ইমেইল থেকে
রেহানা ফেরদৌসী
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৫৭ এএম
২৫ নভেম্বর ছিল আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য : ‘নারী-কন্যা সুরক্ষা করি, সহিংসতা মুক্ত বিশ্ব গড়ি’। একজন মেয়ে যখন আপনার বোন, তখন আপনি তার ‘দায়িত্ববোধ’ অনুভব করতে পারেন। তিনি যখন আপনার বন্ধু, তখন আপনি তার ‘আবেগ’ অনুভব করতে পারেন। তিনি যখন আপনার প্রেমিকা, তখন আপনি তার ‘প্রবল অনুরাগ’ অনুভব করতে পারেন। তিনি যখন আপনার স্ত্রী, তখন আপনি তার ‘ত্যাগ ও ধৈর্য’ অনুভব করতে পারেন। তিনি যখন আপনার সন্তান, তখন আপনি তার ‘নিষ্পাপতা’ অনুভব করতে পারেন। তিনি যখন আপনার মা, তখন আপনি তার ‘প্রকৃত ভালোবাসা’ অনুভব করতে পারেন। একজন মেয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার অন্যতম সেরা সৃষ্টি।
১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর লাতিন আমেরিকার ডমিনিকান রিপাবলিকের স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য প্যাট্রিয়া, মারিয়া তেরেসা ও মিনার্ভা মিরাবেল নামে গির্জার তিনজন সিস্টারকে হত্যা করা হয়। আর এই তিন সিস্টারকে হত্যা করা হলে তাদের স্মরণে ১৯৮১ সাল থেকে এই দিনটি আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিবাদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। এই ঘটনার স্মরণে পরবর্তীকালে ১৯৯৩ সালে ভিয়েনা মানবাধিকার সম্মেলনে নারী ও পুরুষের মধ্যে অসমতা ও বৈষম্যের কারণে সৃষ্ট জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায় এবং নারী নির্যাতন-সম্পর্কিত ঘোষণা গ্রহণ করা হয়। এই সম্মেলনে দুটি প্রত্যয় সামনে আসে, ‘নারীর অধিকার মানবাধিকার’ এবং ‘নারীর প্রতি সহিংসতা মানবাধিকার লঙ্ঘন’। ১৯৯৯ সাল থেকে জাতিসংঘ দিবসটি কেন্দ্র করে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ পালনের ঘোষণা করে। এর পর থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
বর্তমানে আগের তুলনায় নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি সহিংসতায় নতুন ধরন যুক্ত হচ্ছে। প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন নারী জীবনে কোনো একবার নিকটতম সঙ্গী দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এই নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক সহিংসতা। এর মধ্যে ৬৪ শতাংশ নারী তাদের ওপর সহিংসতার ঘটনা কখনও কাউকে বলেননি। অন্য কারও তুলনায় স্বামীদের দ্বারা শারীরিক সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কা তিনগুণ বেশি, যৌন সহিংসতার আশঙ্কা ১৪ গুণ বেশি। এ ক্ষেত্রে বলা যায়, বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যেই শারীরিক ও যৌন সহিংসতার ঝুঁকি অধিক। তা ছাড়া সামাজিক পরিসরে তো রয়েছেই।
প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন সমাজ ও সভ্যতায় যেমন আলো ফেলছে, আবার এই প্রযুক্তিই নারীর জীবনে নতুন ধরনের সহিংসতার অভিঘাত তৈরি করছে। বাংলাদেশে ৮৯ শতাংশ নারী ও কন্যা প্রযুক্তির মাধ্যমে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। কন্যাশিশু প্রথম সাইবার সহিংসতার শিকার হয় ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সে। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সি নারীরা সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তির মাধ্যমে সহিংসতার শিকার হন। এ ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ ভুক্তভোগী নারী আইনি ব্যবস্থা নেন না, তাদের পরিবারকেও এ বিষয়ে জানান না। ৫৩ শতাংশ জানে না কোথায় রিপোর্ট করতে হবে। জরিপে দেখা যায়, ছাত্রী ও অবিবাহিত নারীরা এই হয়রানির শিকার বেশি হন। যেসব নারী অনলাইনে অধিক দৃশ্যমান; যেমনÑ রাজনীতিতে সক্রিয়, আন্দোলনকর্মী, ছাত্রী তারা অধিক হারে সাইবার সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
প্রযুক্তির মাধ্যমে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ধরনগুলো হচ্ছেÑ সাইবার স্টকিং, হ্যাকিং, অনলাইন হয়রানি, চিত্রভিত্তিক সহিংসতা, প্রযুক্তিভিত্তিক যৌন হয়রানি, প্রলুব্ধ করা, ফাঁদে ফেলা, বিদ্বেষমূলক ভাষা প্রয়োগ ইত্যাদি। প্রযুক্তিনির্ভর এই নির্যাতন নারী ও কন্যার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বেশিরভাগ ভুক্তভোগী পরিবার সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে বিষয়টি গোপন রাখে। ফলে মনস্তাত্ত্বিক ট্রল, মানসিক উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাস হারানো, অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটে। নারী সামাজিক ও আর্থিক, ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। করোনা-পরবর্তী সময়ে অনলাইনভিত্তিক কাজের পরিধি আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা অনলাইনে কাজ করছেন। সাইবার সহিংসতার শিকার হওয়ার কারণে তাদের অনেকে কর্মক্ষেত্র ছেড়ে দূরে চলে যান। ফলে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন, সম্পদের ওপর তারা অধিকার হারান। এভাবে একদিকে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন নারী, অন্যদিকে প্রযুক্তিতে তার প্রবেশগম্যতা হ্রাস পেতে থাকে, যা জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
সহিংসতার অনেক ধরন আছে, যা ব্যক্তির দ্বারা ঘটে, যথাÑ ধর্ষণ, গৃহ নির্যাতন, যৌন হয়রানি, প্রজননগত জোর-জবরদস্তি, কন্যাশিশু হত্যা, লিঙ্গভিত্তিক গর্ভপাত, প্রসবকালীন সহিংসতা, উচ্ছৃঙ্খল জনতার দ্বারা সহিংসতা বা দাঙ্গা, রীতি বা আচারগত চর্চা যেমন সম্মান রক্ষার্থে হত্যা বা অনর কিলিং, যৌতুক সহিংসতা বা পণমৃত্যু, নারী খতনা ইত্যাদি।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনের কঠোর প্রয়োগ, নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন এবং সহায়তামূলক সেবা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে হেল্পলাইন নম্বর যেমনÑ ১০৯ বা ৩৩৩ নম্বরে (৩ যোগ করে ৩৩৩৩) যোগাযোগ করা যেতে পারে। পুরুষ এবং নারী নির্বিশেষে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে নির্যাতনমুক্ত সমাজ গড়তে। সচেতনতা না বাড়ালে এ পরিস্থিতি কমবে না। নারীকে সমাজের অংশ হিসেবে সমান মর্যাদায় দেখাতে হবে। নারীকে দুর্বল মনে করার প্রবণতা সমাজ থেকে দূর করতে না পারলে সহিংসতা রোধ সম্ভব নয়। পারিবারিক সহিংসতা দমনে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই এখন জরুরি মানবিক দায়িত্ব।
আসুন, সবাই মিলে নারী ও কন্যাসন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করি এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে গড়ে তুলি একটি সুন্দর পৃথিবী। ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন সহিংসতা প্রতিরোধ দিবস সফল হোক।
রেহানা ফেরদৌসী
সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি
(কেন্দ্রীয় পুনাক), মোহাম্মদপুর, ঢাকা।