ইমেইল থেকে
আব্দুল কাদের জীবন
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:২১ পিএম
পুরান ঢাকায় পাথর নিক্ষেপ করে মানুষ হত্যার নির্মম দৃশ্য কিছুদিন আগেই সমগ্র দেশকে কাঁদিয়েছে। প্রকাশ্যে গুলি করে একের পর এক প্রাণ কেড়ে নেওয়ার বর্বর চিত্রও আলোড়িত করেছে দেশকে। এসব অপরাধ সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। কিন্তু এবার যে ঘটনাটি জাতি দেখল, তা যেন এক ভিন্ন স্তরের নিষ্ঠুর অমানবিকতার পরিচয় বহন করে। এবার সেই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের শিকার হলো একেবারে অবুঝ নিষ্পাপ প্রাণীÑ ৮টি কুকুর ছানা। তাদের পানিতে ডুবিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আর সেই দৃশ্য দেখে, মা কুকুরটির সন্তানহারা অসহায় চাহনি এবং গগনবিদারী আহাজারি আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে আঘাত করেছে।
পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলা চত্বর ছিল জন্মদাত্রী মাসহ ৮টি কুকুরছানার আবাসস্থল। তাদের খেলার জায়গা, তাদের নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু সেই নিরাপদ আশ্রয়েই ঘটল এমন ভয়াবহ ঘটনা। মায়ের অনুপস্থিতিতে আটটি কুকুরছানাকে বস্তাবন্দি করে পানিতে ডুবিয়ে মারা হলো। পরে যখন মা কুকুরটি ফিরে এসে দেখল তার ৮টি ছানা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে, সে মুহূর্তের করুণ দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা নেই। সেই দৃশ্য আমাদের মনে গেঁথে থাকবে অমানবিকতার এক চরম নিদর্শন হিসেবে।
এ কেমন অমানবিক আচরণ? দিন দিন কি আমরা হৃদয়হীন, সংবেদনাহীন হয়ে উঠছি? আমরা নিজেদের সভ্য বলে দাবি করি, অথচ অবুঝ প্রাণীদের প্রতি আমাদের এই অমানুষের মতো আচরণই বলে দিচ্ছে আমরা কতটা নিকৃষ্ট মানসিকতার অধিকারী হতে পারি। কী দোষ ছিল কুকুরছানাগুলোর? এই প্রশ্নটি আজ আমাদের বিবেকের দরজায় আঘাত করছে। আমাদের হৃদয় মানছে না এই নির্মমতা। যে সমাজে মানুষ এমন নিষ্ঠুরতা দেখাতে পারে, সেই সমাজে আর কোনো প্রাণের নিরাপত্তা কোথায়?
এই নির্মম হত্যার জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে একজন নারীকে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলোÑ একজন নারী, যিনি মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ করেছেন বা সেই সহজাত মমতার অধিকারী, তিনি কীভাবে এমন ঘৃণিত, চরম নিষ্ঠুর কাজটি করতে পারলেন? মাতৃত্বের পবিত্র অনুভূতি কি তাকে এতটুকুও বাধা দিল না? মা যখন নিজ হাতে অন্য একটি মায়ের কোল খালি করে দেয়, তখন আমাদের বুঝতে কষ্ট হয় না যে মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় হয়েছে, আবেগ-ভালোবাসায় নেমেছে ধস।
এই ঘটনা আমাদের দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার সংরক্ষণ ব্যবস্থার দৈন্যদশাটিও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আমাদের সমাজে হরহামেশা নানান অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। আর এই আটটি কুকুরছানার নির্মম মৃত্যু স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মানবাধিকারের দিক থেকে পিছিয়ে থাকা এই রাষ্ট্রে শুধু মানুষই নয়, প্রাণীরাও অনিরাপদ।
কুকুর আমাদের সমাজে এক অতি সাধারণ প্রাণী হিসেবে পরিচিত। আমাদের দেশের প্রায় সব জায়গায় এদের দেখা যায়। সামান্য খাবার পেয়ে গেলেই তারা হয়ে ওঠে আমাদের নির্জন পথে চলার বিশ্বস্ত সঙ্গী। তারা আমাদের বাসাবাড়ির আশপাশে থাকে, সার্বক্ষণিক সজাগ থাকে। মনিবের বাসায় অপরিচিত কেউ প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই চিৎকার করে সতর্ক করে তোলে। কুকুরকে বিশ্বস্ত বন্ধুও বলা যায়।
আসলে শুধু কুকুরই নয়, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীই কোনো না কোনোভাবে আমাদের উপকারের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। সৃষ্টির প্রতিটি জীবই মহামূল্যবান। প্রতিটি প্রাণের প্রতি মমতা ও যত্নশীল হওয়া মানবিকতার প্রধান ভিত্তি। ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, জীবে প্রেম করা মানেই সৃষ্টিকর্তাকে খুশি রাখা। যে ব্যক্তি একটি জীবের যত্ন নিতে পারে না, ভালোবাসা দিতে পারে না, সে আসলে একজন অমানবিক ব্যক্তি হিসেবে স্রষ্টার কাছেও ঘৃণিত। আমাদের মনে রাখা উচিত, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীই এই গ্রহের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য। তাদের অবদানের কারণেই আমাদের চারপাশের পরিবেশ এত সুন্দর।
কুকুরছানাগুলোর লাশ যখন পাওয়া গেল, সেই দৃশ্য দেখে সবার হৃদয় কেঁপে উঠেছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মা কুকুরটির বুকফাটা আর্তনাদ এবং অসহায়ত্ব আমাদের চোখে জল এনেছে। মা কুকুরটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা আমাদের জানা নেই। শুধু অনুভব করতে পারি, সেই মা তার মনের গহিনে পাহাড়সম কষ্ট ধারণ করে আছে। এই ঘটনা যদি কোনো মানুষের সন্তানের সঙ্গে ঘটত, তবে সমাজের প্রতিক্রিয়া কেমন হতো? সেই একই বেদনা, একই শূন্যতা আজ একটি অবুঝ প্রাণীর মনেও জমা হয়েছে।
এই নির্মম ঘটনা সমাজের এক গভীর ক্ষতকে উন্মোচিত করেছে। আমরা এমন একটি সমাজে বাস করতে চাই না, যেখানে অবুঝ প্রাণীরাও মানুষের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে জোর দাবি জানাচ্ছিÑ সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত শাস্তি দিন। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করতে হবে। কঠোর আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে এই বার্তাটি পৌঁছে দিতে হবে যে, এই দেশে মানুষের মতো প্রাণীরাও সুরক্ষিত থাকার অধিকার রাখে। পশুপাখিদের প্রতি মমতা ও সহানুভূতির সংস্কৃতি তৈরি করাই হোক আমাদের নতুন করে মানবিক হয়ে ওঠার প্রথম পদক্ষেপ।
আব্দুল কাদের জীবন
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়