× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বন দখল

হারানো বনভূমি পুনরুদ্ধার জরুরি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:২৯ পিএম

হারানো বনভূমি পুনরুদ্ধার জরুরি

দেশের বনাঞ্চলগুলো চরমভাবে হুমকির মুখে। একসময় বনাঞ্চলগুলোর যে পরিবেশÑ ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ সম্পদ ছিল তার অনেকটাই হারিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে বহু বনাঞ্চল দখল হয়ে গেছে। সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু দখলদারদের আগ্রাসন থামছে না কোনোভাবেই। ১ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর এক প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশের আড়াই লাখ একর বনভূমি দখলদারদের কবলে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালের তুলনায় বনায়ন কমেছে এক লাখ একর। এর মধ্যে সংরক্ষিত পাহাড়ি অঞ্চলে বন কমেছে ৮৩ হাজার একর। অথচ এই বনভূমি জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল, নদী-খাল-জলাশয়ের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ, জলবায়ু সুরক্ষার ঢাল এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার অবলম্বন। এমনকি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বনায়নই সবচেয়ে কার্যকর ও স্বল্পব্যয়ী প্রাকৃতিক সমাধান। 

এই হিসাব কেবল পরিসংখ্যানই নয়Ñ এটি আমাদের পরিবেশ, অর্থনীতি, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক গভীর অশনিসংকেত। অপ্রিয় হলেও সত্য, পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিতভাবে এসব বনভূমির একটা বড় অংশ দখল করেছে সরকারিÑ প্রকল্প বা স্থাপনা, প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক গোষ্ঠী, স্থানীয় ভূমিদস্যু এবং করপোরেট স্বার্থান্বেষীরা। বলা চলে, মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডে জীববৈচিত্র্য ও ইকোসিস্টেম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চোরা শিকার, বনভূমি দখল, আগুন, অবৈধভাবে নির্মাণ, ম্যানগ্রোভ বিনষ্টকরণ ও অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচলের কারণে বন ও বন্যপ্রাণী ক্রমাগত হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের চাপও এসব বনকে আরও নাজুক করে তুলছে।

৩০ নভেম্বর রাজধানীর তুলা উন্নয়ন বোর্ডের মিলনায়তনে বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ) আয়োজিত ৪ দিনব্যাপী ‘কৃষি ও খাদ্যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও কর্মশালায় এসব তথ্য ওঠে। কর্মশালায় বলা হয়, প্রতিদিন একজন মানুষের কমপক্ষে ৫৫০ লিটার অক্সিজেন প্রয়োজন। আর এই অক্সিজেন সরবরাহ করতে কমপক্ষে তিনটি পূর্ণবয়স্ক গাছ লাগে। খোদ রাজধানী ঢাকাতেই একটি গাছ ভাগ হচ্ছে প্রায় ২৮ জন মানুষের মধ্যে, যা স্বাভাবিক পরিবেশগত ভারসাম্যের তুলনায় অনেক কম। ফলে আমরা ভয়াবহ সংকটের মধ্যে বসবাস করছি। 

বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১২০০ মানুষ বাস করে। মানুষের আরাম-আয়েশ যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ। ফলে বাংলাদেশে বনভূমির চাপ বেশি এবং বননির্ভরতা আরও বেশি। উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশও ভবিষ্যতে শিল্পঘন দেশে পরিণত হলে কার্বন নিঃসরণ আরও বাড়বে। 

বলতে দ্বিধা নেই, বন দখলের এই সংস্কৃতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বন যেন আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ নয়, অনেকটা ‘যে পারে সে খায়’ নীতিতে পরিণত হয়েছে। এ কথা বলার কারণÑ চট্টগ্রামের পাহাড়ে, সিলেটের পাহাড়ে, গাজীপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চলে, সুন্দরবনের আশপাশে এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাতেও বনভূমি অহরহ দখল হয়ে যাচ্ছে। পাহাড় কেটে বসতি, রিসোর্ট, ইটভাটা, চা-বাগান, ব্যক্তিগত আবাসন গড়ে ওঠার চিত্রও আজ সর্বত্র। 

অথচ বন উজাড় হলে ভূমিধস বাড়ে, বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়, খরা তীব্র হয়, নদী মরে যায়, মাটি অনুর্বর হয়। শুধু তাই নয়, বনভূমি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে বিপন্ন হচ্ছে বন্যপ্রাণীÑ হরিণ, ময়ূর, বনবিড়ালসহ বহু প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপ। হারাচ্ছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির অস্তিত্বও। আসলে পরিবেশগত এই ক্ষতির গভীরতা অনুধাবন করা গেলে ভবিষ্যৎ সংকটের আকার অনুমান করা সহজ। এই ক্ষেত্রে বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। দুঃখজনক সত্য হলোÑ নদীর তীর, খাল, জলাধার, বন, যা পরিবেশগত সম্পদ তা রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই অনেক সময় অসহিষ্ণুতা, দায়িত্বহীনতা বা সরাসরি দুর্নীতির যুক্ত থাকার কথা শোনা যায়।

আমরা মনে করি, বন আইনের কঠোর প্রয়োগ যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে। দখলদার যত ক্ষমতাবানই হোক, আইন তাকে ছাড় দেবে নাÑ এই বার্তা রাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে দিতে হবে। হারানো বনভূমি পুনরুদ্ধার এবং পুনঃবনায়নের বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বনরক্ষায় সম্পৃক্ত করে ‘কমিউনিটি ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট’ গড়ে তুলতে হবে। বনভূমির ডিজিটাল ম্যাপিং, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। তবে সবার আগে দরকার ‘মানসিকতা’র পরিবর্তন জরুরি। বনকে আমরা জীবন রক্ষাকারী প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে দেখতে ও শিখতে হবে। জানতে হবে, বন দখলের ক্ষতি শুধু গাছ কাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়Ñ এটি জলবায়ু দুর্যোগ, কৃষি সংকট, খাদ্য নিরাপত্তা হুমকি এবং মানুষের জীবনধারার ওপর বহুমাত্রিক বিপর্যয় ডেকে আনে। দেশের প্রকৃতি ধ্বংসের এই নীরব যুদ্ধ থামাতে হবে এখনই। নইলে আমরা নিজেরাই নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার অবলম্বন ধ্বংস করব ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা