শিক্ষক আন্দোলন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৮:৫১ এএম
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শিক্ষক। তাদের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেল, শিক্ষকদের আন্দোলন তথা কর্মবিরতির ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে বা বিলম্বিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী-অভিভাবক থেকে শুরু করে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। উল্লেখ্য, চার দফা দাবিতে বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাসমাশিস)Ñএর ব্যানারে আন্দোলনরত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এবং ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর ব্যানারে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের (একাংশ) আন্দোলন করছে। তারা কয়েক মাস ধরে বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ নানা দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন।
২ ডিসেম্বর প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এ ‘অধিকাংশ সরকারি স্কুলে হয়নি বার্ষিক পরীক্ষা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা
হয়েছে, সরকারের তরফে হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও দেশের ৭২১টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক কর্মবিরতি ও পরীক্ষা বর্জনসহ নানা কর্মসূচি
পালন করছেন। প্রাথমিক স্কুলগুলোর বার্ষিক পরীক্ষা সোমবার শুরু হওয়ার কথা থাকলেও
বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে তা অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রাথমিকের শিক্ষকরা বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন
করে কর্মবিরতি কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কয়েকটি এলাকায় সহকারী শিক্ষকরা
কর্মবিরতিতে থাকায় প্রধান শিক্ষকরা বিকল্পভাবে পরীক্ষা পরিচালনা করেছেন। এদিকে
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরÑ মাউশি দেশব্যাপী সরকারি ও বেসরকারি নিম্ন
মাধ্যমিক, মাধ্যমিক এবং স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাধ্যমিক স্তরের
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বার্ষিক, নির্বাচনী ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা-২০২৫
নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের নির্দেশ দিলেও তা আমলে না নিয়ে আন্দোলন
চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। ফলে এসব পরীক্ষা ঘিরে তৈরি হয়েছে
ঘোর অনিশ্চয়তা। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
উল্লেখ করা প্রয়োজন,
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৬ মাসের মধ্যে ছয় মাসই বেতন বৃদ্ধি, গ্রেড উন্নয়ন,
জাতীয়করণ ও এমপিওসহ নানা দাবিতে পাঠদান বন্ধ করে আন্দোলন করেছেন প্রাথমিক,
মাধ্যমিক, এমপিওভুক্ত, নন-এমপিওভুক্ত, ইবতেদায়ির শিক্ষকরা। পরিসংখ্যান বলছে, এতে
আড়াই কোটি শিক্ষার্থী ‘শিখন ঘাটতি’র কবলে পড়েছে। তার আগে বিগত স্বৈরাচার সরকারের
পতন আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েকটি স্তরের শিক্ষার্থীরা। সেই
ক্ষতির ধকল পুরোপুরি এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তার ওপর ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’-এর
মতো চলমান এই আন্দোলন যেন আগুনে ঘি দিল। আমরা মনে করি, শিক্ষার্থীর জন্য বার্ষিক
পরীক্ষা কেবল একটি রুটিন ইভেন্ট নয়। এটি তার সারা বছরের পরিশ্রমের মূল্যায়ন। এটি
তার আত্মবিশ্বাসের মাপকাঠি। এটি তার ভবিষ্যতের একটি ধাপ।
তবে
শিক্ষকরা ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেনÑ তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ নেই। বেতন কাঠামো,
চাকরির নিরাপত্তা, পদমর্যাদা পুনর্বিন্যাস এবং প্রাপ্য মর্যাদাÑ এসব মৌলিক চাহিদা অস্বীকার
করা যায় না। একটি রাষ্ট্র যদি শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সম্মান ও সম্মানী না দেয়, তবে সেই
রাষ্ট্রের শিক্ষা-অগ্রগতি স্বয়ং বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু সমস্যাটি হলো, এই দুরবস্থার
মূল বোঝা গিয়ে পড়ছে নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর, যারা সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিয়ে আজ দিশাহারা।
কারণ, বার্ষিক পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাব্রত মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এটি কেবল একটি পরীক্ষা নয়; বরং পুরো বছরের শেখার ফলাফল যাচাইয়ের প্রক্রিয়া। পরীক্ষার
তারিখ বিঘ্নিত হওয়া মানে শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপের মধ্যে পড়া, পরিকল্পনা থেকে বিচ্যুত
হওয়া এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষা-স্তরের অগ্রগতিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়া। এতে মান ক্ষতিগ্রস্ত
হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে একটি অনিশ্চয়তার ছায়া নেমে আসে।
ভুলে
গেলে চলবে না, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই সম্পর্ক যখন অবিশ্বাস
ও ক্ষোভের আবরণে ঢেকে যায়, তখন পাঠদান আর স্বাভাবিক থাকে না। শিক্ষার্থীর মনে তৈরি
হয় ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি। আবার শিক্ষকের মনে থাকে আক্ষেপÑ রাষ্ট্র আমাকে যোগ্য সম্মান
দিচ্ছে নাÑ আমি কীভাবে সম্পূর্ণ নিষ্ঠায় কাজ করব? উভয় পক্ষের এই অসন্তোষই শিক্ষাব্যবস্থাকে
শান্তিহীন করে তোলে। তাই সংকটের সমাধান অবশ্যই জরুরি। সরকারের দায়িত্ব হলো দ্রুত শিক্ষকদের
সঙ্গে আলোচনায় বসা এবং তাদের ন্যায্য দাবিগুলো বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী সমাধানের পথে
এগিয়ে যাওয়া। শিক্ষকতাকে ‘মিশন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তারা যেন আর্থিক নিরাপত্তা
ও সামাজিক মর্যাদা পানÑ সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদেরও সচেতনভাবে আন্দোলনের
ধরন নির্ধারণ করা উচিতÑ যেন শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কম হয় এবং বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি
রাখা যায়।
আমরা
বলতে চাই, এদেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের হাতেই। শিক্ষক তাদের দিশারি, আর রাষ্ট্র সেই
শিক্ষককে দিশা দেয়। এই ত্রয়ী সম্পর্ক যখন ভারসাম্য হারায়, তখন শিক্ষাব্যবস্থার মূল
ভিত্তিই কেঁপে ওঠে। তাই এখনই প্রয়োজন পারস্পরিক সমঝোতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রজ্ঞার
আলোকে সমস্যার দ্রুত সমাধান। আমরা মনে করি, শিক্ষা কারও হাতে বিপণনযোগ্য বা জিম্মি
রাখার বিষয় নয়; এটি একটি জাতির আত্মা, জাতির সামগ্রিক পরিচয়, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ
এবং জনগণের সমষ্টিগত চেতনা।
তাই
পরীক্ষা বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ আটকে রাখা কাম্য হতে পারে না। দেশ ও জাতির
স্বার্থে শিক্ষকদের দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে আসা জরুরি। তাদের ন্যায্য দাবি স্বীকৃত
হোক, সরকার বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিক। আমরা মনে করি, শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাবাহিকতা
রক্ষা করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানই সঠিক পথ— এটাই সবার জন্য মঙ্গল।