মানব পাচার
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:৪৭ এএম
স্বপ্ন মানুষকে পথ দেখায়, আলো দেখায়। কিন্তু দারিদ্র্য, বেকারত্ব আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের মায়াবী আশ্বাস যখন ভুল দরজায় টেনে নেয়, তখন সেই স্বপ্নই পরিণত হয় মৃত্যুর ফাঁদে। মানব পাচারের দালালচক্র আজ সেই ভুল স্বপ্নের সবচেয়ে নির্মম কারিগর। তারা দেখায় বিদেশে সোনালি জীবনের হাতছানিÑ চাকরি, টাকা, সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ। আর পরিবারের হাসি ফেরানোর আশায়, সেই হাতছানির দিকেই এগোয় মানুষ। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই পথ বদলে যায়; সাগরের ঢেউ হয়ে ওঠে মৃত্যুর অঘোষিত দূত। গ্রাম থেকে শহর, সবখানেই রয়েছে এই প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব আর নির্যাতিত হওয়ার অসংখ্য গল্প। ইউরোপে পৌঁছলে সংসার বদলে যাবেÑ এ আশায় কেউ জমি বন্ধক রাখছেন, কেউ ঋণ নিচ্ছেন, কেউ মায়ের গয়না বিক্রি করে দালালকে দিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। স্বপ্নে বিভোর তরুণরা যেন দালালচক্রের কাছে নিজেদের ভবিষ্যৎ সমর্পণ করছেন। কিন্তু স্বপ্নের ইউরোপ আর বাস্তবের মধ্যে রয়েছে মৃত্যুঝুঁকির এক অন্ধকার সুড়ঙ্গ। আর সেই সুড়ঙ্গ পাচারকারী চক্রের তৈরি। শত চেষ্টাতেও থামানো যাচ্ছে না এই দালালচক্রের দৌরাত্ম্য। ফলে বন্ধ হচ্ছে না মানব পাচার।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সামাজিক অসহায়তার সুযোগে একটি শক্তিশালী মানব পাচারচক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাদের কথা যেন এক মায়ার জাল। সেই জালে আটকা পড়ে তরুণ-যুবকরা। এমনকি নারী-শিশু পর্যন্ত।
মানব পাচারচক্র বহুস্তরবিশিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশে ‘লোয়ার লেভেল’ দালালরা সাধারণত গ্রামের পরিচিত ব্যক্তি। তাদের কাজ যুবকদের প্রলুব্ধ করা, টাকা নেওয়া এবং ‘মিড লেভেল’ নেটওয়ার্ক ঢাকা বা চট্টগ্রামে পৌঁছে দেওয়া। যেখান থেকে দালালরা ভিসা, নথি, পাসপোর্ট, টিকিটের ব্যবস্থাসহ ‘প্যাকেজ’ পরিচালনা করে। লিবিয়া-মরক্কোতে রয়েছে পাচারকারীদের সবচেয়ে ভয়ংকর চক্র। সেখানে তাদের পরিচালিত টর্চার ক্যাম্পে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের যুবকদের আটকে রেখে নির্যাতন করে আরও টাকা আদায়ের কথাও শোনা যায়। মানবাধিকার সংস্থার মতে, এই ক্যাম্পগুলো যেন আধুনিক দাসশালা।
৬ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘হাতছানি স্বপ্নের : পরিণতি মৃত্যু’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ-সংক্রান্ত ভয়াবহ তথ্য। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাগরপথে ইউরোপে যাওয়ার অবৈধ প্রবণতা বেড়েছে। মানব পাচারকারীদের অমানবিকতা, লিবিয়ার ‘টর্চার ক্যাম্প’, মরক্কোর উপকূলে নৌকাডুবি এতকিছুর পরও যুবকরা দালালের আশ্বাসে পথে নামছেন। এতে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে নিখোঁজের তালিকা। সাগরে ভাসমান ট্রলারগুলোতে ঠাসা মানুষের আর্তচিৎকার মিলিয়ে যায় শূন্যে। ভূমধ্যসাগর হোক কিংবা মিয়ানমার-মালয়েশিয়ার রুটÑ সবখানেই অভিন্ন এক দৃশ্য : পানির ঢেউ যেন মৃত্যুবার্তার দূত। কখনও ইঞ্জিন থেমে যায়, কখনও খাবার ফুরিয়ে আসে, কখনও ট্রলার ডুবে যায় রাতের অদৃশ্য অন্ধকারে। বেঁচে ফিরে আসা মানুষের বর্ণনায় সাগরের সেই ভয়ংকর রাতগুলো যেন সেই কবিতার চরণের মতোই বেদনাবিধুরÑ ‘জীবন যেন বাতাসে দুলে থাকা এক প্রদীপ, যা যেকোনো মুহূর্তে নিভে গিয়ে গভীর অন্ধকারে হারিয়ে যেতে পারে।’
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৩ হাজার মানুষ। যাদের উল্লেখযোগ্য অংশই দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিক। তালিকায় বাংলাদেশের নামও রয়েছে। ভাগ্য বদলাতে এই বিপজ্জনক পথে বাংলাদেশি তরুণদের এই আত্মহনন নতুন নয়। গত বছরের ডিসেম্বরে নৌকা ডুবে ৮ বাংলাদেশির সলিলসমাধি হয়। পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ বছরে (২০১৪-২০২৪) প্রায় ৩০ হাজার মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে পথে মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে, যার একটি অংশ বাংলাদেশি। আসলে অবৈধভাবে সাগরপথ পাড়ি দেওয়া প্রতিটি নৌকা যেন নিয়তির সঙ্গে মৃত্যুর লটারি খেলা। খাবার ফুরিয়ে যাওয়া, ইঞ্জিন বিকল, অতিরিক্ত আরোহীর ভারে ট্রলার ডুবে যাওয়াÑ এই সবকিছুই বারবার প্রমাণ করে স্বপ্নের রঙ কীভাবে কালো অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। উদ্ধার পাওয়া কয়েকজনের চোখের ভাষায় লুকিয়ে থাকে হাজার মৃত মানুষের গল্পÑ তারা বলে, ‘স্বপ্ন ছিল, কিন্তু সাগর তা গ্রাস করল।’
মানব পাচার শুধু অপরাধ নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। দালালচক্র মানুষের দুঃস্বপ্নকে তাদের পণ্যে রূপান্তর করে। এদের নির্মম জালের সামনে রাষ্ট্র, আইন এবং সমাজÑ সবই যেন অসহায়। এই চক্রকে রোধ করতে কঠোর নজরদারি, সিন্ডিকেট দমন, সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিরাপদ বৈধ অভিবাসন পথ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
আমরা মনে করি, মানব পাচারবিরোধী রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জোরদার করতে হবে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই। কারণ প্রতিটি জীবনই একটি কবিতাÑ যার মধ্যে ভাসে আশা, ভালোবাসা, ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা। সেই কবিতা যেন আর কখনও সাগরের অন্ধকারে থেমে না যায়। আর কোনো মানুষ যেন সাগরের ঢেউয়ে মৃত্যুর হাতছানির আহ্বানে পা না বাড়ায়। এটা সত্য, স্বপ্ন মানুষকে বাঁচতে শিখায়Ñ কিন্তু ভুল স্বপ্ন যেন আর কাউকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে না দেয়।