× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জাল টাকা

দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের অশনিসংকেত

ড. মিহির কুমার রায়

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫ ১১:১৭ এএম

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২০ এএম

দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের অশনিসংকেত

জাল টাকার প্রভাব শুধু অর্থনীতির ক্ষতি করে না, এটি একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও জনবিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক গুরুতর আঘাত। বাজারে ভুয়া নোটের প্রচলন মূল্যস্ফীতি বাড়ায়, বৈধ লেনদেনে বিঘ্ন সৃষ্টি করে এবং ব্যবসায়িক পরিবেশকে অবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দেয়। অপরাধচক্র প্রযুক্তি ব্যবহার করে অত্যন্ত নিখুঁত জাল নোট তৈরি করছে, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি হয়ে পড়েছে। জাল টাকা প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও সমন্বিত উদ্যোগই পারে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জাল টাকার প্রভাব অতীতেও ছিল। তবে এখন ভয়াবহ। বাজারে নকল টাকা প্রবেশ করলে মুদ্রার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। ফলে প্রকৃত মুদ্রাব্যবস্থায় ভারসাম্য নষ্ট হয়, দ্রব্যমূল্য অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ ক্রেতা সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে অবিশ্বাস ও আতঙ্ক। এর ফলে বাজারে বৈধ লেনদেন বাধাগ্রস্ত হয়, ব্যাংকিং খাতে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। অর্থনীতির এই অস্থিরতা আসলে দেশের উন্নয়নকে শ্লথ করে দেয়। 

প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও দেশে জাল নোটের আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১৯৭৩ সালের ১ মে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নোট বাতিল করা হয়। ১৯৭৪ সালের ৩০ মার্চ প্রতিবেশী একটি দেশ থেকে মুদ্রিত ১ টাকার মানচিত্র সিরিজের নোটটিও অচল ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া ১৯৭৪ সালে জাতীয় সংসদে জাল মুদ্রা প্রতিরোধে বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ পাস করা হয়। ২০২০ সালে ‘জাল মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ আইন’ নামে একটি আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। এই খসড়া অনুযায়ী জাল মুদ্রা তৈরি, সরবরাহ বা লেনদেনের সঙ্গে জড়িতদের জন্য সর্বনিম্ন ২ বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক লাখ থেকে এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছিল। বর্তমানে জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত অপরাধের বিচার দণ্ডবিধি ১৮৬০ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর অধীনে করা হয়। জাল টাকা তৈরি ও বিপণন ফৌজদারি অপরাধ। এতে জড়িতদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনের ফাঁক গলে অপরাধী চক্র ঠিকই অপরাধ করে যাচ্ছে। এসব অপরাধীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক চক্রের যোগাযোগ থাকার তথ্যও রয়েছে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে এসেছে দেশে জাল টাকা তৈরির নেটওয়ার্ক ভয়াবহ মাত্রায় বিস্তার লাভ করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মিলছে উন্নত প্রযুক্তিতে তৈরি নকল মুদ্রা, যা সহজে চেনা যাচ্ছে না সাধারণ মানুষের পক্ষে। এই জাল টাকার পেছনে কেবল অসাধু ব্যক্তি নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক চক্রান্ত কাজ করছে, যার লক্ষ্য দেশের অর্থনীতি বিনাশ করা, বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করা এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতার ওপর আঘাত হানা। সম্প্রতি গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের নীলনকশা নিয়ে নানা তথ্য। সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলার মাঠ পর্যায়ে জাল টাকার অনুসন্ধানে পার্শ্ববর্তী একটি দেশের উৎস খুঁজে পেয়েছে। সেখানে ছাপানো জাল টাকা বাংলাদেশের বাজারে সুপরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেখতে হুবহু আসল নোটের আকৃতির এই জাল টাকা ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে।

জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে অন্তত কয়েকশ হাজার কোটি জাল নোট দিয়ে বাজার ছেয়ে ফেলার চক্রান্ত এঁটেছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে এরই মধ্যে সীমান্তসহ সবখানে কঠোর নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবিসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র‌্যাবের দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ২০টি অভিযান পরিচালনা করে ১৭ কোটি ৪৭ লাখ ৭৩ হাজার ৬৩৫ টাকা, ১৭ হাজার ৪০০ ডলার, ২০ হাজার ইউরো, ১৯ হাজার ৯০০ দিরহাম ও ২৯ হাজার ৬০০ সৌদি রিয়ালের জাল নোট উদ্ধার করা হয়। 

দেশে জাল নোটের এমন বিস্তারে সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গণমাধ্যমে এক সারকুলারে কেন্দ্রীয় এই ব্যাংকটি জাল টাকা তৈরি, বহন ও লেনদেন দেশের প্রচলিত আইনে গুরুতর অপরাধ বলে জানায়। জানা গেছে, জাল নোটের প্রচলন রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং জাল নোটের উৎস, প্রবাহ ও ব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে। জাল টাকার ঝুঁকি এড়াতে জনগণকে সতর্ক থাকতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেও এ ধরনের জাল টাকা পাচারের প্রমাণ মিলেছে বহুবার। লক্ষ্য একটাইÑ আর্থিক স্থিতিশীলতা ভেঙে দেওয়া। তাদের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অসাধু চক্রের যোগসাজশে অর্থনীতি যেন এক গভীর ফাঁদে পড়ছে। এদিকে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে জালিয়াতরাও আধুনিক হচ্ছে। উন্নত প্রিন্টার, সফটওয়্যার এবং নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য নকল করার কৌশলে তারা দক্ষ হয়ে উঠছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই আইন প্রয়োগে দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং জনসচেতনতার ঘাটতি এই অপরাধকে বাড়তে দিচ্ছে।

আমরা মনে করি, সরকারকে এখনই কঠোর অবস্থান নিতে হবে। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো, উন্নতমানের কারেন্সি নোট চালু করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরাপত্তা প্রযুক্তি আরও জোরদার করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে জনগণকে সচেতন করতে হবেÑ কীভাবে জাল টাকা চেনা যায়, কোথায় অভিযোগ করতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যাঙ্কিংয়ের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ডিজিটালাইজড করা প্রয়োজন। ব্যাংক ব্যবস্থায় জাল নোট শনাক্তকারী মেশিনের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। সাধারণ মানুষের পক্ষে মেশিনে আসল-নকল বোঝার সুযোগ নেই। এই মেশিন ছাড়াও কী দেখে নকল টাকা চেনা যাবে সে বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। নকল টাকা তৈরি ও বিপণন ফৌজদারি অপরাধ। এজন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন সাজার বিধানও রয়েছে। যারা ধরা পড়েছে তাদের অপরাধ অনুযারী শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলে জাল টাকার বিস্তার রোধ করা সম্ভব। এই সমস্যার সমাধান কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একার পক্ষে সম্ভব নয়। এটি একটি সম্মিলিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চ্যালেঞ্জ। টাকা শুধু বিনিময়ের একটি মাধ্যম নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতির ভিত্তিমূল। কিন্তু যখন এই ভিত্তিমূলে আঘাত হানে ‘জাল টাকা’ নামক বিষফোড়া, তখন পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোতেই অস্থিরতা তৈরি হয়। 

জাল টাকা হলো প্রতারণার এক ভয়াল রূপ, যা সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। জাল টাকা প্রতিরোধে সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি জনসচেতনতা এবং সতর্কতা অপরিহার্য। সবাই মিলে সতর্ক থাকলে এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব, তাতে দেশের অর্থনীতি কিছুটা হলেও নিরাপদ হয়। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ একটি রূপান্তরের পর্যায়ে রয়েছে। এই সময় জাল টাকার মতো ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড দেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দিতে পারে। তাই রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়িত্বশীল সংস্থাকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই চক্রান্ত মোকাবিলা করতে হবে। আমরা মনে করি, জাল টাকা শুধু অর্থনৈতিক ষড়যন্ত্রই নয়, এটি জাতির নিরাপত্তার প্রশ্নও বটে। অতএব এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই জাল টাকার নীলনকশা আমাদের পরিশ্রমে গড়া অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।

 

ড. মিহির কুমার রায়

অর্থনীতিবিদ ও সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা