ড. অনুপম সেন
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২২ ০০:১৬ এএম
আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২২ ১৯:১১ পিএম
আগস্ট বাঙালি জাতির শোকের মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালির হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ শুরু হয় বর্বরতা-পৈশাচিকতা-নৃশংসতার উন্মত্ততায়, তা শেষ হওয়ার নয়। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের ১৭ সদস্যকে স্বজাতদ্রোহীরা হত্যা করে। গভীর শ্রদ্ধায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের যে সদস্যদের আমরা হারিয়েছি, তাঁদের প্রত্যেককে স্মরণ করি। দেশের স্থপতি ও নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে তাঁর পরিবারের সদস্যসহ এমন হত্যার ঘটনা ইতিহাসে বিরল। ঘাতকরা কি সেদিন শুধু একজন শেখ মুজিব কিংবা তাঁর পরিবারের সদস্যদেরই হত্যা করেছিল?
এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো-না, তাদের পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ঘাতকরা মনে করেছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলে তাঁর লালিত স্বপ্নকেও হত্যা করা হবে। অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সার্বিকভাবে বিকশিত যে বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিয়ে পাকিস্তানি ভাবাদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যই ছিল হন্তারকদের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফলে যে বেদনাবিধুর অধ্যায়ের সৃষ্টি হয় পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট এর সুফলভোগী কারা, তাও তো অজানা নয়। দায়মুক্তির অধ্যাদেশ জারি করে তো শুধু হন্তারকদের সুরক্ষাই দেওয়া হয়নি, নানাভাবে তাদের ঘৃণ্যকর্মের জন্য পুরস্কৃতও করা হয়েছিল। এও ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়।
এসবই ছিল সভ্যতা-মানবতার মূলে চরম কুঠারাঘাত। এত বড় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পর যেসব কদর্যতা আরও ভয়ংকরভাবে দৃশ্যমান হয়, তাও তো সভ্য দুনিয়ায় বিরল। ৩ নভেম্বর জেলহত্যাও এরই ধারাবাহিক বর্বর অধ্যায়। তবে স্বস্তির বিষয়, বিলম্বে হলেও ঘাতকদের সুরক্ষা দেওয়ার সেই দেয়াল ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল এবং বিচার হয় হত্যাকাণ্ডের। কিন্তু দণ্ডিত খুনিদের মধ্যে জয়েকজনের দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হলেও বাকিরা এখনও পলাতক। তাদের মধ্যে কয়েজনের অবস্থান শনাক্ত হলেও অন্যদের অবস্থান জানা যায়নি। সরকারের তরফে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে তাদের খুঁজে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করার। তবে যাদের অবস্থান জানা গেছে, তাদের ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকরের চেষ্টাও এখন পর্যন্ত সফল হয়নি।
আমার মনে হয় এ লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পথ মসৃণ করতে এর কোনো বিকল্প নেই। শুধু এখানেই শেষ করলে চলবে না। পঁচাত্তরের বর্বরোচিত অধ্যায় রচনার পেছনে আরও যাদের সক্রিয়তা ছিল নানাভাবে তাদেরও সন্ধান জরুরি। আজ যারা গণতন্ত্র, আইনের শাসন ইত্যাদি নিয়ে বুলি আওড়ান, তাদের অনেকেরই ভূমিকা সেদিন কি ছিল তাও সচেতন মহলের অজানা নয়। দেশ-জাতির স্বার্থে এবং সবরকম কদর্যতার চির অবসানে তাদের মুখোশ উন্মোচন জরুরি।
সংগ্রামই ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবন। স্বাধীনতা পূর্ব অর্থাৎ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আগের এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রেক্ষাপট যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবন-অধ্যায়ের বিবরণ শিহরণ জাগায়। দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন আর স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু ছিল বঙ্গবন্ধুর নিত্যসঙ্গী। তিনি তো বহুবার হয়েছেন মৃত্যুর মুখোমুখিও। একাধিকবার ফাঁসির মঞ্চও তৈরি হয়েছিল তাঁর জন্য। কিন্তু তিনি ছিলেন অধিকার আদায়ের প্রশ্নে আপসহীন। আমরা জানি, বাঙালির প্রতি তাঁর বিশ্বাস ও আস্থা ছিল গগনচুম্বী। আর সে জন্যই হাসিমুখে, নির্ভীকচিত্তে মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সব রকম জুলুম-নির্যাতন তিনি বরণ করেছেন।
আমরা কিছুদিন আগে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উদযাপন করেছি। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ যেন সমার্থক এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। অনেক আগের ইতিহাস যদি না-ও উল্লেখ করি, তবু তর্কাতীতভাবেই বলা যায় ছয় দফার দাবিই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মূলমন্ত্র। ছয় দফার প্রবক্তা হিসেবেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্রষ্টা। বঙ্গবন্ধু এমন একটি দেশ চেয়েছিলেন, যে দেশ কারও কাছে মাথা নোয়াবে না। বাংলাদেশ তো সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছে।
একাত্তরে যদি বাংলাদেশ স্বাধীন না হতো, তবে আজ এই অঞ্চল অত্যন্ত দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে পরিগণিত হতো। ১৯৫৯-৭০-এর সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকের মাথাপিছু আয় প্রায় ৫০ ভাগ বেশি ছিল। এতে বোঝা যায় বৈষম্য কতটা প্রকট ছিল। সেখানে আজ বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২০৬৪ ডলারেরও বেশি। বিপরীতে পাকিস্তানের মানুষের মাথাপিছু আয় ১৩৫৭ ডলার। একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল বলেই বাঙালির অগ্রযাত্রা আজ বিশ্ববাসী অবাক চোখে দেখছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে আরও দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে কাজ করতে হবে যূথবদ্ধভাবে। তবেই জাতির পিতার প্রতি তা হবে শ্রদ্ধা নিবেদনের সর্বোত্তম পন্থা। সেই লক্ষ্যে জাতীয় শোক দিবসের প্রতিজ্ঞা হোক, শোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।
মহাকালে অনশ্বর একটি মহাকাব্যিক ভাষণ হলো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। তিনি নানা কারণেই চিরঅম্লান-চিরভাস্বর। তিনি বাঙালিকে মুক্তির ঠিকানা দিয়েছেন। তাই তিনি বাঙালির জন্য অনশ্বর, অমর। তাঁর মহাপ্রয়াণের দিন বিশ্বের প্রত্যেক, স্বাধীনতাপ্রেমী, মুক্তিকামী মানুষের জন্য স্মরণীয় দিন।
লেখক : সমাজবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ