× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বঙ্গবন্ধু আমাদের সামনে অমরত্বের সাধনা

সেলিনা হোসেন

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২২ ০০:২৩ এএম

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২২ ১৯:১১ পিএম

বঙ্গবন্ধু আমাদের সামনে অমরত্বের সাধনা

শোকের মাস যেন একটি কালো গোলাপ। এই মাসকে নিয়েই সৌরভ এবং রঙের সঙ্গে এক হয় গৌরব ও বেদনার ধারণা। গৌরব স্বাধীনতার মতো বড় অর্জন। আর শোক স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো মানুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়া। জীবন-মৃত্যুর দুই গভীর জায়গায় তিনি আমাদের সামনে দাঁড়ানো অবিনাশী মানুষ। মৃত্যুর অবধারিত সত্য মেনে নিয়ে তিনি আমাদের সামনে অমরত্বের সাধনা। এ দুটো সত্যকে এক করে আগস্ট মাস প্রবলভাবে অর্থবহ। তিনি ছিলেন বলে আমরা স্বাধীনতার মতো বড় অর্জন পেয়েছি। স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে নিজ অবস্থান তৈরি করেছে। তাঁকে সামনে রেখে চলছে পথচলা। খুঁজে নেওয়া হচ্ছে দিক-নির্দেশনা। তিনি আছেন সহায়ক শক্তি হিসেবে গণমানুষের চেতনায় প্রদীপ্ত আলো হয়ে। গণমানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় জাগরণের গান। ছড়িয়ে আছে তাঁর আদর্শ ও স্বপ্ন। দুঃখী মানুষের জীবন বদলানোর জন্য তাঁর অন্তহীন প্রেরণা আজকের বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জাতির জন্য শোক কোনো শেষ কথা নয়। শোক যে শক্তির উৎস হয়, বাংলাদেশ তার প্রমাণ। এ দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। ইতিমধ্যে দণ্ডিত অনেকের দণ্ড কার্যকরও হয়েছে। প্রত্যাশা করা যায় নিকট ভবিষ্যতে বাকি রায়ও কার্যকর হবে। তাঁর মৃত্যুর পর এ দেশে মৌলবাদীদের উত্থান ঘটে। তারা চেয়েছিল দেশটিকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ঠেলে দিতে।

কিন্তু সেটা হয়নি। শোককে শক্তিতে পরিণত করেছে দেশের মানুষ। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ মানুষের প্রকৃত আবাসস্থল হোক এটাই সবার প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশার জয়গানে মুখরিত আজ শোকের মাস। তাঁর বক্তৃতার বাণী নিজেদের কণ্ঠে তুলে বলতে হবে, বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান বাংলাদেশে যারা বসবাস করেন, তাঁরা সবাই এ দেশের নাগরিক। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁরা সমঅধিকার ভোগ করবেন। বঙ্গবন্ধুর এই বাণী পৌঁছে যাক প্রত্যেকের চেতনায়। যেন কোনো ভুল আচরণ মানুষ এবং শক্তির বাংলাদেশকে কলঙ্কিত না করে। মানুষের মর্যাদায় প্রদীপ্ত থাকুক তাঁর অবিনশ্বর চেতনা।

বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিত্ব অন্নদাশঙ্কর রায় ১৯৯৬ সালের বিজয় দিবস উপলক্ষে সরকারের আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। হোটেল শেরাটনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সেখানে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে শাহরিয়ার ইকবাল এবং আরও দুজন প্রযোজক উপস্থিত ছিলেন। শাহরিয়ার আমাকে আকস্মিকভাবে বললেন, যাঁকে সাক্ষাৎকারটি নিতে বলেছিলাম তিনি নিতে পারছেন না। আপনি সাক্ষাৎকারটি নিন। আমি হতবাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুশিও হলাম। যা হোক শেষ পর্যন্ত সাক্ষাৎকারটি আমার নিতে হলো। প্রসঙ্গ উঠল তাঁর বিখ্যাত এবং মুখে মুখে উচ্চারিত দুটি অমর পঙ্ক্তি নিয়ে : ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন পরিপ্রেক্ষিতে আপনি এ কবিতাটি লিখেছিলেন? তিনি বললেন, ‘কবিতাটি আমি একাত্তর সালে লিখি। সে সময়ে একবার গুজবের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল যে পাকিস্তানের কারাগারে মুজিবকে মেরে ফেলা হয়েছে। খবরটা শোনার পর সঙ্গে সঙ্গে আমার এই প্রতিক্রিয়াটি হয়। পরে তাঁর বেঁচে থাকার খবর পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি।’ তারপর প্রায় একশ বছর বয়সের কাছাকাছি সেই মানুষটি সরল অনাবিল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে বলেছিলেন, মুজিবের মৃত্যু কি সহজ কথা? অন্নদাশঙ্কর রায় গভীর প্রত্যয় নিয়ে গাঢ় স্বরে এমন একটি বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন। এত বছর পরও তাঁর কণ্ঠ আমার কানে বাজে। না, শুধু আগস্ট মাস এলেই নয়, তাঁর কণ্ঠ শুনতে পাই যখন-তখন। ভাবি, ঠিকই বলেছিলেন তিনি। মুজিবের মৃত্যু সহজ কথা নয়। পুরো কবিতাটি এমন : যতকাল রবে পদ্মা যমুনা/গৌরী মেঘনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার/শেখ মুজিবুর রহমান।/দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা/রক্তগঙ্গা বহমান/তবু নাই ভয় হবে হবে জয়/জয় মুজিবুর রহমান।

সৈয়দ নাজমুদ্দিন হাশেমের একটি প্রবন্ধের নাম ‘শেখের সমসাময়িক’। প্রবন্ধটি তাঁর অশ্লেষার রাক্ষসী বেলায় : স্মৃতিপটে শেখ মুজিব ও অন্যান্য গ্রন্থের শেষ প্রবন্ধ। এ প্রবন্ধের এক জায়গায় তিনি লিখেছেন : জীবদ্দশায় মুজিব বিশালদেহী কলোসাসের মতো আমাদের সংকীর্ণ পৃথিবীজুড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বাধীনতার অতন্ত্র প্রহরী হয়ে। অপমৃত্যুর পর তাঁর অশান্ত আত্মা আমাদের মন ও মানসকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, বিবেককে করছে বিচলিত। তাঁর পুণ্য রক্তের ঋণ, রক্ত দিয়েই শুধতে হবে, এর কোনো ব্যতিক্রম সম্ভব নয়। আত্মসম্মান-সম্পন্ন জাতির পক্ষে আর কোনো পথ খোলা নেই। কারণ, রফিক আজাদের ভাষায়, স্বদেশের মানচিত্রজুড়ে পড়ে আছে বিশাল শরীর। সৈয়দ নাজমুদ্দীন হাশেম এ প্রবন্ধটি শেষ করেছেন এমন একটি বাক্য দিয়ে : ‘সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, শেখ মুজিবের নামে ইতিহাসের দরজা খুলে যায়, সেই দরজা দিয়ে আমরা আমাদের নিয়তির সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছি’।

যে মানুষের নামে ইতিহাসের দরজা খুলে যায় সেই মৃত্যুহীন মানুষের সঙ্গেই তো আমরা ইতিহাসের দীর্ঘ সড়কে হেঁটে যাব। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। যার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নিকট অতীতে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার মধ্য দিয়ে আবার রচিত হয়েছে কলঙ্কজনক আরেকটি অধ্যায়। পনেরো আগস্টে যারা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছে, সেই দুর্বৃত্তদের প্রতিনিধিরা যেন এখনো দেশে মাথা উঁচিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙা এতটাই ধৃষ্টতা যে, স্বাধীনতার সম্মানকে অমর্যাদার দিকে ঠেলে দেয়। আমি মনে করি এসব কাজ যারা করেছিল তাদের উৎখাত করা প্রয়োজন। আমরা যেন ভুলে না যাই, কদাচারের যদি যথাযথ প্রতিকার না হয়, তাহলে এর ক্ষেত্রই বিস্তৃত হয়। এমনটি তো শুভবোধসম্পন্ন কারও কাম্য হতে পারে না। যার যার অবস্থান থেকে দায় ও দায়িত্ব পালন করতেই হবে।

একাত্তরের পর বাঙালির জীবনে বেদনাবিধুর ও বিভীষিকাময় মাস ১৯৭৫ সালের আগস্ট। নিদারুণ বাস্তবতায় মানবতা ডুকরে কেঁদেছিল সে সময়। বিশ্বাসঘাতকরা বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে হত্যা করে। পরবর্তী সময়ে জাতীয় চার নেতা হত্যার ঘটনায়ও লিপ্ত হয় হায়েনারা। এতে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়। ইতিহাস বলে এসব হত্যাকারী ও ষড়যন্ত্রকারী পরবর্তী সরকারের কাছ থেকে সুরক্ষা এবং আশীর্বাদ পেয়েছে। কালক্রমে ভয়ানক সশস্ত্র রাজনীতি প্রতিষ্ঠা হয়। যারা নৃশংসতা চালিয়েছে, তারাই আবার বীরদর্পে ক্ষমতায় ছিল। এনিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল সমাজে। এই ছায়া আমাদের উদ্বিগ্ন করেছিল। ১৯৭২ সালে যখন বিমানটি বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করেছিল তখন কোটি কোটি মানুষ অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন তার জন্য। মানুষ প্লাবিত করেছিল শহরের রাস্তা। জনসমুদ্রের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল গাড়িটি। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছাতে তার সময় লেগেছিল কয়েক ঘণ্টা। রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া ভাষণে তিনি আবার বলেছিলেন, ‘আজ সোনার বাংলার কোটি কোটি মানুষ গৃহহারা, আশ্রয়হারা। তারা নিঃসম্বল। আমি মানবতার খাতিরে বিশ্ববাসীর প্রতি আামার এই দুঃখী মানুষদের সাহায্য দানের জন্য এগিয়ে আসতে অনুরোধ করছি। নেতা হিসেবে নয়, ভাই হিসেবে আমি আমার দেশবাসীকে বলছি আমাদের সাধারণ মানুষ যদি আশ্রয় না পায়, খাবার না পায়, যুবকরা যদি চাকরি বা কাজ না পায়, তাহলে আমাদের এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে, পূর্ণ হবে না। আমাদের এখন তাই অনেক কাজ করতে হবে।’ এমন এক জননেতার হত্যাকে ভুলে যাওয়া সম্ভব? স্বদেশের মানচিত্রজুড়ে বিছিয়ে থাকা তাঁর বিশাল শরীর আমাদের জীবনে বটের ছায়া। শুধু আমরা চাই আমাদের পথের দুপাশে অবিস্মরণীয় আলো থাকুক, যে আলোয় ফুটে থাকবে পথ, পথের ধারের উজ্জ্বল বুনোফুল এবং আমাদের ইতিহাসের খুলে যাওয়া নতুন দিগন্তে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে নতুন আলো। আমরাও গগণবিদারী কণ্ঠে চিৎকার করে বলব, মুজিবের মৃত্যু সহজ কথা নয়।


লেখক : সভাপতি, বাংলা একাডেমি ও কথাসাহিত্যিক


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা