× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি

প্রত্যাশা ও বাস্তবতার খোঁজে

ড. আলা উদ্দিন

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:২৬ পিএম

প্রত্যাশা ও বাস্তবতার খোঁজে

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, যা সাধারণত ‘শান্তিচুক্তি’ নামে বহুল পরিচিত, দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেছিল। এই চুক্তি আদিবাসী ও বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, শান্তিপূর্ণ এবং সমন্বিত সহাবস্থানের ভিত্তি স্থাপনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে পার্বত্য অঞ্চলে চলা সংঘাত, হত্যাকাণ্ড, ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার পরিপ্রেক্ষিতে এই চুক্তি জনগণের মধ্যে একটি নতুন আশা জাগিয়েছিল। আশা করা হয়েছিল, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগণের অধিকার নিশ্চিতকরণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ভূমি অধিকারের সুরক্ষা এবং স্থানীয় প্রশাসনের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে একটি টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

তবে প্রায় তিন দশক পেরিয়েও সেই প্রত্যাশিত শান্তি অর্জিত হয়নি। চুক্তির মৌলিক শর্তসমূহ এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, যার ফলে আদিবাসী-বাঙালির মধ্যে অবিশ্বাস, সংঘাত এবং বৈষম্য অব্যাহত রয়েছে। ভূমি অধিকার সমস্যা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও চুক্তির পর কিছু উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ অপরিহার্য।

চুক্তির একটি বড় ইতিবাচক দিক হলো এর ফলে দীর্ঘদিনের জাতিগত সশস্ত্র সংঘাত অনেকাংশে কমেছে। এর ফলে এলাকায় তুলনামূলক স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছেÑ নতুন স্কুল, কলেজ এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আদিবাসী শিশুদের শিক্ষায় প্রবেশাধিকারে উন্নতি ঘটেছে। এটি শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষার প্রসার আদিবাসী সমাজে সচেতনতা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং যুবসমাজের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। স্বাস্থ্যসেবায়ও কিছু উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধি, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সেবার সম্প্রসারণ এবং প্রতিষেধক কর্মসূচি কার্যকর হওয়ায় জনগণের স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সেবাগ্রহণের মাত্রা বেড়েছে। এই ধরনের পদক্ষেপ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নতুন সড়ক, ব্রিজ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতিশীলতা এসেছে। পর্যটন খাতের প্রসারও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে; পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকদের আগমন বাড়ায় স্থানীয়দের আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ছোট ছোট হ্যান্ডিক্রাফট শিল্প এবং স্থানীয় উৎপাদিত পণ্য বিক্রির মাধ্যমে অনেক পরিবার এখন স্থায়ী আয়ের সুযোগ পাচ্ছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো চুক্তির মূল লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হলেও, ভূমি সম্পর্কিত সমস্যাসহ আরও অনেক কাজ এখনও বাকি।

চুক্তির ধারা বাস্তবায়নের ধীরগতি, আস্থার সংকট এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা। ভূমি কমিশনের কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আদিবাসীদের ভূমি অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি। চুক্তি অনুযায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াও সম্পূর্ণ হয়নি, যা আদিবাসীদের মধ্যে আস্থার সংকট সৃষ্টি করেছে। সংলাপের অভাব এবং প্রশাসনিক জটিলতা চুক্তির বাস্তবায়নকে সীমিত করেছে। এ ছাড়া, পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ কম থাকায় তাদের স্বার্থের যথাযথ সুরক্ষা হয়নি।

যদিও পার্বত্য অঞ্চলে জাতিগত আদিবাসী-বাঙালি আনুষ্ঠানিক সংঘাত কিছুটা কমেছে, চুক্তির দুর্বলতা এবং অনীহার কারণে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাতের জন্ম নিয়েছে। চুক্তির পরপরই ১৯৯৮ সালে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) গঠন এবং জনসংহতি সমিতির অভ্যন্তরীণ বিভাজন নতুন সংঘাতের সূত্রপাত করে। ইউপিডিএফ চুক্তিকে পাহাড়ি জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করে এবং নতুন রাজনৈতিক মঞ্চে প্রবেশ করে। এ পরিস্থিতিতে জেএসএস এবং ইউপিডিএফের মধ্যে সংঘর্ষ ও সহিংসতা সাধারণ মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা এবং আতঙ্ক তৈরি করেছে। এটি শুধু দুই প্রধান গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অন্যান্য ছোট গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ও এ দ্বন্দ্বের শিকার হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক জীবন এবং সামাজিক ক্রিয়াকলাপের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

চুক্তি পূর্ববর্তী সময়ের মতো আদিবাসী-বাঙালির মধ্যকার আনুষ্ঠানিক বা সংঘটিত সংঘাত হ্রাস পেলেও সাম্প্রতিক সময়ে আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব দিন দিন বাড়ছে। আস্থা, বিশ্বাসের বদলে অবিশ্বাস ও বিদ্বেষ বৃদ্ধি পেয়েছে। যেকোনো তুচ্ছ ঘটনা সংঘাতে পরিণত হতে পারে। কিছু দিনের বিরতিতে ছোট ঘটনাগুলোও দ্রুত বড় উত্তেজনা ও সংঘাতে রূপ নেয়, আর অগ্নিসংযোগ বা হত্যার মতো ঘটনা যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, বিশেষ করে নারীদের সুরক্ষা, অতি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিগত সম্প্রীতি বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জও শান্তি প্রক্রিয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ভাষা এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যথাযথ স্বীকৃতি ও সমর্থনের অভাব দেখা যায়। তাদের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি প্রায়শই উপেক্ষিত হওয়ায় হতাশা এবং ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে আদিবাসী সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি রক্ষা করা জরুরি, অন্যদিকে বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে আধিপত্যবাদী মনোভাব দূর করা প্রয়োজন। পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ব্যতীত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। অশান্ত পরিস্থিতি কোনো জাতির জন্যই মঙ্গলজনক নয়। 

শান্তি প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব, যখন জাতিগত সংঘাতের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধান বাস্তবায়িত হবে সবার অংশগ্রহণের ভিত্তিতে। আদিবাসীদের পরিচিতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে চলমান বিদ্বেষ দূর করা অপরিহার্য। পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী মানুষ ও তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বাংলাদেশের বহুমাত্রিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাচ-গান বা ক্রীড়ার মাধ্যমে ভালোবাসা দেখানো যথেষ্ট নয়। তাদের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা এবং সমনাগরিক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়ন করতে হবে।

উন্নয়ন প্রকল্প, ভূমি দখল এবং অভ্যন্তরীণ স্থানচ্যুতির ফলে আদিবাসী জনগণের জীবনধারা ও প্রথাগত জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রাকৃতিক বনভূমি ধ্বংস, জুম চাষের হ্রাস এবং পর্যটন প্রসার তাদের জীবনযাত্রা ও আয়ের উৎসকে হুমকির মুখে ফেলেছে। পর্যটন প্রকল্প প্রায়শই স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়াই বাস্তবায়িত হওয়ায় তাদের আর্থিক লাভ সীমিত হয়েছে। তামাক ও রবার চাষের বিস্তার পরিবেশের ক্ষতি ঘটিয়েছে এবং স্থানীয় কৃষিপদ্ধতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এ ধরনের সমস্যা দূর করার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি, স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ এবং জীবিকা ও পরিবেশ সুরক্ষার ব্যবস্থা অপরিহার্য।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য তিনটি প্রধান উদ্যোগ অপরিহার্যÑ চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, আস্থা পুনঃস্থাপন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। ভূমি বিরোধ সমাধান, ভূমি কমিশনের কার্যক্রম শক্তিশালী করা, স্থানচ্যুত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন এবং আঞ্চলিক প্রশাসনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা মূল চাবিকাঠি। আদিবাসী ও বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে আন্তঃসম্প্রদায় সংলাপ, শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কার্যক্রম এবং ভুল ধারণা দূর করা শান্তিপ্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, তাদের ঐতিহ্য ও পরিবেশ রক্ষা করা অপরিহার্য। শান্তি ও সমন্বিত সহাবস্থানের জন্য আদিবাসী-বাঙালি উভয়ের মধ্যে সমান ভিত্তিতে শ্রদ্ধা ও আস্থা প্রতিষ্ঠা জরুরি। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সঙ্গে ন্যায়বিচার, সুযোগের সমতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংযোগই স্থায়ী শান্তির মূল চাবিকাঠি। এ ক্ষেত্রে সংবিধানে আদিবাসীদের পরিচিতির যথোচিত স্বীকৃতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম, যা আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমনে ভূমিকা রাখবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটিয়েছে এবং শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা উন্মুক্ত করেছে। তবে বাস্তবায়নের ধীরগতি, আস্থার সংকট এবং অসম্পূর্ণ উদ্যোগের কারণে প্রকৃত শান্তি এখনও অধরা। শান্তি প্রতিষ্ঠা শুধু সহিংসতার অনুপস্থিতি নয়; এটি একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ এবং ন্যায়সংগত সমাজ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদিবাসী-বাঙালির মধ্যে সমঝোতা, সহযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব।


ড. আলা উদ্দিন

অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা