× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নারীর প্রখর স্মৃতিশক্তি

নিউরোসায়েন্সও কী তাই বলে

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, দাউদ ইব্রাহিম হাসান

প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:৫৮ এএম

 নিউরোসায়েন্সও কী তাই বলে

মানুষের হৃদয়ের গভীরে যে আবেগ খেলা করে, সে কি শুধু এক মনগড়া অনুভূতি? নাকি তার শিকড় প্রোথিত আমাদের রক্ত-মাংসের গভীরে, মস্তিষ্কের অতি সূক্ষ্ম রাসায়নিক প্রবাহে? মানুষের আবেগ শুধু মানসিক অবস্থা নয়Ñ এটি মস্তিষ্কের রাসায়নিক, স্মৃতি-প্রক্রিয়াকরণ, হরমোন এবং সামাজিক শিক্ষার সম্মিলিত ফল। বিশেষত নারীর ক্ষেত্রে, এই আবেগ যখন স্মৃতির সঙ্গে মিশে যায়, তখন তা হয়ে ওঠে এক রহস্যময় নদীর মতোÑ উচ্চকিত নয়, কিন্তু যার গভীরতা মাপা অসম্ভব। নারীদের ক্ষেত্রে এই সমন্বয় আরও সূক্ষ্ম, আরও জটিল এবং প্রায়শই আরও তীব্র। প্রায়শই বলা হয়, ‘নারীরা ভুলে যান না’। অনেকেই একে ব্যক্তিগত মনোভাব, আবেগপ্রবণতা বা রাগের গতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু স্নায়ুবিজ্ঞান দেখায়, এর পেছনে আছে গভীর বায়োকেমিক্যাল সত্য।

গবেষণায় প্রমাণিতÑ নারীদের মধ্যে গড়ে সেরোটোনিনের কার্যকারিতা তুলনামূলকভাবে কম। সেরোটোনিনের গতিশীলতার সঙ্গে স্মৃতিশক্তির জৈবিক সংযোগ রয়েছে। এর মানে এই নয় যে তারা দুর্বল; বরং আবেগ ও স্মৃতি প্রক্রিয়ায় তারা আরও সংবেদনশীল। ২০০২ সালে হারিরি এবং কয়েকজন গবেষক খুঁজে বের করেন যে, কম সেরোটোনিন অ্যামিগডালাকে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে, যা আবেগের সঙ্গে যুক্ত স্মৃতিগুলোকে আরও দৃঢ়ভাবে মস্তিষ্কে স্থায়ী করে। ফলে, নারীর মানসিক অভিঘাত শুধু ঘটে না; তা প্রতিফলিত হয়, বিশ্লেষিত হয় এবং গভীরভাবে মস্তিষ্কে গেঁথে যায়। এই কারণেই নারীরা আবেগীয় অভিজ্ঞতাকে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে রূপান্তর করতে সক্ষম শুধুমাত্রই ইচ্ছা থেকে হচ্ছে এমনটাই নয়Ñ এটা নার্ভাস সিস্টেমের এক জটিল ধারা, এটি বায়োলজির একটা ফলাফলও।

‘যেসব নারী প্রচণ্ড রেগে যান কিন্তু উচ্চস্বরে রাগ প্রকাশ করেন না তারাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক এবং সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়ার বাহক’। স্মৃতিশক্তির স্থায়িত্বের পাশাপাশি নারীদের হরমোনাল ওঠানামা তাদের আবেগকে অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। নারীদের আবেগের একটি ধারায় যখন তাদের রাগের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বের করা হয়, তখন আরও কিছু অসাধারণ তথ্য পাওয়া গেল। যেমন, Estrogen যখন শীর্ষে থাকে, নারীরা সাধারণত শান্ত, সংযত এবং আবেগগতভাবে স্থিতিশীল অনুভব করেন, কারণ Estrogen সেরোটোনিন রিসেপ্টর সক্রিয়তাকে শক্তিশালী করে। কিন্তু Estrogen কমলে, বিশেষত পিরিয়ডের আগের সপ্তাহে বা মেনোপজে, মস্তিষ্কের আবেগ কেন্দ্র হয়ে ওঠে স্পর্শকাতর। ২০০৫ সালে এফএমআরআই (FMRI) প্রসঙ্গে গোল্ডস্টেইন এবং অন্যান্য কিছু গবেষক বক্তব্য রাখেন যে, এই সময়ে অ্যামিগডালা অতিরিক্তভাবে প্রতিক্রিয়াশীল (hyper-reactive) হয়ে যায়। তাই আচরণ নয় মস্তিষ্কই নারীদের সেই মুহূর্তে বেশি reactive করে তোলে। FMRI স্ক্যানে দেখেছেন, ইস্ট্রোজেন কমলে অ্যামিগডালা ভয়ানকভাবে ‘হাইপার-রিঅ্যাকটিভ’ হয়ে যায়।

জাতিসংঘের জেন্ডার ডেটা পোর্টালে দেখা যায়, ২০১০ সালে বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা সহ্য করেও নীরব থাকার হার ছিল ৮১%, যা তাদের আবেগীয় স্মৃতি ধারণের জৈবিক প্রবণতাকে তীব্র সামাজিক চাপে আরও মজবুত করেছে। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (BDHS) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে যেখানে বিবাহিত নারীর মধ্যে আবেগীয় নির্যাতনের শিকার হওয়ার হার ছিল ৪৯%, ২০২৫ সালে তা ৫৮% এ পৌঁছেছে, যা প্রমাণ করে স্মৃতি ধারণের ক্ষেত্রটি কত বড় হচ্ছে।

ওয়াইটেল এবং তার কলিগসরা ২০১১ সালে বলে থাকেন যে, নারীদের ফ্রন্টাল লোব (frontal lobe) আবেগী কাজের সময় পুরুষদের তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয়। ফ্রন্টাল লোব মূলত যুক্তি খণ্ডন, আবেগের বশে কোনো প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ এবং ভাঙনের মুহূর্তকে দমন, পরিচালন এবং সংযমন করে। এর অর্থ, তারা শুধু আবেগ অনুভব করেন না, তারা আবেগ বিশ্লেষণও করেন। এই তীব্র বিশ্লেষণ ক্ষমতা অনেক সময় আবেগকে গভীর করে তোলে। কিন্তু যখন সেরোটোনিন কম থাকে, ফ্রন্টাল লোবের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা কমে যায়। তখন আবেগ হয়ে ওঠে তীব্র এবং প্রতিক্রিয়া হয়ে ওঠে আরও গভীর, আরও নির্দিষ্ট, আরও পরিমিত, যা অনেক ক্ষেত্রে নীরব ক্রোধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।

একটি বেসরকারি গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে প্রায় ৬২% তাদের রাগ বা অসন্তোষ প্রকাশ না করে চেপে রাখেন, যা ২০১০ সালের ৪৭%-এর তুলনায় ১৫% বেশি। পরিবার-পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে ডিপ্রেশনের হার ২০১০ সালে যেখানে ছিল ৯%, ২০২৫ সালে তা ১৪%-এ উন্নীত হয়েছে। এই নীরবতা শুধু রাগ নয়, এটি মস্তিষ্কের এক নীরব বিশ্লেষণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের নারী সমাজে ‘সাইকোসোম্যাটিক’ (মনের চাপে শারীরিক রোগ) রোগের ঘটনা ২৫% বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক বিশ্লেষণ বলছে, কর্মক্ষেত্রে জেন্ডারভিত্তিক মানসিক চাপের কারণে ২০১০ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে নারীর উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেয়েছে ৮%, যা এই অভ্যন্তরীণ চাপের ফল।

‘যেসব নারী প্রচণ্ড রেগে যান কিন্তু উচ্চস্বরে বলেন না, তাদের রাগই সবচেয়ে বিপজ্জনক’। সব রাগ উচ্চস্বরে প্রকাশ পায় না। নারীদের ক্ষেত্রে রাগের দুটি রূপ আছে : ১. বিস্ফোরণধর্মী রাগ (ভোকাল, তীব্র, শোনা যায়) এবং, ২. সংযত, নীরব, অত্যন্ত গভীর রাগ (যা বলা হয় না, শুধু বহন করা হয়)। দ্বিতীয় রূপটাই সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং উদ্বেগজনক। ১৯৯৯ সালে দ্রেভেল্স বলেন যে, মানসিকভাবে বুদ্ধিমান (Emotionally intelligent) ব্যক্তিরা, বিশেষত নারীরা রাগ চেপে রাখলে তাদের মস্তিষ্কে অ্যামিগডালা এবং ফ্রন্টাল কর্টেক্সের মধ্যে নীরবে অতিরিক্তভাবে সঞ্চালন ঘটে। এর মানে, তারা রাগ প্রকাশ করছেন না, কিন্তু রাগকে বিশ্লেষণ করছেন, স্মৃতি-প্রবাহে সংরক্ষণ করছেন এবং ফলাফল নির্ধারণ করছেন। এই নীরব রাগ কেন এত শক্তিশালী? কারণ-

১. এটি impulsive নয়Ñ অর্থাৎ, হঠাৎ রাগ নয়

২. এটি calculatedÑ ভাবনার পরে গড়ে ওঠা

৩. এটি আবেগগতভাবে নোঙর (emotionally anchored) করে গভীর স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে 

৪. এটি দীর্ঘস্থায়ীÑ দিন, সপ্তাহ, মাস পর্যন্ত থেকে যায়

৫. এটি অত্যন্ত লক্ষ্যভেদীÑ যাকে উদ্দেশ করে, তাকে স্পষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু করে

এ ধরনের নীরব রাগে শব্দ কম, কিন্তু প্রভাব গভীর। এটিকে গবেষণায় বলা হয় ‘নীরব অথচ উচ্চ-তীব্রতার মানসিক প্রতিশোধের ধরন’ (Quiet yet high-intensity emotional retaliation pattern)। সমাজ সাধারণত উচ্চস্বরে রাগকে ভয় পায়, কিন্তু স্নায়ুবিজ্ঞান বলে, সবচেয়ে বিপজ্জনক রাগ হলো সেই রাগ, যাকে আপনি শুনতে পান না। বাংলাদেশ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, ২০২৫ সাল নাগাদ বিবাহিত নারীদের মধ্যে ‘মানসিক বিচ্ছিন্নতা’ বা Emotional Disengagement-এর হার ৪০% ছুঁতে পারে। এই নীরব ক্রোধের ফলে উদ্বেগজনিত রোগ ২০১০ সালের ১১.৫% থেকে ২০২৫ সালে ১৮%-এ পৌঁছেছে। 

নারীরা সামাজিকভাবে শিখেছেনÑ রাগ হলে কাঁদা যায়, অভিযোগ করা যায়, কিন্তু সব রাগ বলা যায় না ও নিজের মতামতকে স্বাধীনভাবে প্রকাশ করা উচিত নয় প্রেক্ষাপট অনুযায়ী। ফলে অনেক নারী রাগকে প্রকাশ করেন না, বরং অভ্যন্তরীণভাবে ধারণ করেন। এই সংযম তাদের রাগকে আরও প্রখর ও প্রভাবশালী করে তোলে। বাংলাদেশের সমাজ নারীর প্রতি রাগের প্রকাশকে সাধারণত অনুমোদন করে না। ফলে নারীরা আবেগ ধারণ করতে বাধ্য হয়। এই অভ্যন্তরীণ চাপ কীভাবে বাড়ছে, তার একটি অনুমানভিত্তিক চিত্র নিচে দেওয়া হলো, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক চাপ ও জেন্ডারভিত্তিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি :

বছর

নারীর মধ্যে রাগ দমনের হার (Suppressed Anger)

পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা বৃদ্ধি

২০১০

৪৭% (বেসরকারি পর্যবেক্ষণ)

১২% (সমাজতাত্ত্বিক অনুমান)

২০১৫

৫২% (৫% বৃদ্ধি)

১৬% (৪% বৃদ্ধি)

২০২০

৫৮% (৬% বৃদ্ধি)

২০% (৪% বৃদ্ধি)

২০২৫

৬২% (৪% বৃদ্ধি)

২২% (২% বৃদ্ধি)

২০৩০ (অনুমান)

৬৬% (৪% বৃদ্ধি)

২৫% (৩% বৃদ্ধি)

২০৪০ (অনুমান)

৭০% (৪% বৃদ্ধি)

৩০% (৫% বৃদ্ধি)

২০৫০ (অনুমান)

৭৫% (৫% বৃদ্ধি)

৪০% (১০% বৃদ্ধি)

এই পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, রাগ দমনের হার ২০১০ সালের ৪৭% থেকে ২০২৫ সালে ৬২-এ উন্নীত হয়েছে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ তা ৭৫% ছুঁতে পারে। এই নীরব প্রতিক্রিয়া, উচ্চকিত না হলেও, সব থেকে স্পষ্ট। এটি নারীর মস্তিষ্কের এক বিস্ময়কর সক্ষমতা, যা অভিজ্ঞতাকে কেবল অনুভব করে না, বরং তাকে ধারণ করে, বিশ্লেষণ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য এক নীরব শক্তি হিসেবে জমিয়ে রাখে। 

নারীরা কিছু ঘটনা ভুলতে পারেন না, কারণ তাদের মস্তিষ্ক আবেগমূলক স্মৃতি আলাদাভাবে ধরে রাখে। নারীদের রাগ শুধু আবেগ নয়, বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা। নারীরা যখন রেগে যান, তাদের মস্তিষ্কের রাসায়নিক, স্মৃতি এবং বিশ্লেষণ ক্ষমতা রাগকে বহুমাত্রিক করে তোলে। আর যখন তারা রাগ চেপে রাখেন সেটি হয় সবচেয়ে সংগঠিত, সবচেয়ে নীরব এবং সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া। এই কারণেই নারীর রাগ, উচ্চকিত হোক বা নীরবÑ দুটিই শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়Ñ এটি স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, রাসায়নিক ওঠানামা এবং স্মৃতির গভীর ছাপের যৌথ ক্রিয়া। এই নীরবতাই নারীর সবচেয়ে সংগঠিত এবং শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা