× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বেগম খালেদা জিয়া

রাজনীতির ধ্রুবতারা, সুস্থ হয়ে উঠুন

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:৪১ এএম

রাজনীতির ধ্রুবতারা, সুস্থ হয়ে উঠুন

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে যিনি দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে গণতন্ত্র, আন্দোলন ও সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছেন। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসনও। যাকে মানুষ ‘আপসহীন নেত্রী’র খেতাবে ভূষিত করেছে। তিনি আজ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টাসহ দেশের সকল মানুষ প্রার্থনা করেছেন তার সুস্থতার জন্য। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা খালেদা জিয়াকে ঘিরে আজ যে উদ্বেগ দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে- তা তার রাজনৈতিক জীবনের গভীরতা, জনগণের আবেগ এবং রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে তার অবস্থান আবারও উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। 

ধ্রুবতারা হলো রাতের আকাশে একটি উজ্জ্বল ও স্থির তারা। যা উত্তর মেরুর ওপরে অবস্থান করে। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির আকাশে তেমনই একজন ধ্রুবতারা হচ্ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন শাহাদতবরণ করতে হয় তখন খালেদা জিয়া নিতান্তই একজন গৃহবধূ। রাজনীতি নিয়ে চিন্তাধারা তো দূরের কথা, রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানেও তাকে খুব বেশি দেখা যেত না। প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এক পর্যায়ে বিচারপতি সাত্তারকে অপসারণ করে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। একদিকে দলীয় কোন্দল, অন্যদিকে বিএনপির অনেক নেতার এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগদানÑ এই দুই পরিস্থিতিতে বিএনপি তখন অনেকটা ছত্রভঙ্গ, বিপর্যস্ত এবং দিশাহারা। তখনই জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রয়োজনে ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসে রাজনীতিতে আসেন খালেদা জিয়া।

৪৪ বছর আগে কঠিন ও দুর্যোগময় সময়ে বেগম খালেদা জিয়া দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দলÑ বিএনপির। সেই থেকে বারবার মুখোমুখি হয়েছেন নানা উত্থান-পতন, চড়াই-উতরাই ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিস্থিতির মধ্যে। সবকিছু মোকাবিলা করেন তিনি, কোনোকিছুই টলাতে পারেনি তাকে। পাঁচবার হয়েছেন কারাবন্দি। সহ্য করেছেন নির্যাতন ও লাঞ্ছনা। তবুও দলের নেতৃত্ব দিতে কখনোই পিছপা হননি বেগম জিয়া। অটল ও অবিচল থেকেছেন সকল সময়। দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে একেবারে সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও শক্ত হাতে এগিয়ে নিয়েছেন দলকে। ওয়ান ইলেভেনের বিরাজনীতিকরণের সময় প্রচণ্ড চাপের মুখেও দেশত্যাগ করতে বাধ্য করতে পারেনি তাকে। 

এরশাদের শাসন আমলে একযোগে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে নামে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। সে সময়ে আওয়ামী লীগ ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। ’৮৬ সালে এরশাদ এক নির্বাচন আয়োজন করলেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত সিদ্ধান্ত নিল যে তারা নির্বাচন বর্জন করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও জামায়াত এরশাদের আয়োজিত ৮৬’র নির্বাচনে অংশ নেয়। সেই নির্বাচনে অংশ না নিলেও খালেদা জিয়া তথা বিএনপির জনপ্রিয়তা উঠে তুঙ্গে। ’৯০ সালে এরশাদের পতন হলো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আয়োজনে ১৯৯১ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে বিএনপি জয়লাভ করে। রাজনীতিতে আসার ১০ বছরের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হলেন খালেদা জিয়া।

১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে পূর্ণ মেয়াদ শাসন করলেন বেগম খালেদা জিয়া। মেয়াদ শেষে তিনি দলীয় সরকারের অধীনেই ১৯৯৬ সালের নির্বাচন দিলেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে এটি ছিল একটি রাজনৈতিক ভুল। একই ভুল ২০১৪ সালে শেখ হাসিনাও করেছিলেন। কিন্তু বেগম জিয়া যখন দেখলেন এই নির্বাচনের পক্ষে জনগণের সমর্থন নেই, তখন তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে বসে থাকলেন না, কোনো আন্দোলনকারীর ওপর গুলিও চালালেন না। তিনি তার ভুল সুধরে নিলেন। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন করে নির্বাচন দিলেন। তার নেতৃত্বগুণে ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে বিএনপি। খালেদা জিয়া নির্বাচিত হন তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী। এই মেয়াদ শেষে খালেদা জিয়ার ক্ষমতা হস্তান্তর করার পরই ২০০৭ সালে, দেশের রাজনৈতিক আকাশে দেখা দেয় কালো মেঘের ঘনঘটা। ফখরুদ্দীন ও মইন ইউ আহমদের নেতৃত্বে বিরাজনীতিকরণের নীলনকশা প্রস্তুত করা হয়। আর এরই অংশ হিসেবে বেগম জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর চক্রান্ত প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু বরাবরের মতো সেবারও অদম্য থাকেন বিএনপির চেয়ারপারসন। মাথা নত না করে অটল থাকেন তিনি। অবশেষে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। ওয়ান ইলেভেনের সময় নানাভাবে চাপে পড়ে যায় বিএনপি। তবে কারামুক্ত হয়েই বিএনপিকে গোছানোর কাজে নেমে পড়েন খালেদা জিয়া। নবম সংসদ নির্বাচনের সময়, সারা দেশ ঘুরে ঘুরে জনসভা ও পথসভা করেন তিনি। সেই নির্বাচনে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও ভূমিকা রাখছিলেন তিনি। 

২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ড, ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরের ঘটনা, এসব নিয়ে ১৪’র নির্বাচনের আগে অনেকটা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা সেটা বুঝতে পেরেছিলেন, তাই তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিলেন না, এমনকি এই প্রথাই বাতিল করে দিলেন। বেশ কিছু সূত্র থেকে জানা যায়, সে সময়ে শেখ হাসিনা বেগম জিয়াকে ২০১৪ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিনিময়ে বেশ কিছু মন্ত্রণালয় দেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু এইবরও আপস করলেন না খালেদা জিয়া। ‘তত্ত্বাবধয়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন’ এই দাবিতে অনড় ছিলেন তিনি। ফলাফল বিএনপি ২০১৪ নির্বাচনও বর্জন করল। 

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে ঢাকার পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। যদিও ২০১৬ সালের ২৯ জুলাই পুরনো কারাগারটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় এবং সব কয়েদিকে নবনির্মিত ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়। এরপর দেশে শুরু হয় একের পর এক পাতানো নির্বাচন। সেবারও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন বিএনপির চেয়ারপারসন। তবে ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় দণ্ড দিয়ে তাকে কারাবন্দি করা হয়। শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হলেও, উন্নত চিকিৎসার জন্য যেতে দেওয়া হয়নি বিদেশে। অবশেষে পাঁচ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনা সরকার। দীর্ঘদিনের স্বৈরতান্ত্রিকতার অবসান হয়। দীর্ঘদিনের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন বেগম খালেদা জিয়া। সফল হয় তার আন্দোলন-সংগ্রাম।

এই মুহূর্তে যখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ক্রান্তিকাল চলছে, দীর্ঘ দুঃশাসনের অবসানের পর নতুন পথচলা শুরু হচ্ছে তখন জনগণ এমন একজন অভিভাবকের প্রত্যাশা করছে যিনি অভিজ্ঞ, পরিণত, বিভক্ত রাজনীতিকে সংকুচিত করে ঐক্যের রেখা তৈরি করতে পারবেন। এই জায়গায় এসে বেগম জিয়ার অসুস্থতা একটি বৃহৎ শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা দেশবাসীর অনুভূতিকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলছে। তার নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, সংযম সবই আজকের অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্য মূল্যবান সম্পদ।

বাংলাদেশের ভগ্নদশার রাজনীতিতে বহু ঝড়ঝঞ্ঝা মোকাবিলা করেই টিকে আছেন খালেদা জিয়া। তাইতো বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের চাওয়া বাংলাদেশের রাজনীতির এই ধ্রুবতারা এই রাজনীতিকের সুস্থতা এবং তাদের স্বপ্নের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তার অভিভাবকত্ব। খালেদা জিয়া শুধু কেবল একটি নাম নন, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনিবার্য অধ্যায়, যা নতুন প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয় গণতন্ত্রের জন্য লড়াই কখনও থেমে থাকে না। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে সুস্থতা দান করুন।


এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

রাজনীতিক ও কলাম লেখক 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা