× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০৫ পিএম

জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো

শিরোনামে উল্লিখিত বাক্যটি বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি প্রবচন। স্কুলজীবনে এ প্রবচনটি আমরা পড়েছি বাংলা ব্যাকরণে ভাব সম্প্রসারণে। ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হতো বাক্যটির মর্মার্থ এবং তাৎপর্য। মানুষের জন্মের ওপর তার নিজের কোনো হাত নেই। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা অনুযায়ী মানুষ জন্মগ্রহণ করে। কে রাজার ঘরে জন্ম নেবে, কে ভিখিরির ঘরে, তা নির্ধারণ করেন সর্বশক্তিমান আল্লাহ। তবে জন্ম যেখানেই হোক, মানুষ তার কর্মের দ্বারাই খ্যাতি বা কুখ্যাতি অর্জন করে। 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিখ্যাত উক্তি হলোÑ ‘তরুলতা সহজেই তরুলতা, পশুপাখি সহজেই পশুপাখি। কিন্তু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় তবে মানুষ।’ এর সহজ ব্যাখ্যা হলোÑ তরু, মানে গাছের বীজ অঙ্কুরিত হলেই প্রাকৃতিক নিয়মে তা বৃক্ষ হিসেবে বেড়ে ওঠে। এজন্য সেটাকে কোনো চেষ্টা করতে হয় না। লতা-গুল্মও তাই। কিন্তু মাতৃগর্ভ থেকে যে শিশুটি পৃথিবীতে আসে তাকে অনেক সাধ্য-সাধনার পরে মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতে হয়। না, শুধু আকার-আকৃতিতে মানুষ নয়, প্রকৃতিগতভাবেÑ মানে চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যে তাকে মানুষ হতে হলে অনেক কিছু অর্জন ও বর্জন করতে হয়। একজন মনুষ্য সন্তান তখনই ‘মানুষ’ হিসেবে গণ্য হয়, যখন সে তার কর্মকাণ্ডে মানবিক গুণাবলির প্রকাশ ঘটাতে সমর্থ হয়। আর এখানেই কবিগুরুর উক্তির যথার্থতা। কেননা সে মানবিক গুণাবলি অর্জন করতে তাকে সাধনা করতে হয়। ভালোকে গ্রহণ আর মন্দকে বর্জন করতে হয়। ‘সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা’ আপ্তবাক্যকে হৃদয়ে ধারণ করে সৎ মানুষ হিসেবে নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। 

আজকাল পত্রপত্রিকায় প্রায়ই খবর বেরোয়Ñ রিকশাচালকের ছেলে বা মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। কিংবা দিনমজুর পিতা বা গৃহকর্মীর ছেলে ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছে। এগুলো বিস্ময়কর কোনো ঘটনা নয়। তারপরও আমরা একটু চমকিত না হয়ে পারি না। কারণ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার মধ্য থেকেও বহু বিত্তশালীর পুত্র-কন্যা যেখানে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য লাভ করতে পারে না, সেখানে অভাব-অনটনের মধ্যে থেকেও গরিবের সন্তানরা ঠিকই সাফল্যের সূর্যকে স্পর্শ করতে সক্ষম হয়। গত ৪ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ তেমনি একটি খবরের শিরোনাম দেখে আগ্রহ সহকারে পড়তে শুরু করি। শিরোনামটি ছিল ‘ভাঙারি ব্যবসায়ী থেকে পুলিশ সুপার আনিস’। সংগত কারণেই আনিস নামের ছেলেটির প্রতি একধরনের সহানুভূতি জমতে শুরু করে। ভাবতে শুরু করি, কবি কুসুম কুমারী দাশের কবিতাÑ ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’ বুঝি আনিসের মধ্যে দেদীপ্যমান হয়ে উঠেছে। কিন্তু কিয়ৎ পরেই আমার ভুল ভাঙে। শিরোনাম দেখে গর্বে যেমন বুকের মধ্যে ফুলে উঠতে শুরু করেছিল, খবরটি পড়তে পড়তে তা ভাঙারির মতোই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। দরিদ্র আনিস পরিশ্রম করে পুলিশ সুপার হওয়ার সাফল্যের জন্য নয় বরং অসদুপায় অবলম্বন করে চাকরি বাগানো এবং চাকরিতে যোগ দিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার কারণেই সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। 

খবরে বলা হয়েছে, ঠাকুরগাঁওয়ের আনিসুজ্জামান আনিস বর্তমানে এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা। একসময় ভাঙারি ব্যবসায় করে তিনি পড়াশোনা করেছেন। পরে ঢাকার একটি কলেজ থেকে অনার্স সম্পন্ন করে চাকরি নেন পুলিশে। বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের এ কর্মকর্তার উত্থানের পেছনে রয়েছে পিলে চমকানো অনিয়মের ইতিহাস। ২০০৪ সালে ২৫তম বিসিএস পরীক্ষায় পিএসসির চেয়ারম্যানের ড্রাইভার আবেদ আলীর প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারির বেনিফিশিয়ারি তিনি। ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্ন কিনে পরীক্ষা দিয়ে প্রথম স্থান দখল করে পুলিশ ক্যাডারে চাকরি পেয়ে যান। চাকরিজীবনে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে মালিক হয়েছেন বিপুল বিত্তবৈভবের। বিগত সরকারের সময় ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সঙ্গে দহরম-মহরম সম্পর্ক থাকার সুবাদে ছিলেন প্রতাপশালীও। আনিস ঢাকা জেলার এসপি থাকাকালীন কেরানীগঞ্জে সিসি ক্যামেরা কেনার অনুদান হিসেবে প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। দুবাইতে শত কোটি টাকার অ্যাপার্টমেন্ট ও স্বর্ণের ব্যবসা রয়েছে তার। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে রেকার-বাণিজ্য, বদলিবাণিজ্যসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি তাক বদলি করা হয়েছে কুমিল্লার জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে। কিন্তু নানা অপকর্মের অভিযোগে অভিযুক্ত এই কর্মকর্তার যোগদান মেনে নিতে পারছেন না কুমিল্লা জেলাবাসী। তারা বলছেন, এমন একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা জেলার শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে এলে জেলা সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সময় সরকারদলীয় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেও ঠাকুরগাঁওয়ে বাড়ি হওয়ার সুবাদে তিনি নিজেকে এখন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাগ্নে হিসেবে পরিচয় দেন। যদিও মির্জা আলমগীর সাহেবের কাছ থেকে এ বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কিছু জানা যায়নি। 

অসৎ ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের অপকর্মের বর্ম হিসেবে সবসময় ক্ষমতাধর কোনো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিচয়কে ব্যবহার করে। মির্জা আলমগীরকে এসপি আনিসের মামা হিসেবে পরিচয় দেওয়া যে তেমনই চেষ্টা সেটা না বললেও চলে। যেহেতু মির্জা সাহেবের বাড়ি ঠাকুরগাঁও, তাই অনেকে বিশ্বাস করতেই পারেন, আনিস তার ভাগ্নে। অনুসন্ধান করলে এর সত্যাসত্য বেরিয়ে আসবে। এ প্রসঙ্গে একটি গল্প মনে পড়ে গেল। ‘এক পৌরসভার চেয়ারম্যান তার অফিসে বসে আছেন। হঠাৎ এক ছেলে ঢুকে বলল, ‘মামা পাঁচশ ট্যাকা দ্যান।’ বিস্মিত চেয়ারম্যান বললেন, ‘আমার তো কোনো বোন নাই। তুমি আমার ভাগ্নে হলে কীভাবে?’ ছেলেটি বলল, ‘ক্যান, ইলেকশনের আগে আপনে আমাগো পাড়ায় মিটিং কইরা বলছিলেন না, ভাই বোনেরা আমার..। আমার মা সেই মিটিংয়ে আছিল। তাই আমার মা তো আপনার বইন। আমি আপনের ভাগ্নে।’ বস্তুত ক্ষমতাধরদের নানা ধরনের আত্মীয়স্বজন গজাতে খুব একটা সময় লাগে না। এসব দুধের মাছি-সদৃশ আত্মীয়স্বজন সুদিনে হাজির হয়, দুর্দিনে দূরে রয়। আমি নিশ্চিত এসপি আনিস বিএনপি মহাসচিবের সে ধরনেরই এক সুবিধাবাদী ভাগ্নে; যে কিনা সম্ভাব্য ‘মন্ত্রী মামা’কে এখনই বিক্রি করতে শুরু করেছে। 

ভাঙারি ব্যবসা করে টাকা জমিয়ে সে টাকায় প্রশ্নপত্র কিনে পরীক্ষা দিয়ে দুই নম্বরি পথে পুলিশ ক্যাডারে চাকরি নিয়েছিলেন আনিসুজ্জামান। অথচ বাঁকা পথে না গিয়ে তিনি যদি সঠিক পথে থেকে চাকরি পাবার চেষ্টা করতেন, হয়তো অন্য যেকোনো একটি চাকরি পেয়ে যেতেন। কিন্তু তার লক্ষ্যই ছিল যেভাবেই হোক পুলিশে যোগ দেওয়া। কারণ তিনি দেখেছেন, পুলিশের চাকরি মানেই আরব্য উপন্যাসের আলাদীনের জাদুই চেরাগ হাতে পাওয়া। একবার পুলিশের চাকরিতে ঢুকতে পারলে স্বল্প সময়ের মধ্যে গাড়িবাড়ি-টাকাকড়ির মালিক হওয়া ‘ফুস মন্তরের’ ব্যাপার। তাই আবেদ আলীর কাছ থেকে প্রশ্নপত্র কিনে পুলিশে চাকরি নিশ্চিত করে নিয়েছিলেন।

সবচেয়ে বড় কথা এসপি আনিসুজ্জামান আনিস দুর্নীতি-অপকর্ম দীর্ঘদিন ধরেই চালিয়ে আসছিলেন। কেউ তাকে বাধা দেয়নি। কেন দেয়নি তা বুঝতে সমস্যা হয় না। কারণ এটা জানা কথা যে, দুর্নীতিবাজদের একটা চেইন থাকে। নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত সে চেইন ঠিকমতো মেনটেইন করতে পারলে শত অপরাধ করেও দুধে ধোয়া তুলসী পাতা সেজে বহাল তবিয়তে থাকা যায়। কিন্তু এখন তো সময় পাল্টেছে। বিশেষত চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বিগত সরকারের সময়ে দুর্নীতি-লুটপাটের মাধ্যমে যারা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা-পয়সা হাতিয়েছে, তাদের মধ্যে অনেক রাঘব-বোয়াল আইনের জালে আটকা পড়েছে। কিছু আবার জাল কেটে দেশের বাইরে চলে গেছে। তাদের প্রায় সবার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কারও কারও বিচারও শুরু হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, দুর্নীতিবাজ-লুটেরাদের বিরুদ্ধে চলমান সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও ভাঙারি আনিস কীভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেল? তার চেয়ে বিস্ময়কর হলো, এহেন দুর্নীতিগ্রস্ত এসপিটি বাংলাদেশের নাভিকেন্দ্র ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার পদে নির্বিঘ্নে চাকরি করে গেল! তার মানে ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’। নিশ্চয়ই তিনি পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে গিরগিটির মতো রঙ পাল্টে ভালো মানুষ সেজে নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে পেরেছেন। দেখার বিষয় তার জারিজুরি ফাঁস হওয়ার পর পুলিশ কর্তৃপক্ষ তথা সরকার এবং দুদক তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়। 

হতদরিদ্র অবস্থা থেকে যখন একজন মানুষ তার সততা, কর্মদক্ষতা ও একাগ্রতার গুণে সাফল্যের মঞ্জিলে পৌঁছে যায়, আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই। এমনকি তিনি হয়ে ওঠেন সাফল্য অর্জনের আইডল। আমাদের দেশে একটি স্বনামধন্য গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক ছিলেন, যিনি জাতীয় সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। একসময় তার কারখানায় উৎপাদিত শাড়ি ছাড়া বাংলাদেশে বিয়েই হতো না। তিনি প্রথম জীবনে ঢাকার সদরঘাটে গামছা-লুঙ্গি বিক্রি করতেন। কিন্তু অধ্যবসায় তাকে পৌঁছে দিয়েছিল সাফল্যের এভারেস্ট শৃঙ্গে। শিকড় থেকে শিখরে আরোহণের তিনি এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ভাঙারি ব্যবসায়ী থেকে এসপি হওয়াটা দোষের কিছু নয়। দোষের হলো তার হাঁটার পথটি। যে পথে হেঁটেছেন এসপি আনিস, সে পথ অনিয়মের, সে পথ মানুষকে শুধু সর্বনাশের দিকেই নিয়ে যায়। সে পথ পরিত্যাজ্য।


মহিউদ্দিন খান মোহন

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা