চীনের বিনিয়োগ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২০ এএম
বাংলাদেশের পাট, বস্ত্র ও ওষুধ শিল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছেন চীনা বিনিয়োগকারীরা। ২৭ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠককালে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়নার (এক্সিম ব্যাংক) ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়াং দোংনিং এ আগ্রহের কথা জানান। উল্লেখ্য, প্রধান উপদেষ্টা ঘোষিত উৎপাদন খাতের রূপান্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এ আগ্রহের বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে। এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা আজ বহুমাত্রিক বাস্তবতায় বিস্তৃত। সেই বাস্তবতায় পাট, বস্ত্র ও ওষুধ শিল্পে চীনা বিনিয়োগের আগ্রহের সংবাদটি নতুন দুয়ার খুলে দিলÑ তাতে সন্দেহ নেই।
বাংলাদেশ বিনিয়োগবান্ধব নীতিতে বিশ্বাসী। সেই লক্ষ্যে সরকার দেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর-সুবিধা ও অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করছে। চীনের এই বিনিয়োগ দেশের শ্রমবাজারের সম্মিলন একটি উইন উইন পার্টনারশিপ তৈরি করতে পারে। তবে এর সঙ্গে মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় শিল্পপণ্য রক্ষা ও পরিবেশ সুরক্ষা নীতির বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি।
বলা বাহুল্য, চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারী দেশ। সরকারি এবং ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে দেশটি বিনিয়োগ করে আসছে। বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্চে, বাংলাদেশ ২.১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। জানা গেছে, ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সম্প্রতি শিল্প-অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। ইতোমধ্যে চীন বাংলাদেশের অনেক মেগা প্রকল্প যেমনÑ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ এবং শিল্পকারখানা স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে, যা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। চীন আমাদের পণ্যের রপ্তানি বাজার হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
সরাসরি আর্থিক খাতে চীন বাংলাদেশকে বড় আকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ঋণ ও অনুদান দিয়ে থাকে। এ ছাড়াও সামরিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং বিনিয়োগের মাধ্যমেও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
বলতে দ্বিধা নেই, পাটকে ‘সোনালি আঁশ’ বলা হলেও আধুনিক বাজারব্যবস্থায় এর পুনরুজ্জীবন নিয়ে ছিল অনেক প্রশ্ন। কিন্তু এই খাতে চীনের বিনিয়োগ আধুনিক প্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এতে দেশীয় পাট শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে, যা বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পণ্যের চাহিদা পূরণে সক্ষম। ইদানীং পাট থেকে বস্ত্র, ব্যাগ, কম্পোজিট, জিওটেক্সটাইল, এমনকি খাদ্যপণ্য মোড়ানোর উপাদান তৈরি হচ্ছে। চীনের বিনিয়োগ এই ক্ষেত্রকে আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজাইন ইনোভেশন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশদ্বার খুলে দিতে পারে। বাংলাদেশের শ্রমবহুল জুট সেক্টরের সঙ্গে চীনের উন্নত যন্ত্রপাতি-নির্ভর অপারেশন যুক্ত হলে উৎপাদনশীলতা কয়েকগুণ বাড়তে পারে। তা ছাড়া, ‘গ্রিন প্রোডাক্ট’ হিসেবে পাটজাতপণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট রপ্তানি-সুযোগ। পাটপণ্য ক্রমশ প্লাস্টিকের জায়গা দখল করছে; তাই চীনের বিনিয়োগ ইঙ্গিত দিচ্ছে বাংলাদেশকে পাটভিত্তিক উৎপাদনে বৈশ্বিক নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে নেওয়ার।
বস্ত্র খাতে চীনের আগ্রহ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখবে। এতে শ্রমনির্ভর বস্ত্রশিল্পে প্রযুক্তি-নির্ভর উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমবে এবং পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। চীনা অংশীদারত্বের ফলে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে নতুন বাজার সৃষ্টির সুযোগও বাড়বে। বিশেষ করে চীনের নিজস্ব ক্রেতা ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপনে।
দেশের ওষুধ শিল্প ইতোমধ্যে দেশের ৯৭% ওষুধের চাহিদা নিজস্ব উৎপাদনে পূরণ করছে। ১৫০টিরও বেশি দেশে জেনেরিক ওষুধ রপ্তানি করছে। বিশেষ করে প্রাণরসায়ন, বায়োটেক ও ভ্যাকসিন গবেষণায় চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পকে আরও শক্তিশালী করবে। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে এবং কাঁচামাল উৎপাদন, জেনেরিক ও উচ্চমূল্যের ওষুধ তৈরিতে সুবিধা মিলবে। বর্তমানে যেসব কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, তা দেশে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হলে ব্যয় অনেক কমে আসবে এবং দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
আমরা বিশ্বাস করি, পাট, বস্ত্র ও ওষুধ খাত দেশকে একটি শক্তিশালী রপ্তানিমুখী অর্থনীতি গঠনে সহায়ক হবে। এসব খাতে চীনের আগ্রহ যদি বাস্তবে রূপ পায়, বাংলাদেশ শুধু অর্থনৈতিক সুবিধাই পাবে নাÑ নতুন একটি শিল্প-বিপ্লবের সূচনাও হতে পারে। সব মিলিয়ে দেশের উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প বিকাশের পথে আশার আলো জ্বালাচ্ছে। এখন প্রয়োজন সুশাসন, স্বচ্ছতা ও যথাযথ নীতি সহযোগিতার বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ও শিল্পভিত্তিক প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাক। দেশে টেকসই রপ্তানিমুখী শিল্প খাত গড়ে উঠুকÑ এটাই প্রত্যাশা।