× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস

সুস্থ মাটি ও সুস্থ নগরী চাই

ড. মো. শাহিদুল ইসলাম

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০৬ পিএম

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:১১ পিএম

সুস্থ মাটি ও সুস্থ নগরী চাই

প্রতিবছর ৫ ডিসেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসÑ একটি দিন যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মাটি কেবল ‘ধুলো’ বা ‘ময়লা’ নয়, বরং জীবনের মূলে থাকা এক অনন্য সম্পদ। মাটিই আমাদের খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তি, পানি পরিশোধনের প্রাকৃতিক ছাকনি, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের সহায়ক এবং জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। অথচ বিশুদ্ধ বায়ু বা নিরাপদ পানির মতোই আমরা এর গুরুত্ব বুঝি তখনই, যখন এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২০২৫ সালের বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ মৃত্তিকা, সুস্থ নগরী’Ñ এটি বাংলাদেশের মতো দ্রুত নগরায়িত দেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শহরগুলো যত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে, ততই প্রশ্ন জাগেÑ এই উন্নয়নের নিচে কী আছে? আমাদের নগরীর স্থায়িত্ব, স্বাস্থ্য ও নাগরিক জীবনের মান অনেকটাই নির্ভর করে শহরের মাটির স্বাস্থ্যের ওপর।

নগরায়ণকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে দেখি। কিন্তু এই অগ্রগতির পেছনে এক লুকানো মূল্য আছে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি শহরে উর্বর জমি প্রতিনিয়ত ভবন, রাস্তা, কারখানা ও পার্কিং লটের নিচে চাপা পড়ছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় মৃত্তিকা সিলিংÑ যা মাটিকে ‘শ্বাস নিতে’ দেয় না। ফলে মাটি তার প্রাকৃতিক ভূমিকÑ বৃষ্টির পানি শোষণ, দূষণ পরিশোধন, উদ্ভিদ ও অনুজীবের জীবনধারণÑ সবই হারায়।

এই পরিবর্তনের পরিণতি আমাদের চারপাশেই দৃশ্যমান : বন্যা ও জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি, কারণ বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হতে পারে না; তাপমাত্রা বৃদ্ধি, কংক্রিট ও ডামার তাপ ধরে রেখে সৃষ্টি করে ‘হিট আইল্যান্ড’; জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি। কারণ পোকামাকড়, উদ্ভিদ ও অনুজীব তাদের বাসস্থান হারায়; সবুজ খোলামাঠ ও উদ্যানের সংকোচন, যা নগর কৃষি, শিশুদের খেলাধুলা ও বিনোদনের সুযোগ কমিয়ে দেয়।

ঢাকা একসময় খাল, নিম্নভূমি ও উন্মুক্ত জমির শহর ছিল। আজ সেই স্থানগুলো কংক্রিটে ঢেকে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। একই প্রবণতা চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতেও ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও নগরজীবনের স্বাচ্ছন্দ্য একযোগে হুমকির মুখে পড়ছে।

শহরের মাটি নিছক স্থিত জমি নয়Ñ এটি শহরের প্রাণপ্রবাহের নীরব রক্ষক। সুস্থ মাটি বৃষ্টির পানি ধরে রাখে, জলাবদ্ধতা কমায় এবং ভূগর্ভস্থ পানি পুনরায় পূরণ করে। এটি প্রাকৃতিক ছাকনি হিসেবে দূষণ হ্রাস করে, পানি ও বায়ুর মান উন্নত করে। এ ছাড়া এটি সবুজ উদ্ভিদ, গাছ ও পার্কের জন্য আবশ্যক ভিত্তি সরবরাহ করেÑ যা কার্বন শোষণ করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং নাগরিকদের মানসিক প্রশান্তি দেয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকায় ছাদবাগান, বারান্দা কৃষি ও ছোট আকারের কমিউনিটি গার্ডেন শহরের মানুষের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ জাগিয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও সিলেটে কিছু উদ্যোগ প্রমাণ করছে, সীমিত জায়গায়ও মাটির সঠিক ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদন ও সবুজায়ন সম্ভব। পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে যেমন টোকিও, সিঙ্গাপুর বা বার্লিনে সবুজ ছাদ, উল্লম্ব উদ্যান ও নগর বন সৃষ্টির মাধ্যমে নগরজীবনে প্রাণ ফিরিয়ে আনা হচ্ছেÑ বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রয়াস ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়; বরং জলবায়ু সহনশীলতা, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের কার্যকর সমাধান।

বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস কেবল সচেতনতা সৃষ্টির দিন নয়Ñ এটি এক সমবেত দায়িত্ববোধের আহ্বান। সরকার, নগর পরিকল্পনাবিদ, বিজ্ঞানী, নাগরিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণÑ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে শহরের নিচের এই জীবন্ত স্তরটিকে রক্ষা ও পুনরুদ্ধারের জন্য। এর জন্য প্রয়োজনÑ নগর পরিকল্পনা, রাস্তা নির্মাণ ও উন্নয়ন নীতিতে মৃত্তিকা স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করা; সবুজ অবকাঠামো ও পার্ক উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো, যেখানে মাটিকে প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে; ছাদবাগান, কম্পোস্টিং, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও নগর কৃষির মতো উদ্যোগকে উৎসাহিত করা; টেকসই নির্মাণ পদ্ধতি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ও সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

সুস্থ মাটি কেবল পরিবেশ নয়Ñ এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতারও মূল ভিত্তি। এটি নির্ধারণ করে আমরা কীভাবে বাস করব, কী খাব, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে কীভাবে খাপ খাওয়াব।

২০২৫ সালের বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেÑ সুস্থ নগরী গড়তে হলে শুরু করতে হবে মাটি থেকে। শহরের নিচের এই মাটি নীরবে টিকিয়ে রাখে নগরজীবনের প্রতিটি প্রক্রিয়াÑ বায়ু চলাচল, পানিপ্রবাহ, গাছের বৃদ্ধি এবং এমনকি নাগরিকদের মানসিক শান্তি পর্যন্ত।

আজ মাটির যত্ন নিলে, আগামী প্রজন্ম পাবে এমন এক শহরÑ যা শুধু বসবাসযোগ্য নয়, বরং জীবন্ত ও মানবিক হবে।


ড. মো. শাহিদুল ইসলাম

মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ও সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা