প্রবীণ
মতি লাল দেব রায়
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫ ১১:১২ এএম
৬০ বছরের বেশি বয়সের ব্যক্তিদের সিনিয়র সিটিজেন বা প্রবীণ ব্যক্তি বলা হয়। একজন প্রবীণ একটি পরিবারের কাছে ছাতার মতো। তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান পরিবারকে অনেক সাহায্য করে। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমান বিশ্বে ৬৫ বছরের ওপরের ব্যক্তিদের সংখ্যা বাড়ছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ১৪ শতাংশ এবং মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ৪ শতাংশ মানুষ এই জনগোষ্ঠির অন্তর্ভুক্ত। আমাদের দেশে এখন প্রবীণদের জনসংখ্যা প্রায় দেড় কোটি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮%।
বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। এতে ঝুঁকির মুখে পড়ছে বয়স্ক নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা। দেশে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষের বয়স এখন ৬০-এর বেশি। ২০৫০ সালে এই হার ২০ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। কিন্তু তখন প্রবীণদের জীবনযাত্রার চাপ অর্থনীতি টানতে পারবে না। সেবা খাতগুলোও এ মুহূর্তে এই চাপ টানতে সেভাবে প্রস্তুত নয়। ফলে বয়স্কদের বোঝা মনে হতে পারে। সরকার অবশ্য ইতিমধ্যেই বয়স্ক নাগরিকদের জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ দিতে সন্তানদের বাধ্য করা হচ্ছে। এর জন্য সরকারি বেতন স্কেলে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের খবর দিচ্ছে সরকার। কেউ এই দায়িত্ব পালন না করলে, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে বয়স্ক ভাতাসহ সরকারের নানা প্রকল্পও। এই উদ্যোগগুলো প্রবীণদের জন্য আশাপ্রদ।
সাধারণত আমাদের দেশে ৫৫-৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কে বয়স্ককাল বা বৃদ্ধ বয়স ধরা হয়। বয়স্কদের কষ্টের খবর অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক সংকীর্ণতার কারণে অপ্রকাশিত থেকে যায়। বয়স যখন ৬০-৬৫ বছর হয়, তখন কাজ করার কর্মক্ষমতা অনেকের দুর্বল হয়ে যায়। অনেকের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমার ফলে নানা রকম রোগে আক্রান্ত হন। বাস্তবতা হচ্ছে, প্রবীণদের শতকরা ৮০ জন রোগী যে ওষুধ সেবন করেন সে ওষুধের নাম বলতে পারেন না। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীকে একেক রোগের জন্য একেক ওষুধ দেওয়া হয়, যার নাম পরবর্তী ডাক্তারের কাছে গেলে বলতে পারেন না। তখন ওই ডাক্তার অন্যান্য ডাক্তারের দেওয়া ওষুধের ক্রিয়া এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তা বিবেচনায় আনতে পারেন না। তাই প্রেসক্রিপশনে রোগী কোনো ওষুধ কখন খাবেন, দিনে কতবার এবং রাতে কতবার খাবেন, খালি পেটে না ভরা পেটে খাবেন এবং পরবর্তী ডাক্তারের কাছে আসার তারিখ এবং সময় উল্লেখ করার সহজ ব্যবস্থা থাকতে হবে। কারণ বিস্তারিত তথ্য না লিখে রাখলে পরবর্তীতে রোগের অবস্থা বুঝবেন কী করে।
বয়স্করা উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিকস রোগে বেশি ভোগেন। তাদের কেউ কেউ উচ্চ রক্তচাপ মাপার জন্য পার্শ্ববর্তী কোনো ফার্মেসিতে যান। প্রতিবার ব্লাডপ্রেসার মাপার জন্য টাকা দিতে হয় এবং ডায়াবেটিকসের অবস্থা জানার জন্য আশপাশে কোনো ক্লিনিক বা কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হয়, যা সকল বয়স্করোগীর পক্ষে সম্ভব হয় না। ইচ্ছা করলে সরকার কর্তৃক প্রত্যেক বয়স্ক মানুষকে যাদের কোনো আয় নেই, তাদেরকে একটি ইলেক্ট্রনিক বিপি মেশিন এবং ডায়াবেটিকস মাপার জন্য কিট বক্স এবং ওজন মাপার জন্য একটি স্কেল এবং তাপমাত্রা মাপার জন্য একটি ক্লিনিকেল থার্মোমিটার বিনামূল্যে সরবরাহ করতে পারেন।
আমরা মনে করি, বয়স্করা পরিবারের অবিচ্ছেদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে পরিবার ও সমাজের অনেক কিছুতেই অবদান রাখতে পারেন। তাই প্রবীণ সদস্যকে বোঝা না ভেবে তাদের আদর যত্ন করতে হবে, যাতে তারা সুস্থ, সুখী এবং নিরাপদ জীবন যাপন করতে পারেন। এই ব্যাপারে আমার কিছু পরামর্শ।
পরিবারের বয়স্ক সদস্যের নিয়মিতভাবে শারীরিক পরীক্ষা করানো উচিত। প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবেন। রক্তচাপ, রক্তে শর্করার পরিমাণ, ট্রাইগ্লিসারাইড প্রভৃতি যেন সঠিক মাত্রায় থাকে, সেদিকে নজর দিন। এ ছাড়া তাদের প্রতিদিন একাধিক ওষুধ খেতে হয়। এ বয়সে তাদের ওষুধ খাওয়ার কথা মনে থাকে না। তাই তাদের ওষুধ খাওয়ার সময় মনে করে দেবেন বা নিজে খাইয়ে দেবেন। নিয়মিত ব্যায়াম বয়স্ক মানুষদের শক্তিশালী ও স্থিতিশীল থাকতে সাহায্য করে। কার জন্য কোন ব্যায়াম উপযুক্ত আগেই জেনে নেবেন। বয়স্কদের সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। তা নাহলে তারা একাকিত্ব বোধ করবেন।
তাদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করতে হবে, যাতে তারা মানসিকভাবে একাকী না বোধ করেন। বয়স্ক ব্যক্তির যদি বিষণ্নতা বা উদ্বেগের মতো মানসিক সমস্যা থাকে, তবে চিকিৎসা করানো প্রয়োজন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। বয়স্ক মানুষদের তাদের মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখার জন্য কোনো প্রিয়, ভালো লাগার কাজে জড়িয়ে থাকা উচিত। যেমন বই পড়া, ধাঁধা সমাধান করা বা নতুন কিছু শেখা। বয়স্কদের মানসিক চাপ মোকাবেলা করার জন্য স্বাস্থ্যকর উপায় খুঁজে বের করা উচিত। যেমন- যোগব্যায়াম বা ধ্যান।
বয়স্কদের আর্থিক অবস্থার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া বয়স্কদের জন্য অনেক সহায়ক ব্যবস্থার আজকাল চলন রয়েছে। যেমন-হোম হেলথ কেয়ার ও অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার। দরকারে এগুলোর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। বয়স্কদের দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়ক প্রযুক্তি রয়েছে। যেমন- হুইলচেয়ার, ওয়াকার। এগুলো তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। অসাবধানে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে তাদের বাড়িতে কিছু পরিবর্তন করা যেতে পারে। যেমন- মেঝেতে নন-স্লিপ ম্যাট রাখা বা সিঁড়িতে হাত রেল লাগানো। এসব বিষয়ে একটু নজর রাখাও প্রয়োজন।
আসলে বয়স্ক লোকদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন কাটে যখন তারা বিছানায় পড়ে থাকেন। তাদেরকে বিছানায় বসানো এবং নামানো এক কঠিন কাজ। হাসপাতাল বেড আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেকেই কিনতে পারে না। আমার পরামর্শ এই মুহূর্তে বয়স্ক মানুষ, যাদের বয়স ষাটোর্ধ্ব তাদেরকে সেবা দেওয়ার জন্য সামাজিক স্বাস্থ্যকর্মী রোগীর পরিবারের কোনো মেয়ে অথবা তাদের পরিবারের কাছের আত্মীয়, যারা রোগীর পরিবারের পাশাপাশি থাকেন সেই পরিবার থেকে একজন এই রোগীকে সেবা দেওয়ার জন্য নিয়োগ দিতে পারেন। ওই সেবা দানকারীকে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকে বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ২০০ কোটি হয়ে যাবে। তাই বয়স্ক লোকদেরকে দেশের সম্পদ ভাবা উচিত। তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে অর্জিত দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নে বয়স্কদের কাজে সম্পৃক্ত করা যায় তা ভেবে দেখতে হবে। এতে তাদের দৈহিক স্বাস্থ্য ও মানসিক মনোবল দুদিকই রক্ষা পাবে। বয়স্কদের পাশে থাকুক, তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগান।
মতি লাল দেব রায়
কলাম লেখক