দ্বিতীয় জনবহুল শহর
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৪৮ এএম
একজন মানুষের পরিচিতি প্রথম এবং প্রধানত প্রতিফলিত হয় তার মুখমন্ডলে। একটি জাতির পরিচয় তেমনভাবেই তুলে ধরে তার রাজধানী। এই রাজধানীর ব্যবস্থাপনা, তার মানুষ, তার লোকসংখ্যা, সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয় তাই অতি গুরুত্বপূর্ণ। জনসংখ্যার দিক থেকে জাপানের টোকিওকে পেছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা। যে গতিতে জনসংখ্যা বাড়ছে তাতে খুব দ্রুতই ঢাকা হবে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক দপ্তরÑ ইউএনডিইএসএ-এর ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাস ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই অস্বস্তিকর বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহরের তালিকায় ২০০০ সালে শীর্ষস্থানে ছিল টোকিও। কিন্তু এবারের প্রতিবেদনে জাপানের রাজধানীর অবস্থান তৃতীয় স্থানে। টোকিওর জনসংখ্যা এখন ৩ কোটি ৩৪ লাখ। অন্যদিকে, তালিকার নবম স্থান থেকে এক লাফে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ। ৪ কোটি ১৯ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম শহর এখন জাকার্তা।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, বর্তমানে তালিকার শীর্ষে থাকা জাকার্তা বড় ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে শহরটির এক-চতুর্থাংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় ইন্দোনেশিয়া সরকার বোর্নিও দ্বীপে ‘নুসানতারা’ নামে নতুন রাজধানী গড়ে তুলছে। জাতিসংঘ বলছে, রাজধানী স্থানান্তর করা হলেও ২০৫০ সাল নাগাদ জাকার্তায় আরও এক কোটি মানুষ যুক্ত হবে।
প্রতিবেদনে ঢাকার জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে মানুষের শহরমুখী হওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষ জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় ভিড় করছেন। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার শহরে পরিণত হবে। এ তথ্য কেবল পরিসংখ্যান নয়Ñ এটি আমাদের উন্নয়ন কৌশলের সামনে এক শক্তিশালী সতর্কতা। কারণ, ঢাকা শহর আজ জনসংখ্যা ও পরিকাঠামোর এক বৈপরীত্যপূর্ণ সমীকরণে আটকা পড়েছে।
এ কথা সত্য যে, ঢাকার শক্তি তার মানুষ। কিন্তু সেই মানুষই আজ ঢাকার সবচেয়ে বড় চাপে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ আসছে, যার বেশিরভাগ জীবিকার সন্ধানে। কিন্তু এ শহর কি সেসব মানুষের জন্য সমানভাবে বসবাসযোগ্য? আমরা দেখিÑ অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, বাতাসের দূষণ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিÑ সব মিলিয়ে ঢাকার বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত এক অস্থির নগর বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করছে।
ঢাকা কার্যত দেশকে চালায় অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মানসিকভাবে। জাতীয় জিডিপির প্রায় অর্ধেক আসে এই শহর থেকে। বাস্তবতা হলো— ঢাকা যত দেয়, তার বিনিময়ে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ততটা পায় না। নগর পরিকল্পনা বরাবরই এসেছে খণ্ডিত, দেরিতে, দায়সারা ভিত্তিতে। মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন থমকে থাকে স্বার্থে, জটিলতায়, কিংবা নীতিনির্ধারণের অদূরদর্শিতায়। এভাবে ঢাকা অপরিকল্পিতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু পরিকল্পনায় বড় হয়নি।
ইউএনডিইএসএ-এর প্রতিবেদন আমাদের আরেকটি দিক নির্দেশ করে; জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে একজন ঢাকাবাসীর জীবনযাত্রার মান পৃথিবীর অন্যতম নিম্ন অবস্থানে, স্বাস্থ্যসেবা- চাপের মুখে, পরিবহন- অপর্যাপ্ত, জনসুরক্ষা- ঝুঁকিপূর্ণ, জীবনযাত্রার ব্যয়- হুহু করে বাড়ছে। এত সংকটের মুখেও ঢাকা হয়ে উঠছে সুযোগের কেন্দ্রÑ চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন সবই ঢাকা কেন্দ্রীভূত।
ঢাকা দেশের একমাত্র মানুষের আশ্রয়স্থল হতে পারে না। এর জন্য চাই বিকেন্দ্রীকরণ। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর— এদের হতে হবে বিকল্প নগর কেন্দ্র। বড় শিল্পÑ শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, আঞ্চলিক শহরগুলোতে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রশাসনিক দায়িত্ব ডি-সেন্ট্রালাইজ করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় ও করপোরেট হাবগুলো ঢাকার বাইরে গড়ে তুলতে হবে— তবেই ঢাকার ওপর চাপ কমবে। আমরা মনে করি, নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রয়োজন সাহসী, দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত। ফুটপাত দখলমুক্ত করা, গণপরিবহনকে আধুনিক করা, বাস লেন চালু করা, জলাধার রক্ষা করাÑ এসব ঢাকার অস্তিত্ব রক্ষার শর্ত।
ঢাকা এখন শুধু জনবহুল নয়Ñ ঢাকা প্রমাণ করেছে মানুষের আকাঙ্ক্ষার শহর হওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষাকে আশীর্বাদে পরিণত করতে হলে এখনই প্রয়োজন দূরদর্শী নগর পরিকল্পনা। ইউএনডিইএসএ-এর প্রতিবেদন আমাদের সামনে যে চিত্র তুলে ধরেছেÑ এই অস্বস্তিকর সত্য এড়ানো যাবে না। ঢাকা যদি টেকসই নগর না হয়, বাংলাদেশও টেকসই উন্নয়নের পথ থেকে সরে যাবে। আমরা বিশ্বাস করি, ঢাকার ভবিষ্যৎ আমাদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎÑ এই উপলব্ধিটিই আজ দায়িত্বশীলদের বোধোদয় জরুরি।