× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ধান উৎপাদন

জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলা সময়ের দাবি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:১১ পিএম

জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলা সময়ের দাবি

বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি মূলত ধাননির্ভর। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের জীবিকা, এমনকি জাতীয় স্থিতিশীলতাও অনেকাংশে ধানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই ধান উৎপাদন আজ ব্যাপক হুমকির মুখে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, খরা, অপ্রত্যাশিত বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বর্ষণÑ সব মিলিয়ে কৃষকের মাঠ যেন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। কেবল উৎপাদন কমছে না; কমছে কৃষকের আস্থা। একদিকে ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে অনিশ্চিত ফলনÑ এ দুয়ের চাপে কৃষি পেশা অনেকের কাছেই ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে দেশে খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের হুমকি দেখা দিতে পারে, যা কোনোভাবেই দেশের জন্য কাম্য নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ধানের উৎপাদন কমে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও কৃষি-ব্যবস্থাপনার উন্নতির মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা ও উপাত্ত বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আগামী দশকগুলোতে বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের অনিয়ম, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রম উৎপাদনশীলতার পতন এবং জলবায়ু, সংবেদনশীল কৃষি, পরিবেশ সব মিলিয়ে ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ কথা সত্য যে, দেশে প্রতিবছরই তাপমাত্রা বাড়ছে, মৌসুমি বৃষ্টিপাত কখনও বেশি, কখনও-বা সম্পূর্ণ অনিয়মিত। এতে ধান, গম, ভুট্টাসহ প্রধান খাদ্যশস্যের জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। মাঠে কাজ করা শ্রমিকদের ওপরও তাপমাত্রার সরাসরি প্রভাব পড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে শ্রমিক উৎপাদন কমার পাশাপাশি ক্রয়ক্ষমতা, বাজারে লেনদেন, পরিবহন ও সরবরাহ-ব্যবস্থায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আর বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগ কৃষি খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। শুধু তাই নয়, জলবায়ুকেন্দ্রিক সংকটের পাশাপাশি অপরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোও কৃষিকে পিছিয়ে দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন জেলায় তাপপ্রবাহের কারণে কৃষি শ্রমঘণ্টা কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। এতে উৎপাদনশীলতা কমছে, জমি প্রস্তুত করতে সময় বেশি লাগছে, শ্রম ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি হিসাব বলছে, শুধু কৃষক নয়Ñ এই ধাক্কা লাগছে পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিতে। 

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বড় সংকট দেখা যাচ্ছে বোরো ধানের উৎপাদনে। বিগত কয়েক বছর ধরে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এ ব্যাপারে সতর্ক করে আসছে। তারা বারবার বলে আসছেÑ বোরো মৌসুমে উৎপাদন বৃদ্ধির হার স্থবির হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের কৃষি মোট উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদনশীলতা বা টোটাল ফ্যাক্টর প্রোডাক্টিভিটি (টিএফপি) ২০১১ সালের পর থেকে স্থবির। ২০১৮-২০২১ সময়ে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। এতে বোঝা যায়, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে যে পরিমাণ সার, সেচ, বীজ, শ্রম ও যান্ত্রিকীকরণ ব্যবহার হচ্ছে, সেই তুলনায় উৎপাদন বাড়ছে কম। মানে ইনপুট ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, পণ্যের দাম সেই হারে বাড়ছে না, ফলে কৃষকের লাভ কমছে। ধানের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও প্রকট, কারণ এর উৎপাদন খরচ বোরো মৌসুমে সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে, প্রযুক্তি গ্রহণে কৃষকের ধীরগতি, জমির খণ্ডিত মালিকানা, এক ফসলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বাজার-ব্যবস্থার আধিপত্যÑ সব মিলিয়ে ধানের উৎপাদনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ধানচাষের লাভজনকতা ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ক্রমাগত কমেছে; ইনপুট খরচ বেড়েছে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ হারে, অথচ ধানের দাম বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৩১ শতাংশ হারে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত সার, কীটনাশক ও রাসায়নিকের সীমাহীন ব্যবহার এখন ভূমি ও পানির গুণগত মান নষ্ট করছে। 

তবে আশার কথা, বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে জলবায়ু-সহনশীল বিভিন্ন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, যা খরা, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা সহনশীল। এগুলোর অধিক প্রচার, সরবরাহ ও চাষাবাদ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একইভাবে কৃষকদের স্মার্ট কৃষিপ্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা জরুরিÑ ড্রোন ব্যবহার, আবহাওয়া-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত, ক্ষেতে পানি ধরে রাখার পদ্ধতি, আধুনিক সেচব্যবস্থাÑ এসবই উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কেবল প্রযুক্তিই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। উপকূলীয় বাঁধ সংস্কার, স্লুইসগেট আধুনিকায়ন, পানি সংরক্ষণ প্রকল্প এবং কার্যকর ভূমি ব্যবস্থাপনা ছাড়া কৃষি টেকসই হবে না। দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে কৃষকদের বিশেষ প্রণোদনা, সঠিক বাজারব্যবস্থা এবং সহজ ঋণসুবিধা প্রদান করাও জরুরি।

আমরা মনে করি, জলবায়ু অভিযোজনকে এখনই কৃষিনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। আজ যে সিদ্ধান্ত নেব, তার প্রভাব পড়বে আগামী ২০ বছরের খাদ্য নিরাপত্তায়। তাই হুমকি শুধু ধানের জন্য নয়Ñ সমগ্র জাতির ভবিষ্যতের প্রতিও। দেশকে আগামী প্রজন্মের জন্য খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখতে হলে সরকার, গবেষক, কৃষিপ্রতিষ্ঠান এবং কৃষকের সমন্বিত উদ্যোগ এখন আর বিলাসিতা নয়; অপরিহার্য। জলবায়ুর অভিঘাত থামানো না গেলেও তার ক্ষতি যে অনেকটাই কমানো সম্ভব তা আমরা প্রমাণ করতে পারব কেবল সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারলে। দেশের ধান ও কৃষিকে রক্ষা করা মানেই দেশের ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাÑ এই উপলব্ধিই এখন জরুরি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা