× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজনীতি

সংসদ কি মধ্যবিত্ত শ্রেণির হবে

এম. এ. বাকী বিল্লাহ

প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৩০ এএম

সংসদ কি মধ্যবিত্ত শ্রেণির হবে

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য বহুদিন ধরে ঘুরে ফিরে আসেÑ আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী হচ্ছে মধ্যবিত্ত, অথচ রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাসীন প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদে মধ্যবিত্ত শ্রেণি অনুপস্থিত। এই জনগোষ্ঠীই কর দেয়, সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে হাপিত্যেশ করে, বাড়তি বাজারদরে হাঁসফাঁস করে; অথচ দেশের নীতিনির্ধারণের টেবিলে তাদের চেয়ার প্রায়ই খালি থাকে। ফলে প্রশ্নটি বারবারই ফিরে আসেÑ জাতীয় সংসদ মধ্যবিত্ত শ্রেণির হবে কবে? প্রশ্নের মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস আছে, তা বছরের পর বছর ধরে আমাদের গণতন্ত্রের বুকেই জমে আছে।

বিষয়টি বোঝার জন্য সামান্য অতীতের দিকে তাকাতেই হয়। ব্রিটিশ ভারত থেকে পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনীতির মূল নেতৃত্ব এদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছ থেকেই এসেছে। নবাব, জমিদার বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিল ঠিকই, কিন্তু জাতীয় নেতৃত্বের মুখ ছিলেন শিক্ষক, আইনজীবী, ছাত্রনেতা, সাংবাদিক ও মধ্যবিত্ত পেশাজীবীরা। ১৯০৬ সালের ঢাকার মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের বড় অংশই ছিলেন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মুসলমান। ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাবের স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে অনেকে ছিলেন ততোধিক প্রভাবশালী হলেও সাংস্কৃতিক-শিক্ষিত মধ্যবিত্তের আদর্শে দীক্ষিত মানুষ।

পাকিস্তান আমলে পূর্ববাংলার রাজনৈতিক কাঠামোতে মধ্যবিত্ত শ্রেণিই প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে ছাত্র-শিক্ষক, তরুণ কর্মকর্তা, ডাক্তারÑ সবাই ছিলেন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা। ক্ষমতা তখনও পশ্চিম পাকিস্তানের আমলাতান্ত্রিক-সামরিক জোটের হাতে; কিন্তু পূর্ববাংলার প্রতিরোধ, সংগঠন ও সাংস্কৃতিক উত্থান পরিচালনা করেছে মূলত মধ্যবিত্ত তরুণ সমাজ। ঢাকার কলেজ-ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী, বুদ্ধিজীবী সমাজ, সাংবাদিকরা ৫০ থেকে ৬০-এর দশক পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রতিরোধের নেতৃত্ব দিয়েছে।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানেও মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণির রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও গণভিত্তি ছিল। এই আন্দোলন পরিচালনা করেছেন ছাত্রনেতা-আইনজীবী-শিক্ষার্থীদের ওই মধ্যবিত্ত কর্মীরা; তারা শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সংগঠন দাঁড় করায়। একই সঙ্গে অর্থনীতিবিদ, শিক্ষকসমাজ ও সাংবাদিক, তাদের সকলের অংশগ্রহণ ছিল এই আন্দোলনে। 

১৯৭০-এর নির্বাচনের আগ পর্যন্ত পূর্ববাংলার রাজনীতি মূলত মধ্যবিত্তের হাতে ছিল। তাদের আদর্শ ছিল ভাষা, অধিকার, বৈষম্য দূর করা, আত্মমর্যাদা রক্ষা করা, ক্ষমতা নয়, নীতির ভিত্তিতে রাজনীতি। স্বাধীনতার পরও সাংবিধানিক চিন্তা, রাষ্ট্রগঠন, প্রশাসনিক কাঠামোÑ এসবের মূল কারিগর ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আমলা ও মধ্যবিত্ত চিন্তাশীল রাজনীতিকরা।

কিন্তু সময়ের স্রোত বদলে যায়। রাষ্ট্রক্ষমতার রঙ গাঢ় হতে থাকে। অর্থনীতি বাড়ে, ব্যবসায়িক প্রভাব বাড়ে, সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতাগোষ্ঠী শক্তিশালী হয়। এরপর ধীরে ধীরে রাজনীতিতে অর্থশক্তির আধিপত্য শুরু হয় এবং এখানেই মধ্যবিত্তের দুর্ভাগা পতন।

আজ বাংলাদেশের সামাজিক-আর্থিক কাঠামোতে ধনীশ্রেণি ক্ষমতার কাছে এতটাই সুবিধাপ্রাপ্ত যে সংসদে তাদের প্রবেশ প্রায় স্বাভাবিক অধিকার। তারা শুধু আর্থিকভাবে শক্তিশালী নয়; প্রশাসনিক, ব্যবসায়িক, এমনকি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কেও একধরনের অদৃশ্য ‘সুপার পাওয়ার’ বহন করে। অন্যদিকে, নিম্নবিত্ত সংসদে যেতে পারে না বাস্তব সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি, শিক্ষায় এগিয়ে, রাজনৈতিক সচেতনতায় পরিপূর্ণ কিন্তু সংসদে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অসহায়।

রাজনৈতিক দলগুলোও প্রার্থী বাছাইয়ে বাস্তবতার চেয়ে সম্ভাব্য ‘জয়ের গ্যারান্টি’কে বেশি মূল্য দেয়। ফলে বিত্তশালী, প্রভাবশালী ও পরিচিত মুখেরা দলে দলে মনোনয়ন পান; আর নীতিগত, জনপ্রিয়, ভদ্র, শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা দলের অফিস কক্ষে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলেনÑ ‘ভাই, সময়টা পক্ষে নেই।’ যেন নিজের দেশেই ‘সময়ের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা নাগরিক’ হয়ে আছেন তারা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে মধ্যবিত্তের ঘাম, শ্রম, কর ও নিয়মনীতি মেনে চলার স্বভাব এই রাষ্ট্রকে দাঁড় করায়, সেই শ্রেণিই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয় রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে।

রাজনীতিবিদরা বলেন, মধ্যবিত্তের বৈশিষ্ট্যই অনেক ক্ষেত্রে তাদের সংসদ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। তারা নিয়ম মানে, আইন মানে; ‘পাওয়ার পলিটিক্সে’ দক্ষ নয়; পৃষ্ঠপোষকতা চায় না; এবং নিজের ব্যক্তিজীবন ও মর্যাদাকে সহজে বাজি ধরতে চায় না। অন্যদিকে, ক্ষমতা ও প্রভাবের খেলায় নিজেদের নিরাপদ রাখার প্রবণতাই তাদের সংসদীয় রাজনীতির প্রতিযোগিতায় দুর্বল করে দেয়। কিন্তু রাষ্ট্র তো সেই মানুষদেরই প্রতিনিধিত্ব করবে, যারা নিয়ম মানে, নীতি মেনে চলে, সৎ থাকে, এটাই তো গণতন্ত্রের মূল কথা। বাস্তবে হয় উল্টোÑ নীতিমানদের জন্য বরাদ্দ থাকে করতালি; ক্ষমতা যায় শক্তিমানদের হাতে।

তবে বাস্তবতা যতই কঠিন হোক, সমাজবিজ্ঞানী বলেছেন, ‘মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনৈতিক উত্থান ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই গণতন্ত্র গড়তে পারে না।’ কারণ এই শ্রেণি সাধারণত আইনের শাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, দুর্নীতি-নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাতের উন্নয়ন, এমন বাস্তবমুখী নীতি নিয়ে আগ্রহী থাকে; আবেগ নয়, তথ্য ও গবেষণায় বিশ্বাসী হয়; আর ক্ষমতার অপব্যবহারকে ভয় পায়।

বাংলাদেশেও এমন উত্থান অসম্ভব নয়, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেও ঘটবে না। প্রয়োজন হবে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তনের। প্রথমত, নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া মধ্যবিত্ত কখনোই সংসদে ঢোকার সুযোগ পাবে না। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে নয়, বরং সততা, জনপ্রিয়তা, সামাজিক কাজ, গবেষণা ও নীতি-জ্ঞানকে মূল্যায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক অর্থনীতি থেকে কালো টাকার প্রভাব কমাতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণÑ মধ্যবিত্তকে নিজস্ব ভীতি কাটাতে হবে; রাজনীতিকে অশুভ, ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘অন্যদের কাজ’ হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে।

আজকের তরুণ মধ্যবিত্তের কাছে রাজনীতি মানেÑ ফেসবুক পোস্টে তর্ক, চায়ের দোকানে বিশ্লেষণ, আর নির্বাচন এলেই ভোট দেওয়া। কিন্তু গণতন্ত্র চাইলে শুধু ভোটার হয়ে নয়, প্রার্থী হয়েও দাঁড়াতে হয়। রাষ্ট্রকে বদলাতে হলে রাষ্ট্রের ভেতরে ঢুকতে হয়। শুধু অভিযোগ দিয়ে সংসদ বদলায় না; সংসদে প্রবেশ করলে বদলায়।

মাঝেমধ্যে ভাবি, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত যদি একদিন সিদ্ধান্ত নেয় যে ‘এদেশ আমরা গড়ব’Ñ তাহলে দৃশ্যপট বদলাতে সময় লাগবে না। সংসদে তারা যখন থাকবে, তহবিল বণ্টন থেকে শিক্ষানীতি, সবই মধ্যবিত্তের চিন্তা ও বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করবে। তখন হয়তো রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হবে সবার চিকিৎসা, ভালো স্কুল, কর্মসংস্থান, সুশাসনÑ যা সর্বদাই মধ্যবিত্তের স্বপ্ন।

কিন্তু সেই দিন আসবে কবে? 

যে দেশে মধ্যবিত্ত শক্তিশালী, সেই দেশের গণতন্ত্রও শক্তিশালী। আর যে সংসদ মধ্যবিত্তের প্রতিনিধিত্ব করে, সেই সংসদই সত্যিকার অর্থে জনগণের সংসদ। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত কি সেই পথে হাঁটবে? সেটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা।


এম. এ. বাকী বিল্লাহ

কলাম লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা