পরিপ্রেক্ষিত
আল শাহারিয়া
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ পিএম
সাতক্ষীরা বা খুলনার প্রত্যন্ত কোনো গ্রামে গেলে বাতাসের সঙ্গে মিশে থাকা নোনা স্বাদ পাওয়া যায়। একসময় যেখানে ধানের শিষে বাতাস দোল খেত, সেখানে এখন মাইলের পর মাইল নোনা পানির চিংড়ি ঘের। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন মনে হতে পারে। কিন্তু এর পেছনের গল্পটা করুণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। জোয়ারের পানি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চতায় লোকালয়ে প্রবেশ করে। বাঁধ ভেঙে নোনা পানি ঢুকে পড়ে গ্রামে। সেই পানি আর সহজে নামে না। ফলে মিষ্টি পানির আধারগুলো নষ্ট হয়ে যায়। কৃষিজমি চাষাবাদের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। একজন কৃষক যখন দেখেন তার জমিতে আর সোনালি ধান ফলবে না, তখন তার সামনে পথ খোলা থাকে দুটি। এক হলো অনাহারে মৃত্যু, আর দুই হলো জীবিকার সন্ধানে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানো। অধিকাংশ মানুষ দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয়। তারা হয়ে ওঠে জলবায়ু শরণার্থী।
প্রকৃতির এই পরিবর্তন এক দিনে হয়নি। বছরের পর বছর ধরে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফল ভোগ করছে বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষ। সিডর, আইলা বা আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড়গুলো উপকূলের মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের পর হয়তো সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য আসে। কিছু চাল বা ডাল পাওয়া যায়। কিন্তু ভেঙে যাওয়া বাঁধ আর সহজে মেরামত হয় না। নোনা পানি একবার ঢুকলে সেই জমিতে আগামী কয়েক বছর ফসল হয় না। এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা একজন সাধারণ জেলের বা কৃষকের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই তারা বাধ্য হয়ে শহরের দিকে ছোটেন।
আমরা প্রায়ই জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলি। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বড় বড় বুলি আওড়ানো হয়। কিন্তু উপকূলের এই মানুষগুলোর কান্না সেই সম্মেলন কক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে না। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। এই সংখ্যাটি আঁতকে ওঠার মতো। একটি দেশের মোট জনসংখ্যার এত বড় অংশ যদি স্থানচ্যুত হয়, তবে তার প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতির ওপর। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলো এখনই ব্যাপক জনাকীর্ণ। এরপর আরও কোটি মানুষের চাপ সামলানোর সক্ষমতা এই শহরগুলোর নেই।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের এক নিষ্পাপ শিকার। কার্বন নিঃসরণে আমাদের ভূমিকা নগণ্য হলেও এর দায় আমাদের মেটাতে হচ্ছে চড়া দামে। উন্নত দেশগুলো তাদের শিল্পায়ন চালিয়ে যাচ্ছে। আর তাদের বিলাসী জীবনের খেসারত দিচ্ছে আমাদের উপকূলের জেলেরা ও বাওয়ালিরা। এটি এক চরম অবিচার। জলবায়ু তহবিল থেকে যে সাহায্য আসার কথা তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। আবার সেই তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। কেবল বাঁধ নির্মাণ করে এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন টেকসই পরিকল্পনা।
বাস্তবতা হলো জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়। এটি আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। বরগুনা বা পটুয়াখালীর কোনো এক গ্রামের বৃদ্ধ যখন ছলছল চোখে তার ভেঙে যাওয়া ভিটার দিকে তাকিয়ে থাকেন, তখন আমরা বুঝতে পারি এই সংকট কতটা গভীর। তিনি জানেন এই মাটিতে তার পূর্বপুরুষরা ঘুমিয়ে আছেন। কিন্তু তিনি জানেন না তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী হবে। এই শেকড়হীন মানুষের হাহাকার আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়া উচিত। আমরা যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেই তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এক বিশাল মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।
উপকূলীয় মানুষের এই লড়াই এক অসম লড়াই। একদিকে উত্তাল সমুদ্র আর অন্যদিকে জীবনের ক্ষুধা। এই দুইয়ের মাঝে পিষ্ট হয়ে তারা মানচিত্রের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছে। তাদের এই যাত্রার শেষ কোথায় তা কেউ জানে না। তবে আমরা যদি সচেতন না হই, তবে একদিন এই মিছিল আমাদের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াবে। তখন হয়তো করার কিছুই থাকবে না। তাই সময় থাকতে আমাদের জাগতে হবে। উপকূল রক্ষা মানে বাংলাদেশ রক্ষা। এই সত্যটি আমাদের যত দ্রুত সম্ভব অনুধাবন করতে হবে। নোনা জলে আর কোনো কৃষকের চোখের জল মিশতে দেওয়া যাবে না। মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
আল শাহারিয়া
শিক্ষার্থী, দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর