× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জলাভূমির প্রতি মমত্ব বাড়াতে হবে এবং জলাভূমিকে ফিরিয়ে আনতে হবে

ড. এম. এ. সোবহান পিপিএম

প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:৫৯ পিএম

ড. এম. এ. সোবহান পিপিএম।

ড. এম. এ. সোবহান পিপিএম।

জলাভূমি শুধুই জলাশয় বা জল বিভাজিকা নয়। এর অনেক অনেক গুরুত্ব রয়েছে। জলাভূমি প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও সর্বোপরী মানব জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জলাভূমির অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বও অপরিসীম। জলাভূমিকে কোন কোন পরিবেশ বিজ্ঞানী প্রতিবেশের রক্ত বা ব্লাডের সঙ্গে তুলনা করেছেন; আবার কেহ কেহ একে প্রতিবেশের হৃদয় হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। তাছাড়া জীব-বৈচিত্র্যের অস্তিত্বের প্রয়োজনে এবং প্রাণী ও উদ্ভিদের সুস্থভাবে ও সঠিকভাবে বেঁচে থাকার নিমিত্তে জলাভূমি সমূহ বাঁচাইয়া রাখা জরুরী। এ অমূল্য সম্পদকে অবহেলা করা যাবে না এবং আমরা অবহেলা করতে পারি না। সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এবং কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন ও প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। 

আমাদের দেশের অন্যতম একটা বড় সমস্যা হলো আমাদের শহর ও নগরগুলোর উর্ধ্বমূখী (Vertical) সম্প্রসারণ; তার পরিবর্তে আমরা অনুভূমিক (Horitontal)  সম্প্রসারণ করতে পারি। যার ফলে নদ-নদী, নীচু জমি, খাল, বিল, জলাশয়, জলাভূমি প্রভূতি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। আমাদের শহরগুলোকে আমরা কংক্রিটের রাস্তা, সবকিছু কার্পেটিং বা প্লাস্টার করে দিতে চাই। ফলশ্রুতিতে বৃষ্টির পানি ভূ-পৃষ্ঠের নীঁচে পৌঁছাতে পারে না। উপরুন্ত, জলাবদ্ধতার কারণে বৃষ্টির পানি জলাশয়গুলিতে পৌঁছায় না। এতদভিন্ন, জলাভূমি ভরাট করার কারণে প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ধ্বংস হচ্ছে। সুতরাং আমাদের গ্রাউন্ড ওয়াটার পুনরায় পূর্ণ হচ্ছে না। বাংলাদেশে ভূমিদস্যুরা জলাভূমি ধ্বংস করার নেপথ্যে বড় ভূমিকা রেখে চলেছে। তাছাড়া সূত্র থেকে জানা যায়, ভূমিদস্যুরা সচেতন নয় আবার তারা সংগঠিত। তারা প্রকৃতপক্ষে জানে না; আসলে তারা পরিবেশ ও প্রতিবেশের কত বড় ক্ষতি করে চলেছে। তারা পরিবেশ সংক্রান্ত অপরাধও করে চলেছে। জলাভূমি ভরাটের কারণে জলবদ্ধতা এবং বন্যা হয়ে থাকে ও জলাভূমি ধ্বংস হওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ঠ এলাকার ওয়াটার টেবিল দিন দিন নিশ্বেষ হচ্ছে। 

জলাভূমির অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও খাদ্য নিরাপত্তা 

জলাভূমির গুরুত্ব অপরিসীম বিধায় জলাভূমি সংরক্ষণে সকলে সচেষ্ঠ হতে হবে। উপকূলীয় জলাভূমি যেমন-সুন্দরবন ঘূর্ণীঝড়, সুনামী, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহকে রক্ষা করে এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় বাফার হিসাবে কাজ করে। এতদভিন্ন. সুন্দরবন সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, গোলপাতা, মধু, মোম, বাঘ, হরিণ, বানর, বন মোরগ, পাখি, শুকুর, সাপ, ডলফিন, কুমির, মাছ ও অন্যান্য প্রাণী, পাখি ও সরীসৃপের আবাসস্থল; যা ঐ এলাকার জীবন, জীবিকা ও দেশীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রেখে চলেছে। জলাভূমি একদিকে যেমন পানিকে দূষকমুক্ত করে এবং অন্যদিকে পানির গুণাগুণের উৎকর্ষ স্বাধন করে। উপরুন্ত, জলাভূমি বৃষ্টি ও বন্যার অতিরিক্ত পানি ধরে রাখে, ইহা পানি প্রবাহের বেগ, গতি এবং পরিমাণ কমায়ে দেয় ও জান-মালের ক্ষতি কমায়। জলাভূমি ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর পুনরায় পূর্ণ করে; যা মানুষের পানীয় জলের বড় উৎস হিসাবে ব্যবহৃত হয় (গোপাল ও চোহান, ২০০৬)।

জলাভূমি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মৎস্যের প্রাণকেন্দ্র বলে অভিহিত। কেননা দেশের মানুষের শতকরা ৬০ ভাগ আমিষ এ উৎস থেকে আসে। এস, এন, ইসলাম (২০১৬) এক গবেষণা থেকে জানান, জলাভূমিগুলি বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রজনন ও নার্সারী হিসাবে কাজ করে এবং লক্ষ লক্ষ জেলে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হয়ে থাকে। হাওড়, বাওড়, বিল প্রভূতি জলাভূমি বন্যা বাহিত উর্বর পলি ধারণ করে; যা বোরো ধান আবাদে এবং বেশি ফসল ফলনে প্রভূত সহায়তা করে। ইহা ছাড়া বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরগুলি লক্ষ লক্ষ দেশীয় এবং পরিযায়ী পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এ হাওরগুলি জলজ প্রাণিরও এক বড় আবাসস্থল (আই ইউ সি এন, ২০১৫)। জলাভূমি মানুষকে অকৃত্রিম বিনোদন দিয়ে থাকে। 

বর্ষাকালে নৌকা বাইচ, নাটক, যাত্রা, পিঠা উৎসব, ঐতিহ্যবাহী গান-যেমন ভাটিয়ালী, জারি, সারি ইত্যাদি ও অন্যান্য উৎসবগুলি জলাভূমির পরিবেশেই আয়োজিত হয়ে থাকে এবং আবাল বৃদ্ধ-বণিতার অংশগ্রহণে উৎসবগুলি প্রাণ চঞ্চলতা ও সফলতা পেয়ে থাকে। 

বাংলাদেশের জলাভূমিগুলি নানা হুমকীর সম্মূখীন

প্রথমত: বাংলাদেশের জলাভূমিগুলি বিভিন্নমূখী সমস্যায় আক্রান্ত। কৃষিকাজ, ঘরবাড়ী তৈরি, স্থাপনা তৈরি, শিল্প, কল-কারখানা তৈরি, বিনোদন কেন্দ্র, খামার ইত্যাদি তৈরি করতে জলাভূমি জবর দখল করা হয়ে থাকে। তাছাড়া জলাভূমি ভরাট করে; প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়; ফলে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। 

দ্বিতীয়ত: অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং অবৈধ মাছ শিকার করার কারণে মাছের প্রজনন ব্যাহত হয় এবং ছোট ছোট মাছ, পোনা-মাছ, বড় মাছ ও অন্যান্য মাছ মারা যায়। 

তৃতীয়ত: শিল্প, কৃষি ও গৃহস্থালীর বর্জের দূষণের মাধ্যমেও জলাভূমির ক্ষতি হয়ে থাকে। 

চতুর্থত: বাংলাদেশের উজানে বাঁধ এবং ব্যারেজ নিমার্ণের ফলে পানি প্রবাহকে বাধাগ্রস্থ করা হয়ে থাকে বলে জানা যায়।

পঞ্চমত: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় জলাভূমিতে সমুদ্রের লোনা পানির অনুপ্রবেশ ও দূষণ সংশ্লিষ্ঠ জলাভূমির জন্য হুমকী তৈরি করছে। 

এখন জলাভূমির ধ্বংস ও ধ্বংসের প্রভাবের দিকে একটু আলোকপাত করা যাক। জলাভূমি ধ্বংসের ফলে আমাদের পরিবেশ ও প্রকৃতির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। জলাভূমির বিলুপ্তির সাথে সাথে দেশীয় প্রজাতির মাছ, জলজ প্রাণী, পশু, পাখি, কচুরি পানা, শাপলা, পদ্ম এবং অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ নিশ্বেষ হচ্ছে। আর মানুষ খাবার পানি, পশু-পাখির খাবার পানি, কৃষি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চাষের পানি, শিল্প ও কল-কারখানার জন্য ব্যবহৃত পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। 

একজন বিশেষজ্ঞ একদা বলছিলেন সারফেস ওয়াটার বা ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানির অভাবে বায়ুমন্ডলে ময়েশচারের অভাব ঘটে এবং মানব শরীরে শুষ্কতা দেখা দেয়, ফলে প্রাণী ও উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। উপরুন্ত, বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতি স্বাধীত হয়। বেশ কয়েক বছর পূর্বে ইমেরিটাস প্রফেসর নজরুল ইসলাম স্যারের একটা সাক্ষাৎকার শুনেছিলাম, তো স্যার বলছিলেন থাইল্যান্ড ১০-১২ টি খালকে উদ্ধার করেছে। আমরাও বেগুনবাড়ী খালকে মনোরম নয়নাভিরাম ও অনিন্দ্য সুন্দর হাতিরঝিলে রুপান্তরিত করতে পেরেছি। এখন তা নগরবাসীর বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। 

প্রায় চার দশক পূর্বে আমার এক কলেজ শিক্ষক চাচা একদিন আমাকে বলেছিলেন, এশিয়ার দেশগুলোতে যখন কোন নতুন শহর বা কোন প্রতিষ্ঠান করা হয় তখন নীচু জমি বা জলাশয়কে বেছে নেয়া হয়। এর একটা বড় সুবিধা হলো কম পয়সায় ভূমি পাওয়া যায়; সেক্ষেত্রে কেবলমাত্র জলাশয় ভরাট করলেই স্থাপনা তৈরি করা যায়। আর সেজন্যই শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা দেখা যায়। বাংলাদেশে অনেক নীচভূমি ও জলাভূমি ভরাট করে অনেক প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনা করা হয়েছে মর্মে অনেক তথ্য রয়েছে। এক সময় রাজশাহী শহরকে বলা হতো পুকুরের শহর। অথচ এখন কদাচিৎ রাজশাহী শহরে পুকুর দেখা যায়। আমরা আমাদের নীচভূমি বা জলাশয়গুলি প্রতিনিয়ত ভরাট করে চলেছি। আমরা আমাদের নদ-নদী, হাওর, বাওড়, বিল, ঝিল, পুকুর, খাল, দীঘীগুলোকে খনন করতে পারি এবং অবৈধ দখলমুক্ত করতে পারি। তাছাড়া দূষিত জলাশয়গুলিকে চিহ্নিত করতে পারি এবং দূষণ মুক্ত করে সেগুলোকে পূর্ণজন্ম দিতে পারি। তাহলে জলাভূমিগুলি বাঁচবে। সেই সাথে আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীব-বৈচিত্র রক্ষা পাবে।

লেখক: ড. এম. এ. সোবহান পিপিএম

কমান্ড্যান্ট (ডিআইজি), পরিবেশ বিজ্ঞানী

পুলিশ স্পেশাল ট্রেনিং স্কুল (পিএসটিএস), বেতবুনিয়া, রাঙ্গামাটি

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা