ইমেইল থেকে
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৫৮ এএম
আজকের ছাত্ররাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎÑ এই কথাটি শুধু প্রচলিত সত্য নয়, বাস্তবতার সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি। একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্ম কতটা দক্ষ, সৃজনশীল, স্বাধীন চিন্তাশীল এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী তার ওপর। কিন্তু প্রযুক্তির এই ঝলমলে যুগে আমরা ঠিক এখানেই হোঁচট খাচ্ছি। প্রযুক্তির নতুন ঢেউ যখনই এসেছে, তখনই মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এনেছে। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্ৰগতির এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) আবির্ভাব যে ধরনের পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে, তা কোনো সাধারণ রূপান্তর নয়Ñ আমাদের জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রবেশ করে ফেলেছে। এখন প্রশ্ন হলোÑ এই অবাধ প্রবেশ আমাদের জন্য আশীর্বাদ, নাকি নতুন এক দুশ্চিন্তা?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো এমন এক প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কম্পিউটার, রোবট বা যন্ত্র, যা মানুষের মতো চিন্তা করতে, শেখাতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ মানুষ যেমন অভিজ্ঞতা থেকে শিখে কাজ করে, এআইও তেমনভাবে ডেটা বিশ্লেষণ করে কাজ করে। কয়েক বছর আগেও যেসব কাজকে আমরা ভাবতাম একান্ত মানবিক, মানুষ ব্যতীত অন্য কেউ কাজগুলো করতে পারবে না সেসবের দখল আজ অনেকটাই এআইর হাতে। এআইর ছায়া এখন জীবনের প্রায় সব অংশে। সাংবাদিকতা থেকে ডিজাইন, লেখালেখি, প্রেজেন্টেশন, সমস্যা-সমাধান, চিকিৎসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার সবখানেই এখন এই প্রযুক্তির উপস্থিতি দৃশ্যমান। এই প্রযুক্তি মানুষের কাজ সহজ করেছে, গতি বাড়িয়েছে, সময় বাঁচিয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু একটি ভয়ংকর দিক ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম এআইকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে বরং এটির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, এবং এই নির্ভরতাই জন্ম দিচ্ছে এক গভীর সৃজনশীলতার সংকট।
আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হাঁটলে একটি দৃশ্য স্পষ্ট বোঝা যায়, বেশিরভাগ শিক্ষার্থী Chatgpt, Gemini-এর মতো এআই ছাড়া এসাইনমেন্ট লিখতে পারে না, প্রেজেন্টেশনের স্ক্রিপ্ট সাজাতে পারে নাÑ এমনকি একাডেমিক পড়াতেও chatgpt ব্যবহার করে মুখস্থবিদ্যা প্রয়োগ করে থাকে, এক ক্লিকেই জটিল গবেষণার সারসংক্ষেপ তৈরি হয় বলে তারা আর নতুন করে চিন্তা করে না, গবেষণা করে না, এমনকি যুক্তিতর্কে প্রশ্ন করাও ভুলে যাচ্ছে। এই অবস্থায় একজন শিক্ষার্থী জ্ঞান অর্জনকারী না হয়ে জ্ঞান কপি পেস্টকারী হয়ে যাচ্ছে। দ্রুততা, সহজলভ্যতা এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের এই প্রলোভন আজ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ প্রজন্মকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করছে। বৈশ্বিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বহুলাংশে (৭০%-৮০%) পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা এখন নিয়মিতভাবে এই সহজ সমাধান বেছে নিচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের নিজস্ব মেধা ও মৌলিক চিন্তাভাবনাকে অকেজো করে দিচ্ছে। যে বয়সে ছাত্রদের কৌতূহল বেড়ে ওঠার কথা, প্রশ্নের পাহাড় তৈরি করার কথা, যুক্তির অনুশীলন করার কথা সেই বয়সেই তারা দ্রুত উত্তরের জন্য নির্ভরশীল হয়ে ক্লিক করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর। সমস্যার সমাধান এসে যাচ্ছে চোখের সামনে, যুক্তি লেখার প্রয়োজন নেই, ভাবনার দরজা খুলতে হচ্ছে না।
হাজার বছর আগে মানুষ যখন প্রথমবার হাতিয়ার বানাল সেটা মানুষের শক্তি বাড়িয়েছিল, মানুষকে দুর্বল করেনি। একইভাবে এআইকে যদি আমরা হাতিয়ার হিসেবে দেখি তবে এটি আমাদের সৃষ্টিশীলতার শক্তি বহুগুণ বাড়াতে পারে। এআই কোনো শত্রু নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ একটি সহযোগী। তবে শর্ত হলো এটি ব্যবহার হবে সহায়ক হিসেবে, প্রতিস্থাপনকারী হিসেবে নয়। একটি হাতিয়ার তখনই মূল্যবান হয় যখন ব্যবহারকারী জানে কখন, কীভাবে এবং কতটা ব্যবহার করতে হবে। এআই যদি ছাত্রদের শেখার সঙ্গী হয়, তবে এটি জ্ঞানের নতুন দরজা খুলে দিবে। কিন্তু যদি ছাত্ররা এআইকে নিজেদের চিন্তার জায়গায় বসিয়ে দেয় তবে তা ভবিষ্যতের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছেÑ এই নির্ভরতা কি শুধু প্রযুক্তির দোষ? নাকি আমাদের প্রজন্মের অভ্যাসগত সমস্যা?
সত্য হলো এআই কখনোই কাউকে চিন্তা করা বন্ধ করতে বাধ্য করে না। মানুষ নিজেই সহজ পথ বেঁচে নিচ্ছে। যখন বিনা পরিশ্রমে ফল দ্রুত পাওয়ার সুযোগ থাকে তখন পরিশ্রম করার অভ্যাস কমে যায়। যেমন ক্যালকুলেটর আবিষ্কারের পর অনেকে মাথায় গণিত করা ভুলে গেছে, সার্চ ইঞ্জিন আসার পর অনেকে বই পড়া কমিয়ে দিয়েছে। এখন এআই যেহেতু প্রায় সব কাজ করে দিতে পারছে ফলস্বরূপ মানুষের চিন্তার অভ্যাস দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান পৃথিবীতে শুধু জ্ঞান নয় প্রয়োজন সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সমাধান বের করে আনার দক্ষতা। এই গুণগুলো এআই দিতে পারবে না, দিতে পারবে না কোনো যন্ত্র।এগুলো জন্মায় মানুষের মস্তিষ্কে, স্বাধীন চর্চায়। চিন্তা বন্ধ হলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার কিন্তু চিন্তা জাগ্রত থাকলে ভবিষ্যৎ জ্বলে ওঠে আলোয়। প্রযুক্তির ব্যবহার থামাতে হবে এমন দাবি নয় বরং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে এমনভাবে, যাতে আমাদের চিন্তা বাড়ায়, কমায় না। কারণ আগামী দিনের পৃথিবী তাদের অপেক্ষায় আছে, যারা মেশিনের সাহায্য নেয় ঠিকই কিন্তু চিন্তা করতে জানে নিজের মাথা দিয়ে।
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়