স্বাস্থ্যঝুঁকি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০৭ পিএম
ফি-সন খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকিতে দেশের তিন কোটি মানুষ। রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো একটি খবর। অথচ আমরা জানি পুষ্টির অন্যতম উৎস খাবার। কিন্তু সেখানেই যদি গলদ থাকে, তাহলে তা তো পিলে চমকাবেই। খাবারে গলদের কারণেই আমাদের জীবনে থাবা বসাচ্ছে ডায়াবেটিস, মন্দ কোলেস্টেরল, ইউরিক অ্যাসিড, ক্যানসারের মতো গুরুতর রোগ ও রোগের উপাদান। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশÑ ক্যাব এবং বাংলাদেশ সেফ অ্যাগ্রো ফুড ইফোর্টস-বিএসএএফই আয়োজিত একটি সেমিনারে পঠিত গবেষণা প্রবন্ধে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ তথ্য। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ‘বছরে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকিতে ৩ কোটি মানুষ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারের ৭১ শতাংশ সবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক, তেলের নমুনায় বিপজ্জনক ট্রান্স-ফ্যাট এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে জনস্বাস্থ্যের জন্য মস্ত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জেনেটিক্যালি মোডিফায়েড খাদ্যশষ্যও স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম উৎস হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও গবেষণাপত্রে বছরে তিন কোটি মানুষের খাদ্যবাহিত রোগে ভোগার প্রসঙ্গ এসেছে। তাতে জানা যায়, বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ সরাসরি খাদ্যবাহিত রোগে মারা যান। অন্য একটি গবেষণা বলছে ৫৬.৪ শতাংশ শারীরিক অসুস্থতার মূলে রয়েছে অস্বাস্থ্যকর খাবার।
খাদ্যবাহিত রোগের প্রধান কারণÑ খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক। প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবেই মানব শরীরে নানান রোগ বাসা বাঁধে। পুষ্টির অন্যতম উৎস খাবার। কিন্তু সেখানেই গলদ। বিজ্ঞান প্রতিদিনই তার নিজস্ব পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। সেই এগিয়ে চলায় ক্যানসারসহ নানান জটিল রোগের আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু সেই আবিষ্কারের সাফল্যকেও পেছনে ফেলছে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা। বিভিন্ন গবেষণায় ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার নেপথ্য কারণ হিসেবে জীবনযাপন এবং খাবারের অভ্যাসকে দায়ী করা হয়। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে আমাদেরকে বাইরের খাবারের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা বিপদ বাড়াচ্ছে। কারণ গবেষকরা বলছেন, যত বেশি বাইরের খাবার তত বেশি রক্তচাপ। আর রক্তচাপের হাত ধরেই আসে হৃদরোগ।
এ ছাড়া ক্যানসারের বড় কারণ জিনগত হলেও সেই প্রবণতা বাড়িয়ে তুলেছে বর্তমান জীবনযাপন পদ্ধতি এবং খাবারে মিশতে থাকা রাসায়নিক। আমরা জানি, জনসংখ্যার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তি খাবারের চাহিদা মেটাতে উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হচ্ছে। আর সেই বাড়তি উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা থেকেই খাবারে মিশছে নানান ধরনের রাসায়নিক। রাসায়নিক মিশ্রিত খাবারের বিকল্প না থাকায় ভোক্তাকেও তা গ্রহণ করতে হচ্ছে। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর হারও আমাদের দেশের মতো আর কোথাও আছে কিনা সন্দেহ। একই সঙ্গে জীবনযাত্রাকে সহজ করার অজুহাতে বেড়েছে প্রক্রিয়াজাত খাবার, যা বদলে দিচ্ছে জীবনযাপন প্রক্রিয়া। আর এটাই ক্যানসারের বড় অনুঘটক।
নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার অধিকার প্রতিটি মানুষেরই রয়েছে। এজন্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণ সব ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও বোঝাতে হবে খাদ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি। এক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায় কারও একার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। খাদ্য নিরাপত্তার সব দায়দায়িত্ব কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে বরং সম্মিলিতভাবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের ব্যবহার কমাতে কৃষককে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদেরকে এর কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। কীটনাশক ও গ্রোথ হরমোন ব্যবহারে যে নির্ধারিত পরিমাপ রয়েছেÑ সে বিষয়টি যদি কৃষক না জানেন, তাহলে তিনি অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদনের আশায় রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে খাবারকে অনিরাপদ করে তুলবেন। একইভাবে অসৎ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আমরা খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিরাপদ করার বিষয়ে সরকারকে জোর দেওয়ার জন্য বলি। কারণ খাদ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপেই কোনো না কোনোভাবে ভেজাল প্রক্রিয়া চলমান। অতি মুনাফার লোভে ভেজাল প্রক্রিয়া থামানো যাচ্ছে না। অথচ নিরাপদ খাদ্য সবার জন্যই জরুরি। যখন সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিত করতেই আমরা হিমশিম খাচ্ছি তখন নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যে আরও বড় চ্যালেঞ্জ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সুস্থ-সবল জাতি গঠনের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়েই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে।