× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ

জবাবদিহিতার পথে একটি নতুন প্রত্যাশা

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:২৫ পিএম

জবাবদিহিতার পথে একটি নতুন প্রত্যাশা

‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, আর পুলিশ ছুঁলে ছত্রিশ ঘা।’ পুলিশের পাল্লায় পড়া যে বাঘের কবলে পড়ার চেয়েও বেশি ভয়ংকরÑ সেটিই ফুটে উঠেছে বাংলা প্রবচনটিতে। আবার ‘আকাশের যত তারা, পুলিশের তত ধারা।’ এই প্রবচনে মানুষকে হয়রানি করার জন্যে পুলিশের হাতে আইন ও অজুহাতের যে অন্ত নেইÑ সেই তিক্ত অভিজ্ঞতাই বিধৃত হয়েছে। এসব প্রবাদ-প্রবচনের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের ব্যাপারে ধারণা খুবই নেতিবাচক। বিদেশি শাসকেরা তাদের শাসন-শোষণ টিকিয়ে রাখার স্বার্থে জনসাধারণের ওপর দমন-পীড়ন চালাতে পুলিশকে ব্যবহার করার কারণেই দীর্ঘকাল ধরে পুলিশের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা গড়ে উঠেছে।

অথচ পুলিশের হওয়ার কথা ছিল জনগণের। তাদের কর্তব্য হওয়ার কথা ছিল দুষ্টের দমন ও শিষ্টের সুরক্ষা। কারণ মানুষ রাষ্ট্র গড়েছিল প্রবলের পীড়ন থেকে দুর্বলের সুরক্ষা দিতে। রাষ্ট্রের এই কর্তব্য পালনের প্রধান হাতিয়ার পুলিশ। স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর আশা ছিল পুলিশ জনগণের হবে। আইনের প্রয়োগে তারা দুর্বৃত্তদের দমন করবে আর শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেবে। কিন্তু তা হয়নি। পুলিশকে ব্যবহার করে স্বাধীন দেশের শাসকরা স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে। হত্যা, খুন, অপহরণ, জুলুম ও মিথ্যা মামলার কারিগর বানিয়েছে পুলিশকে।তাই মানুষ তাদের ক্রোধোন্মত্ততার প্রকাশ ঘটিয়েছে পুলিশের ওপর বিগত ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনে। ফ্যাসিবাদ পতনের পর জোরালো দাবি ওঠেÑ পুলিশ পুনর্গঠন ও সংস্কারের। সেই লক্ষ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে। ৫ ডিসেম্বর রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের এক বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ অনুমোদনের সংবাদটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। যার মূল উদ্দেশ্য, পুলিশের মধ্যে স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব আনা এবং পুলিশকে একটি স্বাধীন বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা। 

আসলে পুলিশের ভূমিকা দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন এবং নাগরিক সেবার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকা। পুলিশ ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্রের কথা কল্পনাও করা যায় না। এই প্রেক্ষাপটে নতুন পুলিশ কমিশন গঠন নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এখন প্রয়োজন দৃঢ় বাস্তবায়ন। যদি সরকার ও কমিশন আন্তরিকভাবে কাজ করে, তবে এই উদ্যোগ কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়Ñ এটি হতে পারে রাষ্ট্রে ন্যায়, আস্থা ও সুশাসনের অন্যতম ভিত্তি। আমরা মনে করি, এটি বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কার আনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকরা এ উদ্যোগকে দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে গতিশীল করার এক নতুন পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা এবং নাগরিকের আস্থা কতটা নিশ্চিত করা যায়Ñ তার ওপর।

৫ ডিসেম্বর ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’-এ প্রকাশিত পুলিশ কমিশন গঠন সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, অধ্যাদেশটির আওতায় পাঁচ সদস্যের একটি কমিশন থাকবে, যার প্রধান হবেন সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। এ কমিশন নাগরিকের অভিযোগ অনুসন্ধান-নিষ্পত্তি, পুলিশ সদস্যদের ক্ষোভ নিরসন ইত্যাদি বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। কমিশনের অন্য সদস্যরা হবেনÑ একজন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ, অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার নিচে নন এমন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক, মানবাধিকার ও সুশাসন বিষয়ে অন্তত ১৫ বছর অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ একজন ব্যক্তি। আশা করা যায়, সরকারের এ উদ্যোগ সফল হলে কেবল সুশাসনের নতুন অধ্যায়ই শুরু হবে না দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জনবান্ধব, আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক হবে। সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে, যা পুলিশ বাহিনীর জন্য অমূল্য সম্পদ। তবে তার আগে কমিশনের সদস্য নির্বাচন অবশ্যই স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে হবে। 

এ কথা সত্য যে, সূচনার শুরু থেকেই দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিয়ে আসছে পুলিশ বাহিনী। এর বিকল্প নিরাপত্তা কোনো প্রশাসনিক সংস্থা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। কিন্তু রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান স্তম্ভ হলেও দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড জনমনে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। আমরা মনে করি, একটি কার্যকর পুলিশ কমিশন গঠনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিতÑ পুলিশ বাহিনীর নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, অভিযোগ তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্ধারণ করা। পাশাপাশি পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা, অভিযোগের দ্রুত ও ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা, মানবাধিকার লঙ্ঘন কমানো এবং জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ককে আস্থাভিত্তিক করা। অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন সেল ও অনলাইন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। পুলিশের মানবিক আচরণ, মানবাধিকার সচেতনতা, আধুনিক তদন্ত প্রক্রিয়া ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। কমিশনের বার্ষিক কার্যক্রম, তদন্তের সংখ্যা, গৃহীত সিদ্ধান্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন। সাধারণ নাগরিক যেন সহজে অভিযোগ জানাতে পারে এবং ভয়ভীতি ছাড়া প্রতিকার পায়Ñ এই নিশ্চয়তা দিতে হবে। এসব সম্ভব হলে পুলিশের হারানো সুনাম ফিরে আসবে এবং আইনশৃঙ্খলার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার হবে।

আমরা বিশ্বাস করি, পুলিশ কমিশন গঠনের মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠবে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, গণতন্ত্রের স্থিতি এবং নাগরিক আস্থার প্রশ্নে পুলিশ বাহিনী আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠবে। সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা প্রশংসনীয় কিন্তু এখন সময় দৃঢ় বাস্তবায়নের। আমরা মনে করি, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ একটি পুলিশ কমিশনই পারে সমাজে ন্যায়বিচার ও সুশাসনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে। আমাদের বিশ্বাস, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ প্রশাসনিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দেশবাসীর প্রত্যাশাÑ কমিশন যেন নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং কার্যকর পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত করে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা