× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

টাঙ্গাইল শাড়ির স্বীকৃতি

বিশ্ববাজারে স্থায়ী অবস্থান নিশ্চিত হোক

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৩৫ এএম

বিশ্ববাজারে স্থায়ী অবস্থান নিশ্চিত হোক

এক সময় বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের শিল্পসমৃদ্ধ অঞ্চল। কেবল সুজলা,সুফলা,শষ্যশ্যামলাই নয়- এই দেশ ছিল শিল্প সামগ্রীর জন্যও প্রসিদ্ধ। তখন যান্ত্রিক কাল নয়, হস্ত ও কুটির শিল্পই ছিল উৎপাদন ব্যবস্থার প্রাণ। কারুশিল্পীরা তাদের নিখুঁত হাতে তৈরি করতেন মসলিনসহ নানান রকমের বস্ত্র। তৈরি হতো হাতির হাড় ও দাঁতের তৈরি হরেক-রকম সামগ্রী। কাঁসা ও পিতলের তৈজসপত্র এবং কাগজসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্য কিনতে ভিড় করতেন বিদেশী বণিক ও সওদাগরেরা। দেশজ চাহিদা মিটিয়ে সেগুলো বিদেশে রপ্তানি হতো। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা সেই সমৃদ্ধ শিল্পকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে কালের ঝাপটা বাঁচিয়ে এখনও টিমটিম করে টিকে আছে দু-একটি। তার মধ্যে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির কথা বলা যায়।

টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা ও নান্দনিকতার এক অনন্য প্রতীক। দীর্ঘকাল ধরে এই শাড়ি শুধু পোশাকই নয়, বাঙালি সংস্কৃতি বহনকারী হিসেবে পরিচিত। তাঁতশিল্পীদের নিবিড় শ্রম, নকশার উৎকর্ষ এবং রঙের সুষম সমন্বয়ে গড়ে ওঠা টাঙ্গাইল শাড়ি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সুনাম কুড়িয়েছে বহুদিন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইউনেস্কোর অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় শতাব্দী প্রাচীন টাঙ্গাইল শাড়ি বুনন শিল্পের অন্তর্ভুক্তি বিষয়টিকে নতুন মাত্রায় তুলে ধরেছে। আমরা মনে করি, এ স্বীকৃতি শুধু ঐতিহ্য রক্ষার সনদ নয়; বরং বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পের সামনে খুলে দিয়েছে বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দরজা।

৯ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর আন্তঃসরকারি কমিটির ২০তম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অধিবেশনের আওতায় এটি বাংলাদেশের ষষ্ঠ একক নিবন্ধন। আর এই পর্ষদে প্রথমবারের মতো সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বিগত চার বছরে দ্বিতীয় নিবন্ধন। সভায় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের দলনেতা এবং ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত খন্দকার এম তালহা সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, এই স্বীকৃতি দেশের জন্য একটি অসামান্য গৌরব। দীর্ঘ ২০০ বছরের অধিক সময় ধরে টাঙ্গাইলের তাঁতিদের অনবদ্য শিল্পকর্মের বৈশ্বিক স্বীকৃতি এটি। তিনি আরও বলেন, টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশের সকল নারীর নিত্য পরিধেয়, যা এই শাড়ি বুনন শিল্পের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের পেছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। 

উল্লেখ্য, এর আগে ২০০৮ সালে বাউল সংগীত, ২০১৩ সালে জামদানি শাড়ি, ২০১৬ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রা, ২০১৭ সালে শীতলপাটি এবং ২০২৩ সালে ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্র একই স্বীকৃতি পেয়েছিল। আমরা মনে করি, দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সামগ্রিক সুরক্ষায় এই স্বীকৃতি নতুন মাত্রা যোগ করল।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, ঢাকার অদূরে দেশের মধ্যাঞ্চলের জেলা টাঙ্গাইলের নামানুসারেই টাঙ্গাইল শাড়ির পরিচিতি। এ অঞ্চলের শত শত পরিবার বংশপরম্পরায় এই পেশায় যুক্ত। দেশীয় সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এই শাড়ির কদর রয়েছে ভারত উপমহাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। প্রতিটি শাড়ি ঐতিহ্য ও দক্ষ কারুশৈলীর এক অনন্য সংমিশ্রণ। এতে ফুটে ওঠে স্থানীয় সংস্কৃতির নান্দনিক নকশা ও মোটিফ। বিভিন্ন উৎসব ও বিয়ের অনুষ্ঠানে এই শাড়ির ব্যবহার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণত পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সুতা রঙ করা, তাঁত বোনা এবং নকশা তৈরির কাজ করেন। বাড়ির নারীরা চরকায় সুতা কেটে বা সুতা গুছিয়ে তাদের কাজে সহায়তা করেন।

আমরা মনে করি, বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যের কাহিনী যত শক্তিশালী ও ঐতিহ্যনির্ভর হয়, তার গ্রহণযোগ্যতা তত বাড়ে। টাঙ্গাইল শাড়ির ক্ষেত্রে এই স্বীকৃতি ক্রেতাদের কাছে সেই আস্থা ও গর্ব বাড়াবে। ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অভিজাত ক্রেতারা ঐতিহ্যবাহী ও হেরিটেজ টেক্সটাইলের প্রতি আগ্রহী। তাদের কাছে এখন টাঙ্গাইল শাড়ি শুধু একটি সুন্দর ড্রোপ নয়; বরং একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক, ইতিহাস ও কারিগরির মেলবন্ধন। ফলে রপ্তানিতে নতুন বাজার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। সেই বিবেচনায় এই শাড়ি কেবল সাংস্কৃতিক স্মারকই নয়, এটি শত শত তাঁতি পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎসও। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং মেশিনে তৈরি সস্তা কাপড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার কারণে বর্তমানে এই শিল্প চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এতে নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে পারিবারিক এই পেশায় আসার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। বিষয়টি দায়িত্বশীলদের সুনজরে আসা জরুরি বলে আমরা মনে করি।

তবে আশার কথা, এই স্বীকৃতি স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতার প্রতি বৈশ্বিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বর্তমানে হাতে বোনা শাড়ির বিশ্ববাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ‘হ্যান্ডমেড’ বা ‘আর্টিজানাল’ লেবেলবিশিষ্ট পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি এবং এর চাহিদাও ব্যাপক। ফলে টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লীগুলোতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে, নারীদের অংশগ্রহণ এ শিল্পে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন করে শক্তিশালী করবে। বৈশ্বিক কোম্পানি ও ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনাও তৈরি হবে, যা কারিগরদের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানে কাজ করার অভিজ্ঞতা দেবে।

আমরা আরও মনে করি, এই স্বীকৃতির ইতিবাচক প্রভাব পর্যটন শিল্পেও পড়বে। বিদেশি পর্যটকরা ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের উৎপাদনপ্রক্রিয়া দেখতে আগ্রহী। টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লীগুলোকে কারিগরিভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে। পাশাপাশি দেশের ফ্যাশন হাউস, উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকদেরও নতুন উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে।

ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এখন প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, যথাযথ বিনিয়োগ এবং কারিগরদের সুরক্ষা, যাতে এই ঐতিহ্য বিশ্ববাজারে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিতে পারে। আমরা চাই, টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প নতুন অর্থনৈতিক রূপান্তরের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হোক।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা