বেগম খালেদা জিয়া
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:৫৮ এএম
এ লেখাটি যাকে নিয়ে লিখছি, তিনি এখন অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা বলেছেন, তার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। চিকিৎসকদের এই মন্তব্য গোটা দেশে তার ভক্ত-অনুরাগী-অনুসারীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে চরম উৎকণ্ঠা। সবাই হাত তুলেছেন আকাশের দিকে। পানাহ চাইছেন মহান রাব্বুল আল-আমীনের দরবারে। হ্যাঁ, আমি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা বেগম খালেদা জিয়ার কথাই বলছি। একদা কর্মব্যস্ত তিনি আজ হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন নীরব হয়ে। একসময় যার দিনের শুরু হতো পত্রিকার পাতায় দেশের খবর পড়ে, তারপর সারা দিনমান কেটে যেত দেশ ও জনগণের মঙ্গল সাধনের উপায় উদ্ভাবনে, আজ তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহর অপার করুণাই তাকে আবার এই দেশ, এই দেশের মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারে। গত ২৮ নভেম্বর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন বললেন, ‘ম্যাডামের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন’, তখন উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে যায়। ওইদিন গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার মাশুরগাঁওয়ে। জুমার নামাজ শুরুর আগে ইমাম সাহেবকে বললাম, ‘হুজুর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। তার সুস্থতার জন্য আজ দোয়া করবেন’। নামাজ শেষে ইমাম সাহেব আবেগাপ্লুত কণ্ঠে খালেদা জিয়ার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন। উপস্থিত সবাই বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে আমিন, আমিন বলে সে ফরিয়াদে শরিক হলো। ওইদিন সারা দেশেই বিএনপির আহ্বানে জুমার নামাজের পর বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য দোয়া করা হয়েছে। আমাদের মতো পাপীবান্দাদের সে দোয়া আল্লাহ কবুল করুন, সেটাই কামনা করি।
যে সময়ে খালেদা জিয়াকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সে সময়ে তার এ অসুস্থতা ও জীবন-সংকট জাতিকে সংগত কারণেই উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। একটি কথা তো নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হয়, এ মুহূর্তে আমাদের কোনো জাতীয় মুরুব্বি নেই। বিশেষত, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষা দেওয়া ও গণতন্ত্রের পথচলা নির্বিঘ্ন করতে যে ধীমান নেতৃত্বের প্রয়োজন, তাতে রয়েছে তীব্র সংকট। এ সংকটে খালেদা জিয়াই একমাত্র বাতিঘর। তিনিই পারেন, অন্ধকার রাতে গভীর সমুদ্রে চলমান গণতন্ত্রের নৌযানটিকে সঠিক গন্তব্যের দিকনির্দেশনা দিতে। কেননা, ৪২ বছরের রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় খালেদা জিয়া প্রমাণ করেছেন, তার কাছে দেশ ও গণতন্ত্র সবার আগে। স্বামী জিয়াউর রহমানের অমর বাণীÑ ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’ উক্তিই তার চলার পথের সবচেয়ে বড় পাথেয়।
এক কঠিন সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে পা রেখেছিলেন খালেদা জিয়া। সদ্য স্বামীহারা এ গৃহবধু শুধু তার দলের হালই ধরেননি, শক্তহাতে মুষ্টিবদ্ধ করেছিলেন গণতন্ত্রের হালও। দেশ তখন সামরিক স্বৈরাচার কবলিত। সেনাপতি জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রশক্তির উন্মত্ত দাপটে জনগণের অধিকারকে করে রেখেছেন বোতলবন্দি। ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন খালেদা জিয়া। এ শুধু স্বামী প্রতিষ্ঠিত দলের নেতৃত্ব গ্রহণের নিমিত্তে নয়। তিনি এলেন এদেশের গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা হয়ে, স্বৈরশাসকের কবল থেকে তাকে উদ্ধার করতে। শুরু হলো নিরন্তর সংগ্রাম। শত প্রলোভন, জুলুম-নির্যাতন তাকে বিচ্যুত করতে পারেনি লক্ষ্য থেকে। ষড়যন্ত্র আর ক্ষমতার হালুয়া-রুটির লোভে যখন সে আন্দোলনের সহযাত্রী অপর নেত্রী হাত মেলালেন স্বৈরশাসকের সঙ্গে, তখন খালেদা জিয়া তর্জনি উঁচিয়ে বললেন, ‘এই দুঃশাসনকে না হটিয়ে আমরা কেউ ঘরে ফিরে যাব না।’ (১১ নভেম্বর ১৯৮৭, হোটেল পূর্বাণী থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সমবেত সাংবাদকর্মীদের উদ্দেশে)। তারপর অনেক বাধাবিঘ্ন এসেছে। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। লক্ষ্যে অবিচল থেকে তিনি বাংলাদেশের গণমানুষের একান্তজনে পরিণত হলেন। তারা তাকে উপাধি দিল ‘দেশনেত্রী’। এ উপাধি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি বলে আমি মনে করি। নেতা-নেত্রী তো অনেকেই হয়, কিন্তু দেশনেত্রী হতে পারেন শুধু তিনিই, যিনি নিজের চিন্তা-চেতনায় দেশ ও জনগণকে প্রাধান্য দেন।
অনেক ভেবেছি, কেন আমরা জিয়াউর রহমান-খালেদা জিয়াকে এত ভালোবাসি? উত্তর পেয়েছি নবাব সিরাজ উদ-দৌলা সিনেমার গোলাম হোসেনের সংলাপে। পলাশীযুদ্ধে পরাজয়ের পর নবাব যখন বলছিলেন, ‘আমার সব পাত্র-মিত্র পারিষদ যখন আমাকে ছেড়ে চলে গেল, তখন তোমরা কেন আমার সঙ্গে রয়েছ? কেন তোমরা আমাকে এত ভালোবাসো?’ জবাবে গোলাম হোসেন বলেন, ‘বাংলাকে ভালোবাসতে গিয়েই আমরা বাংলার নবাবকে ভালোবেসে ফেলেছি, জাহাপনা’। আসলে বাংলাদেশকে ভালো বাসতে গিয়ে আমরা জিয়াউর রহমানের ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। কেননা, সেই কিশোর বয়সে তার তেজোদীপ্ত কণ্ঠে শুনেছিলাম দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা। তারপর ঘটনাক্রমে তিনি যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার পাদপ্রদীপের আলোয় এলেন, আবিষ্কার করলাম, ‘তাকেই তো খুঁজছি আমরা, তাকেই তো খুঁজছে বাংলাদেশ।’ কিন্তু ঘাতকের বুলেট যখন তাকে এ জাতির কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল, তখন গোটা জাতির ভবিষ্যৎ গভীর তমিস্রায় নিমজ্জিত হলো। সবারই দুশ্চিন্তা, এই হতভাগ্য দেশটাকে কে এগিয়ে নেবে? তখনই উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে আলো ছড়ালেন বেগম খালেদা জিয়া। হতাশাগ্রস্ত জাতি আবার পুনরুজ্জীবিত হলো। তার পেছনে কাতারবন্দি হলো দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ মানুষগুলো। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। আধিপত্যবাদী শক্তির ক্রীড়নকরা খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে উঠেপড়ে লাগে। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়। তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা চিহ্নিত গোষ্ঠী করছে এটা ঠিক। কিন্তু এদেশের গণমানুষের হৃদয় থেকে তাকে একচুলও সরাতে পারেনি ওরা।
একজন ক্ষুদ্র রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেই বিএনপিতে আমার পথচলা শুরু। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মশিয়ুর রহমান যাদু মিয়ার হাত ধরে আমরা শামিল হয়েছিলাম নতুন এক রাজনৈতিক কাফেলায়, যার নেতৃত্বে ছিলেন জিয়াউর রহমান। একসময় সে কাফেলার নেতৃত্বে সমাসীন হন খালেদা জিয়া। আমরা তার অনুগামী-অনুসারী হিসেবে পথ চলতে থাকি। সে এক কঠিন সময়। যে কথা ওপরে কিছুটা উল্লেখ করেছি। এরশাদীয় স্বৈরশাসনের সে দুঃসময়ে বেগম জিয়ার স্থির-প্রতিজ্ঞ মুখাবয়ব আমার মতো কোটি কোটি তরুণকে উদ্বুদ্ধ করেছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আত্মনিবেদিত হতে।
সেই কোটি কোটি তরুণের মধ্যে আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। দূর থেকে দেখে, কথা শুনে যে নেত্রীর প্রতি সব সময় শ্রদ্ধাবনত থেকেছি, তারই একজন ক্ষুদ্র কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার সুযোগও পেয়েছিলাম। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার সহকারী প্রেস সচিব হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাই। এ ছিল আমার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম পাওয়া। যে নেত্রীকে এতকাল দূর থেকে দেখেছি, কাছ থেকে তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার সে সুযোগ আমার জীবনকে মহিমান্বিত করেছে। পাঁচ বছর তার সঙ্গে কাজ করার সুবাদে অনেক ঘটনাই প্রত্যক্ষ করেছি। তা থেকে তিনটি ঘটনা এখানে পাঠকদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চাই।
একদিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেখা করতে এলেন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। কনফারেন্স হলে সবাই পরিচিত হচ্ছিলেন। প্রবীণ সাংবাদিক মাসির হোসেনও ছিলেন সে প্রতিনিধি দলে। তিনি তার পরিচয় দিতেই ম্যাডাম বললেন, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বোধহয় আপনার বাসায় আমরা একটি মিটিং করেছিলাম। কৃতজ্ঞাসূচক অভিব্যক্তি জানিয়ে মাসির সাহেব ‘জী ম্যাডাম’ বলার একটু পরেই ম্যাডাম বললেন, ‘তখন রমজান মাস ছিল। আমরা ইফতার করেছিলাম।’ পেছনের সারিতে বসে আমি তখন ভাবছিলাম, এজন্যই তিনি দেশনেত্রী। প্রায় বিশ বছর আগের একটি ঘটনার সামান্য একটি বিষয়ও তিনি মনে রেখেছেন। দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো, সড়ক পথে ম্যাডাম কিশোরগঞ্জ সফরে যাচ্ছিলেন। আমরা সফরসঙ্গী। যাত্রাবাড়ী থেকে চিটাগাং রোড ধরে গাড়ির বহর এগোতে থাকলে তার নজর কাড়ে একটি পেট্রোল পাম্প। নাম ‘মহানগর ফিলিং স্টেশন’। তার মনে পড়ে গেল ১৯৯৮ সালের সে দিনটির কথা। যেদিন পার্বত্য চুক্তির প্রতিবাদে তারই ডাকা লংমার্চের বহর আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা শিমরাইল মোড়ে আটকে দিলে তিনি সারা দিন ওই ফিলিং স্টেশনে বসেছিলেন। তারপর সন্ধ্যায় আমরা রওনা করেছিলাম খাগড়াছড়ির উদ্দেশে। স্মৃতিবিজড়িত সে ফিলিং স্টেশন দেখে কিশোরগঞ্জ পৌঁছে বললেন, ফেরার পথে তিনি সেখানে থামবেন। সন্ধ্যায় ঢাকা ফেরার পথে ম্যাডাম সেই ফিলিং স্টেশনে গিয়ে সেই কক্ষটিতে কিছুক্ষণ বসেছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে ঘটে যাওয়া এ ধরনে টুকিটাকি ঘটনা যিনি স্মরণে রাখতে পারেন, তিনিই তো অভিষিক্ত হন জাতীয় নেত্রীর অভিধায়।
তৃতীয় ঘটনাটি বেগম খালেদা জিয়ার উন্নয়ন-ভাবনার অন্যতম উদাহরণ। ২০০৫ সালে বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের সাংবাদিক এসেছিলেন ম্যাডামের সাক্ষাৎকার নিতে। আনুষ্ঠানিক সাক্ষৎকার শেষে চা পানের সময় সাংবাদিক ম্যাডামকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাংলাদেশের কোন দৃশ্যটি আপনার সবচেয়ে প্রিয়?’ উপস্থিত সবাই ভেবেছিলেন, ম্যাডাম হয়তো প্রাকৃতিক কোনো দৃশের কথা বলবেন। কিন্তু তিনি বললেন, ‘গ্রামের মোঠোপথ ধরে মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, এটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য।’ এই একটি উত্তর থেকেই বেগম খালেদা জিয়ার উন্নয়ন-ভাবনার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। গ্রামের মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার দৃশ্য যে একজন সরকারপ্রধানের সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য হতে পারে, অনেকের তা কল্পনায়ও ছিল না।
যার চিন্তাচেতনাজুড়ে ছিল শুধু দেশ ও জাতি, আজ তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। একমাত্র আল্লাহ পাকের অপার রহমতই পারে তাকে তার প্রিয় জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে। আমরা এই মহীয়সী নেত্রীর জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার করুণা প্রার্থনা করছি।
মহিউদ্দিন খান মোহন
সাংবাদিক ও কলাম লেখক