ্দিক

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৩৮ পিএম

অঙ্গীকার হোক সমৃদ্ধ দেশ গড়ার

ডিসেম্বর মাস, বাঙালির জীবনে এক নতুন সূর্যের অঙ্গীকার নিয়ে আসে। এটি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, বরং এটি মহান বিজয়ের মাস, লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুমহান প্রতীক। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। সেদিন ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ ছিল বাঙালির শত শত বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম অর্জন, যা এক চরম আকাঙ্ক্ষার পূর্ণতা দিয়েছে।

বিজয় দিবস কেবল উৎসবের দিন নয়, বরং এটি আত্মানুসন্ধান ও শপথের দিন। ত্রিশ লাখ বা তার বেশি শহীদের আত্মত্যাগ, অগণিত মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং কোটি কোটি মানুষের সীমাহীন কষ্টের ফসল আমাদের এই স্বাধীনতা। শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আবালবৃদ্ধবনিতা সেদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তির সংগ্রামে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত এবং ন্যায়ভিত্তিক ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠা করা।

বিগত ৫৪ বছরেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশ সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বহু দূর এগিয়েছে। একসময়ের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে আখ্যায়িত এই দেশটি আজ বিশ্বদরবারে উন্নয়নের রোল মডেল। অর্থনীতিতে ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি, পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকার বুকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ইত্যাদি মেগাপ্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। এসবই বিজয়ের চেতনার ফসল। দারিদ্র্যবিমোচন, শিক্ষার প্রসার এবং গড় আয়ু বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ এই অগ্রযাত্রার এক বড় প্রমাণ।

তবে বিজয়ের এই পথচলায় আমাদের সামনে এখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আমাদের এই অর্জনগুলো কেবল টেকসই করা নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য এই চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে মোকাবিলা করা অত্যাবশ্যক। সমাজের গভীরে এখনও দুর্নীতি একটি মারণব্যাধি হিসেবে প্রোথিত। দুর্নীতির মাধ্যমে কিছু দুষ্টলোক রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন করছে, অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে এবং উন্নয়নের সুফলকে সীমিত সংখ্যক মানুষের মধ্যে আটকে রাখছে। দুর্নীতির কারণে সাধারণ নাগরিকের জীবনযাত্রার মান বাড়ছে না এবং তাদের আস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করছে। দুর্নীতির এই শেকড় উপড়ে ফেলতে না পারলে, টেকসই উন্নয়ন কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে।

ফলস্বরূপ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ধনী-গরিব বৈষম্য উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জিডিপি বাড়লেও এর সুষম বণ্টন হচ্ছে না। সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে, যা সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে। এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী এবং একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্নের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই বৈষম্য নিরসনে দ্রুত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে এবং আয়বৈষম্য দূর করার জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন।

একই সঙ্গে, কর্মসংস্থানের অভাব আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বেকারত্ব তরুণ প্রজন্মকে হতাশ করছে। দেশের উচ্চশিক্ষা অর্জনকারী তরুণরা যখন মেধা থাকা সত্ত্বেও কাজের সুযোগ পান না, তখন হতাশা জন্ম নেয় এবং তাদের সৃজনশীল শক্তিকে আমরা জাতীয় উন্নয়নে ব্যবহার করতে পারি না। এই বেকারত্ব কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি জাতীয় অগ্রগতির প্রধান বাধা। মানসম্মত শিক্ষার অভাব, শিল্প ও একাডেমির মধ্যে সংযোগের দুর্বলতা এবং দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাব এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নতুন কৌশল এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে উৎসাহিত করা জরুরি। দুঃখের বিষয়Ñ বর্তমানে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত তথা তৈরি পোশাক খাতের অনেকগুলো কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে শুধুমাত্র রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে। বর্তমানে দেশের রপ্তানিভিত্তিক আয় একেবারে স্তিমিত হয়ে পড়েছে! অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অগ্রগতি বজায় রাখতে হলে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ সাবলীল রাখতে হবে। অবশ্যই রপ্তানি বৃদ্ধি করতে হবে। রপ্তানির সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপে ধাপে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা এখনও জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে রাখছে, যা যেকোনো জাতীয় সংকট মোকাবিলায় আমাদের শক্তিকে খর্ব করে। স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ছিল ঐক্যবদ্ধতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। কিন্তু এই বিভাজন সেই চেতনার পরিপন্থী। গণতন্ত্রের অর্থ কেবল নির্বাচন নয়, বরং ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীলতা এবং গঠনমূলক সমালোচনাকে গ্রহণ করার মানসিকতা। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে।

এ ছাড়াও,একবিংশ শতাব্দীর নতুন চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের সামনে দৃশ্যমান। পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো সমস্যাগুলো আমাদের টেকসই উন্নয়নকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত। ঘন ঘন বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করছে। এই সমস্যাগুলো মোকাবিলায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ। নদীমাতৃক এই দেশে নদীভাঙন রোধ ও নদী ব্যবস্থাপনায় জরুরি মনোযোগ দিতে হবে। নদীভাঙনের ফলে হাজার হাজার পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। উন্নত দেশসমূহে দেখা যায়, সাধারণত বিখ্যাত শহরগুলো নদীর তীরে অবস্থিত। তাদের কোনো নদীভাঙনের খবর পাওয়া যায় না। কিন্তু একমাত্র বাংলাদেশে নদীভাঙন একটি মারাত্মক ও ভয়ংকর সমস্যা। সুতরাং সর্বাগ্রে নদীভাঙনের প্রতিরোধে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। আধুনিক এবং কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে নদীভাঙন সমস্যার সমাধান করতে হবে। নয়তো হাজার হাজার পরিবার সর্বহারা ও নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখে আইনের শাসন সুনিশ্চিত করা এবং সর্বস্তরের দুর্নীতি দূর করা এখনও আমাদের জন্য কঠিন পরীক্ষা। সুশাসন প্রতিষ্ঠাই সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার চাবিকাঠি। অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য মৌলিক অধিকারের (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান) নিশ্চয়তা প্রদান করা আমাদের প্রধান কর্তব্য। এই লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি দরকার সামাজিক আন্দোলন এবং প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক জাগরণ। স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বজনীন ও মানসম্মত করা, বিশেষ করে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন করা এবং শিক্ষাকে আধুনিক ও কারিগরি দিক থেকে যুগোপযোগী করা জরুরি।

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন হলো এমন একটি দেশ, যেখানে অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে, যেখানে থাকবে না ধনী-গরিবের কোনো বৈষম্য, যেখানে দারিদ্র্যের কারণে কোনো শিশু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। প্রত্যেকটি নাগরিক বুঝে পাবে তার ন্যায্য অধিকার, তার মানবিক মর্যাদা। 

এই বিজয় দিবসে আমাদের প্রতিশ্রুতি হোকÑ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা একটি মানবিক, উন্নত এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোয় আলোকিত বাংলাদেশ উপহার দেব, যেখানে প্রতিটি মানুষ সমান সুযোগ নিয়ে বাঁচবে এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে। আমাদের জাতীয় পতাকা যেন চিরকাল ন্যায়, সাম্য এবং মানবিকতার প্রতীক হয়ে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। এটাই হোক মহান বিজয় দিবসে আমাদের অঙ্গীকার।


জনি সিদ্দিক 

সালনা, গাজীপুর

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা