ইমেইল থেকে
আব্দুল কাদের জীবন
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৪২ এএম
আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৫১ এএম
ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীর ঠিক মাঝখানে এক ভিন্ন জায়গা-কড়াইল বস্তি। এটি শুধু একটি ঠিকানা নয়; এটি হাজার হাজার দিনমজুর, রিকশাওয়ালা, পরিচারিকা ও খেটে-খাওয়া শ্রমিকের শেষ আশ্রয়স্থল। কিন্তু এই আশ্রয় আজ এক বিভীষিকাময় অগ্নিপরীক্ষার নাম। প্রতিবছর এই বস্তির বাসিন্দাদের একটি অভিশাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অভিশাপটি হলো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। গত ৯ মাসে দুইবার এবং গত এক দশকে প্রায় কুড়িবার কড়াইল বস্তি আগুনে পুড়েছে।
সকালবেলা উপার্জনের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া মানুষটি সন্ধ্যায় ফিরে এসে যখন দেখে তার ছোট্ট ঘরটি, তার একমাত্র সম্বলটুকু, আগুনে পুড়ে ছাই তখন সেই দৃশ্য কী ভয়াবহ, তা শুধু ভুক্তভোগীই জানে। হৃদয় বিদীর্ণ করা সেই আর্তনাদ পুরো জাতিকে স্পর্শ করে মুহূর্তেই। এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জীবনে সঞ্চয় বলতে কিছু নেই। তাদের ঘরগুলো বাঁশ, টিন আর কাঠ দিয়ে তৈরি, যা ক্ষণিকের আগুনে দ্রুত ছাই হয়ে মিশে যায় মাটিতে। ২৫ নভেম্বরের ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল, এই আগুন শুধুমাত্র নিছক দুর্ঘটনা নয়, এর গভীরে কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে কি না তা উন্মোচন করতে হবে। কারণ বস্তিবাসী এবং সচেতন মহল বারংবার দাবি করে আসছে, এই আগুনের পেছনে শুধু শর্ট সার্কিট দায়ী নয়; এর পেছনে রয়েছে নাশকতা।
প্রতিবার ভয়াবহ আগুন লাগার পর একটি গতানুগতিক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। প্রতিটি তদন্তেই প্রায় একই কারণ উঠে আসেÑ অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের তারের শর্ট সার্কিট। কিন্তু বস্তির ভেতরে বছরের পর বছর ধরে অবৈধ সংযোগ থাকে কী করে? কোনো শাসকগোষ্ঠীর নজরে কি এসব ত্রুটি ধরা পড়ে না? কারা এই অবৈধ সংযোগ দেয় এবং কারা তার বিনিময়ে নিয়মিত অর্থ সুবিধা নেয়? এই প্রশ্নগুলো সব সময়ই ধামাচাপা পড়ে যায়।
কড়াইল বস্তি একটি অতি মূল্যবান এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত। এটি বিটিসিএল-এর মালিকানাধীন প্রায় ৯৫ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই জমির মূল্য আকাশচুম্বী। বস্তিবাসীর অভিযোগ, এই জমি দখলমুক্ত করে বহুতল ভবন নির্মাণ করার উদ্দেশ্যে একটি ‘উচ্চমহল’ দীর্ঘদিন ধরে বস্তিবাসীকে উচ্ছেদের চেষ্টা করে আসছে। উচ্ছেদ অভিযান সফল না হওয়ায়, একটি সহজ পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়েছে, বারবার আগুন লাগিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং বস্তিবাসীকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা।
প্রশ্ন হচ্ছে, যদি সত্যিই আগুন লাগার মূল কারণ অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ হতো, তবে প্রশাসন এত বছর ধরে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করছে না কেন? বস্তিবাসী বলে ওদের রাষ্ট্র থেকে নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার নেই বুঝি? বরং প্রতিবার আগুন লাগার পর বস্তিবাসীর ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করা হয়। এই বিষয়টিই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে তোলে। তদন্তগুলো কখনোই সাফল্যের মুখ দেখে না, কারণ এই তদন্তের সাফল্য হয়তো বৃহত্তর কোনো স্বার্থকে আঘাত করবে।
আমরা মনে করি, কড়াইল বস্তির আগুন শুধু বস্তির কাঠ-বাঁশ পোড়ায় না; তা আমাদের মানবিকতা, আমাদের সুশাসন এবং আমাদের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারকেও পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। আর কোনো অসহায় মানুষ যেন আগুনে পুড়ে নিঃস্ব না হয়Ñ সরকারকে এই দায়িত্ব নিতে হবে। বস্তিবাসীর আর্তনাদ যেন কেবলই আর্তনাদ হয়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
আব্দুল কাদের জীবন
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।