প্রাথমিক শিক্ষা
কিউ.এম অহিদুল আলম
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৫৪ পিএম
এরশাদ আমলে হাই স্কুলে ‘কমিউনিকেটিভ ইংলিশ’ নামে এক পদ্ধতিতে ইংরেজি কারিকুলাম চালু হয়। এখানে শুদ্ধ বাক্য শেখা ও লেখার কোনো বালাই ছিল না, ইংরেজিতে কিছু লিখলেই নম্বর এবং পাস। এটা আসলে ছিল কিছু অর্থলোভী ইংরেজি শিক্ষকের ব্রিটিশ কাউন্সিলের ‘প্রজেক্ট’ হিসেবে ইংরেজি শেখার কারিকুলাম। শিক্ষক, অভিভাবকের অধিকাংশই এই অবৈজ্ঞানিক কারিকুলামের বিরোধী ছিল। আমি পেশায় ডাক্তার হলেও বিভিন্ন স্কুল কমিটিতে থাকার সুবাদে এই কারিকুলাম জানতে আগ্রহী হই এবং তার বিরোধিতা করে জাতীয় ইংরেজি দৈনিকে কয়েকবার লিখি। শিক্ষকদের মধ্যেও একদল কমিউনিকেটিভ ইংলিশের পক্ষে আরেক দল বিপক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ল। যারা এই প্রজেক্টের উদ্যোক্তা তারা অনুদানে পয়সা দিয়ে ওয়ার্কশপ ও বিরিয়ানি খাওয়ানোর বন্দোবস্ত করল। একদিন এমনি এক ওয়ার্কশপ হলো চট্টগ্রামের সেন্ট প্লাসিড স্কুলে। বিপক্ষের লোকজন আমাকেও এই ওয়ার্কশপে দাওয়াত করল।ওয়ার্কশপের উদ্যোক্তা দুই-তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক কিছু কথা বললেন। প্রশ্নোত্তর পর্বে আমি জিজ্ঞাসা করলামÑ যে কারিকুলাম আপনাকে এত বড় অধ্যাপক বানিয়েছে সেই কারিকুলামের ভুলটা কোথায়। আধুনিকায়ন মানে পুরাতন পদ্ধতি সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে কোনো নতুন কারিকুলাম বা ‘কমিউনিকেটিভ’ ইংরেজি না। পুরানকালে অডিও-ভিজুয়াল সিস্টেম ছিল না। ছাত্রদের উচ্চারণেও যথেষ্ট ত্রুটি ছিল। তাই আমার মতে আগের সিস্টেমে অডিও-ভিজুয়াল পদ্ধতি সংযোগ করে আগের কারিকুলামকে একটি ভালো ইংরেজি শেখার কারিকুলামে পরিণত করা যেত। প্রফেসর আমাকে বললেন আপনি ডাক্তার মানুষ, ইংরেজি কারিকুলামের কী বুঝবেন... ইত্যাদি। ক্যাডেট কলেজের কিছু শিক্ষক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তাদের সেনা কানেকশনে কমিউনিকেটিভ ইংলিশ কারিকুলামের ভুলত্রুটি উপস্থাপন করলে মন্ত্রণালয় থেকে এ পদ্ধতি বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু ততদিনে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এক যুগ শিক্ষা মন্ত্রণালয় কতগুলো ‘দুর্বল ইংরেজি জানা ছাত্র’ বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়।
স্বাধীনতার পর কয়টি কারিকুলাম কোন স্তরে করা হয়েছে তা জাতিকে জানানো উচিত। আবার কোন কারিকুলাম কী কারণে রহিত হয় তাও দেশের অভিভাবকদের জানানো উচিত।
আমার এক অ্যানাটমি শিক্ষক ছিলেন। অ্যানাটমিতে ডজন ডজন ফেল করা মেডিকেল ছাত্রদের জন্য অতি সাধারণ ব্যাপার। আমার শিক্ষক পরবর্তীতে আমাকে একদিন বললেনÑ যারা পরীক্ষক ওরা এই আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্রদের থেকে এমনভাবে পরীক্ষা নেয় তারাও যেন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ছাত্র বা পরীক্ষকের সমকক্ষ।
ওপরের মোদ্দাকথাগুলোর প্রেক্ষাপট তুলে ধরলাম বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষার কারিকুলামÑ বিশেষত অঙ্ক-বাংলা-বিজ্ঞানের কারিকুলামের অবৈজ্ঞানিক ভয়াবহতা আলোচনার জন্য। নীতিনির্ধারকরা এমনভাবে কারিকুলাম করেছেন যে মনে হয়, কোমলমতি বাচ্চা সবাই তাদের মতো প্রফেসর। আমাদের এখান থেকে নরমাল কেজিতে দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণির বাচ্চা লন্ডন-আমেরিকায় মা-বাবার কর্ম উপলক্ষে গেলে ওখানকার টিচাররা তাদেরকে ‘অ্যাসেসমেন্ট’ করে দু-এক ক্লাস ওপরে তুলে দেয়। নীতিনির্ধারকরা চতুর্থ শ্রেণির অঙ্ক বইয়ে যে কারিকুলাম দিয়েছে তার আগে যারা স্টেকহোল্ডার, শিক্ষক, অভিভাবক তাদের সঙ্গে বাচ্চার পরিবেশ, মেধা, পাঠ গ্রহণের সক্ষমতা আলোচনা করেছেন কি না সন্দেহ। একটা চতুর্থ শ্রেণির বাচ্চার ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ গ্রহণের মগজ-সক্ষমতা কখনও থাকতে পারে না। মস্তিষ্কের গ্রহণ ক্ষমতা দশ ক্লাস পর্যন্ত ধীরে-সুস্থে ডেভেলপ করে। বর্তমান চতুর্থ শ্রেণিতে একত্রে ভাগ, ভগ্নাংশ, দশমিক, মিলিমিটার থেকে শুরু করে ডেসিলিটার, মিলিগ্রাম, কিলোগ্রাম ইত্যাদি বহু ধরনের অঙ্কের সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে। এই বহুবিধ অংশ চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রের পক্ষে শেখা হয়তো অসম্ভব নয়। কিন্তু অবশ্যই দুরূহ। কিছুসংখ্যক ছাত্র যারা হাউস টিউটর বা মা-বাবা থেকে কোচিং নেয় তারা হয়তো পাস করবে। কিন্তু এ দেশের অধিকাংশ নিম্নবিত্তের সন্তানদের এসব অঙ্ক বোঝাও সম্ভব না, কোচিং করাও তো অর্থনৈতিক ও পারিবারিক অসামর্থ্যের জন্য সম্ভব না। তাদের অনিবার্য পরিণাম ফেল এবং ড্রপ-আউট। উচিত ছিল সংক্ষিপ্ত কারিকুলাম এবং পঞ্চম-ষষ্ঠ শ্রেণি মিলে এসব অঙ্ক শেখানো।
একটা বাচ্চাকে প্রথমে তরল দেওয়া হয় খাদ্য হিসেবে পরে একটু নরম, আরও পরে হয়তো হাড্ডি। এটা বাচ্চার শারীরিক বিকাশের সহজাত ধারা। এর পরিবর্তে নরম খাওয়ার বয়সের বাচ্চাকে হাড্ডি চিবাতে দিলে যে রকম বর্তমান প্রাথমিক কারিকুলামও সেরকম। বাচ্চাদের মননে ছোটকাল থেকেই অঙ্কভীতি ঢোকানো হচ্ছে, বাংলা-বিজ্ঞান প্রতিটি ক্ষেত্রেই যে জিনিসগুলো ষষ্ঠ শ্রেণির বাচ্চার জন্য সহজাত ও উপযোগী তা আধুনিকায়নের নামে চতুর্থ শ্রেণিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির ব্যাকরণে ‘বাক্য’ কাকে বলের সঙ্গে বাক্যের ‘আসক্তি’ কী? তা বলা হচ্ছে এটা কারিকুলাম-প্রণেতাদের নেহাত Callousness, এটা না আধুনিক, না বিজ্ঞানসম্মত। শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ সম্বন্ধে ধারণাহীনরাই কেবল এ রকম কারিকুলাম করতে পারেন।
বাংলাদেশে ‘ড্রপ আউট’ বা স্কুল ত্যাগীদের নিয়ে কিছু সার্ভেও আছে, প্রজেক্টও আছে। অর্থনৈতিক কারণ, মা-বাবার দারিদ্র্য, সচেতনতার অভাব ইত্যাদিকে ‘স্কুল ত্যাগ’-এর কারণ হিসেবে ঘটা করে দেখানো হচ্ছে ও তার প্রতিকার হিসেবে ‘মিড-ডে-মিল’ তার সাফল্যের অতিরঞ্জিত চিত্রও তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ‘প্রাথমিক কারিকুলাম’। এটা কোমলমতি প্রাথমিক ছাত্রদের কাছে হৃদয়গ্রাহীও নয়, আনন্দদায়কও নয় এবং এক ভীতিকর ব্যাপার। এতেই বাচ্চারা পড়ায় আগ্রহ হারায় ও স্কুল ড্রপ আউট হয়।
বর্তমান প্রাথমিক কারিকুলাম কেবল এক্সট্রা টিউশন দিতে সক্ষমদের জন্য। নিম্ন মধ্যবিত্ত, গরিব বাচ্চাদের জন্য এ কারিকুলাম ফেল করার এক ‘ট্র্যাপ’। দেশের স্বার্থে, গরিব বাচ্চাদের স্বার্থে, আনন্দময় ও পড়ার আগ্রহবান্ধব কারিকুলাম প্রয়োজন।
পিছিয়ে পড়া প্রাথমিক স্তরের ছাত্রদের জন্য ক্লাসের পর অঙ্ক ও বিজ্ঞানের এক্সট্রা ক্লাসের বন্দোবস্ত ছাড়া কোনো গতি নেই। অঙ্ক ও বিজ্ঞানের প্রাথমিক স্তরে মজবুত ভিত করতে পারলে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক মাধ্যমিক, কলেজ ও উচ্চ শিক্ষার পরিবেশ স্বতঃস্ফূর্ত হবে। শুধু অর্থব্যয়, বাজেট বৃদ্ধি দিয়ে শিক্ষার মান উন্নত হবে না। ফেলের মহাউৎসবও রোধ করা যাবে না। মস্তিষ্কের ক্রম-বৃদ্ধির ও পড়াশোনা-বান্ধব কারিকুলাম এই মুহূর্তে জাতির এক নম্বর প্রয়োজন।
কিউ.এম অহিদুল আলম
চিকিৎসক ও কলাম লেখক