× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

প্রাথমিক শিক্ষা, আমরা উদ্বিগ্ন

আসাদুজ্জামান খান মুকুল

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:১৯ পিএম

প্রাথমিক শিক্ষা, আমরা উদ্বিগ্ন

দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন আমরা উদ্বিগ্ন হই, তখন অনিবার্যভাবেই প্রথমে চোখে পড়ে শিক্ষার ভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা। এই স্তরেই শিশুর হাতে তুলে ধরা হয় চিন্তার প্রথম বীজ, শেখানো হয় প্রশ্ন করতে, বুঝতে, স্বপ্ন দেখতে। প্রাথমিক শিক্ষা হলো যেকোনো জাতির মেরুদণ্ড, যা নির্ধারণ করে দেয় সেই জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও মানবিকতার দৌড়ে কতদূর এগিয়ে যাবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের এই ভিত্তি আজ সংকটের মুখে। প্রায় ২ কোটি শিশু, যাদের হাত ধরে দেশ আগামীতে এগিয়ে যাবে, তাদের শিক্ষাদান করছেন যে শিক্ষকরা, তারাই আজ হতাশা, ক্ষোভ ও বঞ্চনার এক অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও, মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিক্ষকের মানসিক চাপ, প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা এবং আর্থিক বৈষম্য পুরো শিক্ষাব্যবস্থাটাকে আস্তে আস্তে দুর্বল করে দিচ্ছে।

প্রাথমিক শিক্ষকতা আজ দেশের অন্যতম বৈষম্যপূর্ণ পেশা। এই বৈষম্য কেবল শিক্ষকদের কর্মস্পৃহাকে নষ্ট করছে না, এটি মেধাবী তরুণদেরও এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করছে। একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে, অর্থাৎ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে, সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে যারা শিক্ষকতা শুরু করেন, তাদের মধ্যে বেতনের গ্রেডিং-এ আকাশ-পাতাল পার্থক্য। যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পান ১৩তম গ্রেড, সেখানে পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পান ১০ম গ্রেড। এটি একটি অগ্রহণযোগ্য দ্বিচারিতা। একই শিক্ষানীতি, একই কারিকুলাম অনুসরণ করে, শিশুদের একই রকম দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও এই ভিন্নতা চরম হতাশাজনক। এই বৈষম্য কেবল বেতনে নয়, সমাজের দৃষ্টিতেও গভীর রেখাপাত করে।

শিক্ষক সমাজের আরেক দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা হলো পদোন্নতিহীন দীর্ঘ পথচলা ও বকেয়া টাইমস্কেল। শিক্ষকদের পেশাগত জীবনের একটি স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা থাকে পদোন্নতি, যা তাদের কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি দেয় এবং নতুন উদ্যমে কাজ করতে উৎসাহিত করে। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষকদের ক্ষেত্রে পদোন্নতি যেন এক সোনার হরিণ। দশ বছর, ষোলো বছর পূর্তির পর যে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার কথা, অর্থাৎ টাইমস্কেল সেটি বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা অমানবিক। এই বকেয়া বেতন-ভাতা শিক্ষকদের পারিবারিক জীবনেও চরম আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আদালতের জটিলতা, যা পুরো পদোন্নতি ব্যবস্থা অচল করে রেখেছে। বহু বছর ধরে চলমান মামলা-মোকদ্দমার কারণে পদোন্নতির ফাইলগুলো আটকে আছে, আর শিক্ষকরা বছরের পর বছর একই পদে থেকে অবসরের দিকে এগোচ্ছেন।

সারা দেশে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি দেখানোর জন্য নতুন ভবন, নতুন কক্ষ, নতুন দালান তৈরি হচ্ছেÑ অবকাঠামোগত উন্নয়নে খরচ হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অনেক স্কুলেই নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক। এই ভারসাম্যহীন উন্নয়ন একটি বিপরীতমুখী চিত্র তৈরি করেছে। একদিকে দৃষ্টিনন্দন ভবন, অন্যদিকে শূন্য শিক্ষক পদ। এই শিক্ষক সংকটের কারণে বহু বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে দুই-তিনটি শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে। এর ফলে পাঠদান রূপ নিচ্ছে কেবল আনুষ্ঠানিকতায়, শেখা রূপ নিচ্ছে যান্ত্রিকতায়। গুণগত মান সেখানে গৌণ হয়ে যাচ্ছে।

প্রশিক্ষণে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও যদি ক্লাসরুমে তার প্রতিফলন না ঘটে, তবে সেই অর্থ ব্যয় প্রায় বৃথা। আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি শিশুদেরকে খেলাচ্ছলে এবং ব্যবহারিক উপায়ে শেখার ওপর জোর দেয়। ডিজিটাল কনটেন্ট, বিজ্ঞানের মডেল, মানচিত্র, খেলার সরঞ্জাম, এগুলোর মাধ্যমে শিশুরা সহজে এবং আনন্দের সঙ্গে শেখে। উপকরণের অভাবে শিক্ষকরা তাদের সৃজনশীলতা প্রয়োগ করতে পারেন না। এটি কেবল শিক্ষকের হতাশা বাড়ায় না, শিশুদের শিখনেও একঘেয়েমি চলে আসে। প্রশিক্ষণের সার্থকতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি বিদ্যালয়ে যেন প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক উপকরণ ও ডিজিটাল সুবিধা নিশ্চিত করা হয়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

শিক্ষকের ন্যায্য দাবি দীর্ঘদিন অস্বীকৃত থাকলে শিক্ষাব্যবস্থা এমন ভরাডুবির দিকেই ধাবিত হবেÑ এটাই ছিল পূর্বাভাস, যা আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। শিক্ষকরা যখন নিজেদের মৌলিক দাবি আদায়ের জন্য শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হন, তখন বুঝতে হবে এই সংকটের শিকড় কত গভীরে। এই শাটডাউন শুধু শিক্ষাকার্যক্রমকে ব্যাহত করছে না, এটি লাখ লাখ শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরকারের দ্রুততম সময়ে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনায় বসে তাদের গ্রহণযোগ্য দাবিগুলো মেনে নিয়ে এই অচলাবস্থা নিরসন করা উচিত। শিক্ষার মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে দীর্ঘস্থায়ী ধর্মঘট জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।

শিক্ষকের সম্মান রক্ষা মানে ভবিষ্যৎ রক্ষা। আমরা যদি সত্যিই উন্নত জাতি হতে চাই, তবে প্রাথমিক শিক্ষককে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ তারা শুধু পাঠ শেখান না, তারা চরিত্র গড়েন, স্বপ্ন জাগান। তাই এখনই সময়Ñ শিক্ষকের ন্যায্য দাবি পূরণ করে প্রাথমিক শিক্ষায় স্থিতি ফিরিয়ে আনা। সরকারের উচিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সমাধান নিয়ে আসা, যা শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করবে। এটাই জাতীয় স্বার্থ, এটাই সামাজিক দায়িত্ব, এটাই আগামী প্রজন্মের প্রতি আমাদের হোক অঙ্গীকার।


আসাদুজ্জামান খান মুকুল

সাভার, হেমগঞ্জ বাজার, নান্দাইল, ময়মনসিংহ 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা