ইমেইল থেকে
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৫৫ এএম
বাজারে গেলেই আজকাল মনে হয় রান্না নয়, চলছে আগুন সামলানোর মহড়া। চুলায় আগুন জ্বালানোর আগেই প্রথম ধাক্কা লাগে বাজারদরের আগুনে। পেঁয়াজের ঝাঁজ আর তেলের তেজ মিলে এমন এক অবস্থা তৈরি করেছে যে, সবজি, ডাল, মাংস তো দূরের কথাÑ সাধারণ রান্না করাই এখন চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিনের বাজার যেন এক নতুন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, আর ভোক্তা সেই পরীক্ষায় অসহায়ের মতো লিখছেÑ ‘আমি চেষ্টা করেছি, কিন্তু বাজেট আমাকে ফেল করে দিয়েছে।’ মানুষের আস্থা যেন বারবার ভেঙে পড়ছে বাজারের অস্বচ্ছতার কারণে।
পেঁয়াজের দাম বেড়েছে, এ যেন আমাদের চিরচেনা গল্প। কারও মনে নেই কবে পেঁয়াজের বাজার স্থির ছিল! যেন প্রতিবছরই কোনো না কোনো অজুহাতে এর দাম আকাশছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। কখনও আমদানি মন্থর, কখনও উৎপাদন কম, কখনও বৃষ্টি বেশি, কখনও খরা। কিন্তু এসব কারণের আড়ালেও একটা অদৃশ্য শক্তি বাজারে থাকে, যাকে আমরা মমতাভরে বলি ‘সিন্ডিকেট’। এদের কাজই হলো সাধারণ মানুষের নুনভাতের থালায় চাপ বাড়ানো।
পেঁয়াজের দাম এক লাফে ৪০ টাকা বেড়েছে। বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজিতে, যা কিছুদিন ধরে ১১০ থেকে ১২০ টাকা ছিল। ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি ও একই প্রেক্ষাপট পুনরাবৃত্তি করে। গেল বছরেও হঠাৎ করে তেলের দাম বেড়েছিল। কথিত আছেÑ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে। পরে দেখা গেল, দাম কমার পরও দেশীয় বাজারে সেই প্রভাবের দেখা নেই। এ বছর আবার সেই পুরনো গল্প।
কোনো ধরনের ঘোষণা ছাড়াই নীরবে ভোক্তা পর্যায়ে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সয়াবিন তেলের দাম। এক লাফে লিটারে বৃদ্ধি পেয়েছে ৯ টাকার মতো। নতুন করে বাজারে আসা ৫ লিটারের বোতল এখন বিক্রি হচ্ছে ৯৬৫ টাকায়। বোতলজাত প্রতি লিটারর দাম ১৯৮ টাকা, যা এতদিন ১৮৯ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া ভরা মৌসুমেও ঊর্ধ্বমুখী সবজির বাজারে স্বস্তি ফেরেনি। বেশিরভাগ সবজির দামই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
সামনে রমজান মাস। প্রতিবছর এই মাসেই বাজারে অস্থিরতার এক নিঃশব্দ উৎসব ও বছরের পর বছর একই দৃশ্য আমরা দেখি। রমজান সামনে এলেই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম লাফিয়ে লাগিয়ে বাড়তে থাকে, যেন মাসটি আসার আগমনী বার্তা শোনামাত্র কিছু শক্তিশালী মহল দাম বাড়ানোর বোতাম টিপে দেয়। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বাজার আবারও সাধারণ মানুষের দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে।
দাম বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে, তবে কোনোটাই এমন নয়, যা অভাবনীয়। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে নতুন মৌসুমি উৎপাদন বাজারে আসতে বিলম্ব হয়েছে, পুরনো মজুদ কমে এসেছে, কিন্তু এই ঘাটতি কখনোই এত বিশাল নয় যে দাম হঠাৎ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। বারবার তেলের দাম বৃদ্ধিতেও একই চিত্র উঠে আসে।
স্পষ্ট কোনো কারণ না থাকলেও যখন নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়, তখন ক্রেতাদের মনে অস্থিরতার এক ধোঁয়াশা তৈরি হয়। বিশেষ করে, যারা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভর করে জীবন চালায় অর্থাৎ দিনে আনে দিনে খায়, তাদের জন্য প্রতিটি দামবৃদ্ধি যেন নতুন এক আতঙ্ক। হিসাব মেলাতে না পেরে তারা থমকে দাঁড়ায়Ñ কোথায় কমাবে, কীভাবে চলবে? মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অবস্থাও আলাদা নয়; বাড়তি ব্যয়ের চাপে তাদের সংসারের ভারসাম্য প্রতিদিনই টলে যায়। তবুও আশাই ভরসাÑ যে একদিন সাধারণ মানুষ আবারও নিশ্চিন্ত হয়ে বাজারে যাবে, আর ন্যায্য দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ফিরতে পারবে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে। এটাই আমাদের প্রত্যাশাÑ এটাই সময়ের দাবি।
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়