মাইনাস ফোর
হাবিব বাবুল
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৩৯ এএম
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখনই কোনো অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, বিশেষ করে কোনো দলীয় নেতার স্বাস্থ্যগত সংকট বা বিদেশে চিকিৎসার বিষয় সামনে আসে তখনই আমাদের নীতিনির্ধারক মহলে নয় বরং ইউটিউব ও টক শোর পরিবেশে ‘মাইনাস ফোর’ তত্ত্ব নামে এক অদ্ভুত শব্দগুচ্ছ হাওয়া হয়ে ওঠে। খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাত্রার খবর এলেই যেন এই তত্ত্ব নতুন করে জন্ম নেয়Ñ পুনর্জন্ম, পুনর্ব্যবহার এবং পুনরায় বিক্রি হয় অসংখ্য ভিউয়ের বিনিময়ে। হামাগুড়ি দিয়ে সত্য নয় বরং জল্পনা ও গুজব এগিয়ে আসে ভিডিওর ভিউ, মনিটাইজেশন ও শিরোনামের উত্তেজনাকে সঙ্গী করে। আশ্চর্যের বিষয়, যারা এই আলোচনাকে সামনে টেনে এনে ‘বিশ্লেষণ’ প্রচার করেন তাদের কাছে যুক্তি নেই, নেই যাচাইযোগ্য তথ্য; আছে শুধু নাটকীয়তা, ষড়যন্ত্রের ঘ্রাণ এবং দর্শক টানার মোহ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন স্থিতিশীল হোক এবং যে কোনো বিশ্লেষণ হোক যুক্তির ভিত্তিতেÑএটাই হওয়া উচিত। কিন্তু ইউটিউবারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যেন বিচারে নয়, উত্তেজনায় বিশ্বাসী। রাজনৈতিক তত্ত্বগুলো তারা কেবল বানিয়ে নেয় না; বরং এমনভাবে পরিবেশন করে যেন তা সরকারি গেজেট, আদালতের রায় বা রাষ্ট্রপতির ভাষণ। তারা জানে দর্শকদের রাজনৈতিক আগ্রহ আছে, আবার আবেগও আছে। ওই আবেগের গায়ে আগুন লাগালেই ভিউ বাড়ে, বিজ্ঞাপন আসে, চ্যানেল বড় হয়। আর এভাবেই ‘মাইনাস ফোর’, যা মূলত কথিত ও অপ্রমাণিতÑ উড়ে বেড়ায় ভার্চুয়াল বাতাসে, তৈরি করে বিভ্রান্তি, সন্দেহ এবং বিভক্ত জনমত।
ইউটিউবাররা নিজেদের পরিচয় দেন বিশ্লেষক হিসেবে, কিন্তু বিশ্লেষণ নয়, বাজারি কনটেন্টই তাদের হাতিয়ার। সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিগুলোÑযেমন তথ্য যাচাই, উৎস নির্ভরযোগ্যতা, ভারসাম্যপূর্ণ বয়ানÑএসব শব্দ যেন তাদের অভিধানে নেই। বিষয়টি আরও দুঃখজনক হয়, যখন দেখা যায়Ñকিছু টক শোও একই স্রোতে গা ভাসায়। অনলাইন ভিউ এখন সংবাদকক্ষ পরিচালনার অন্যতম সূচক, ফলে প্রচারমাধ্যমও কখনো কখনো তথ্যের বদলে ড্রামা বেছে নেয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, কারণ রাজনৈতিক আলোচনা যখন অসত্যের ওপর দাঁড়ায় তখন বাস্তব সমস্যাগুলো আলোচনার টেবিল থেকে সরে যায়।
বাংলাদেশে গণমাধ্যম বিস্তৃত হয়েছে, তবে তার সঙ্গে বেড়েছে তথাকথিত ‘অ্যাংকর-ইউটিউব বিশ্লেষকদের’ উত্থান। তারা রাজনৈতিক নেতাদের স্বাস্থ্য, বিদেশ যাত্রা, দণ্ড ও মুক্তি ইত্যাদির সঙ্গে এমন কল্পিত ‘তত্ত্ব’ জুড়ে দেয়, যা দর্শকের মনে সন্দেহ ও উত্তেজনার ঢেউ তোলে। দর্শক ক্লিক করেন, ভিডিও শেয়ার হয়, আলোচনা বাড়ে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়Ñএর কোনো ভিত্তি আছো? কে প্রস্তাব করেছে? কোন দল এটি বাস্তবায়ন করতে চাইছে? কোনো গবেষণা বা নীতিনির্ধারণী সভার প্রতিলিপি আছে? উত্তর নেই। তবুও কনটেন্ট তৈরি হয়, শিরোনাম দাঁড়ায়—‘মাইনাস ফোর পরিকল্পনা শুরু’, ‘অভ্যন্তরে বড় সিদ্ধান্ত’, ‘রাজনীতিতে ভূমিকম্প’—যার শতভাগই কল্পনা, শূন্য শতাংশ প্রমাণ।
এমন ভিউ-নির্ভর কনটেন্ট শুধু রাজনীতি নয়, গণমানুষের চিন্তাপদ্ধতিতেও ক্ষত সৃষ্টি করে। কোনো দেশের রাজনীতি যখন গুজব নির্ভর হয়ে পড়ে তখন গণতন্ত্রের শিকড় দুর্বল হয়। বিভ্রান্ত জনগণ যুক্তি দিয়ে নয়, সংশয় দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। রাজনৈতিক দলগুলো তখন জনগণের কাছে নিজেদের প্রকৃত নীতি ও কর্মসূচি তুলে ধরতে পারে না বরং প্রতিনিয়ত গুজব ঠেকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ এক ভয়াবহ অসুস্থতাÑ যেখানে মিডিয়া হলো রোগবাহক, আর দর্শক হলো আক্রান্ত জনগোষ্ঠী।
ইউটিউবারদের অনেকে হয়তো বলবেÑদর্শক চায় তাই আমরা বানাই। কিন্তু দর্শকের পছন্দই কি সবকিছুর মাপকাঠি? একজন রাঁধুনি যদি কেবল চিনি দিয়ে খাবার বানায় কারণ গ্রাহক তা চায়, তবে কি সেই রান্না স্বাস্থ্যকর থাকবে? সংবাদ এবং বিশ্লেষণও সেই রকম। দায়িত্বহীন তথ্য মানুষের মস্তিষ্কে জমা হয় এবং ধীরে ধীরে সত্যকে দুর্বল করে। মানুষের চিন্তা বিভক্ত হতে থাকে অথচ আমাদের প্রয়োজন ছিল তথ্যভিত্তিক আলোচনার, মতপার্থক্যের সৌন্দর্যের, যুক্তি-সংলাপের।
ইউটিউব মূল্যবান মাধ্যম হতে পারে, যদি তা গবেষণাভিত্তিক, নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কল্পনা ও ষড়যন্ত্রের গল্প যদি বাস্তব রাজনীতির জায়গায় স্থান পায়, তবে তা শুধু বিনোদন নয়Ñ এক প্রকার মগজধোলাই। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতভেদের ভিত হওয়া উচিত তথ্য, যুক্তি ও মূল্যবোধ। ইচ্ছামতো তত্ত্ব বানানো, মনগড়া বিশ্লেষণ তৈরি এবং মানুষের আবেগ নিয়ে খেলাকে কোনোভাবেই মিডিয়ার স্বাধীনতা বলা যায় না। বরং এটি গণতন্ত্রের অঘোষিত শত্রু।
যখন খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, তখন তার স্বাস্থ্য, মানবিক বিবেচনা, চিকিৎসার অধিকারের বিষয়গুলো আলোচনা হওয়ার কথা। কিন্তু তার বদলে আমরা দেখিÑ ‘মাইনাস ফোর’ তত্ত্বের চমক। যেন দেশের রাজনীতি চারজন নেতাকে বাদ দিয়েই নতুন করে সাজানো হবে! কিন্তু কোথায় সেই পরিকল্পনার কাগজ? কোন রাষ্ট্রীয় মহলে এমন আলোচনা? কেউ জানে না, কেউ বলতে পারে না তবুও ভিডিওর নিচে লাখো ভিউ, শত শত মন্তব্য।
এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হলো দর্শকের সচেতনতা, গণমাধ্যমের আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের নৈতিক অবস্থান পুনরায় ভাবা। প্রতিটি ভিডিও ভিউ মানে শুধু বিজ্ঞাপনের টাকা নয়Ñ এটি মানুষের মত গঠনে প্রভাব ফেলে। তাই যারা তথ্য পরিবেশন করেন তাদের দায়িত্বও বিশাল। ইউটিউবাররা যদি সত্যিকারের সাংবাদিকতার মূল্যবোধ বুঝতে না পারেন, তবে তারা শুধু বিনোদন ব্যবসায়ী হিসেবেই থাকবেনÑ মতামত গঠনের শক্তি তাদের অর্জিত হবে না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মাইনাস ফোর’ নামে যে তত্ত্ব বাজারে ঘুরছে, তা বাস্তবতার নয়, বরং ইউটিউবের ভিউ বাড়ানোর গল্প । মানুষের কৌতূহল, আবেগ এবং উত্তেজনা বিক্রি করাই যে এর উদ্দেশ্য, তা এখন স্পষ্ট। তাই গুজব নয়, তথ্য চাই; উত্তেজনা নয়, যুক্তি চাই; শিরোনামের নাটক নয়, গণতান্ত্রিক আলোচনার পরিমিত ভাষা চাই।
বাংলাদেশের রাজনীতি এগোবে জনগণের চাওয়ায়, বাস্তব নীতিমালায় এবং নেতৃত্বের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতায়Ñ কোনো ইউটিউব চ্যানেলের নাটকীয় কনটেন্টে নয়। আর যতদিন বিশ্লেষণের নামে প্রচার চলবে, ততদিনই সতর্ক থাকতে হবে, কারণ বাংলাদেশের রাজনীতি এগোবে জনগণের চাওয়ায়, বাস্তব নীতিমালায় এবং নেতৃত্বে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতায়, কোনো ইউটিউব চ্যানেলের নাটকীয় কনটেন্টে নয়। আর যতদিন বিশ্লেষণের নামে প্রচার চলবে, ততদিনই সতর্ক থাকতে হবে, কারণ গণতন্ত্র শুধু ভোটে নয়, তথ্যের শুদ্ধতায় টিকে থাকে।
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম, ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানি