ভয়াবহ আগুন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৩৮ এএম
রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে ফের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ২৫ নভেম্বর বিকালে সৃষ্ট এই আগুনে বস্তির বেশিরভাগ ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। পানির স্বল্পতাসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে আপ্রাণ চেষ্টার পরও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই নিঃস্ব হয়ে যায় শত শত পরিবার। বস্তির আগুনের লেনিহান শিখার সঙ্গে আমাদের মনেও জাগে জ্বলন্ত প্রশ্ন: বস্তি কেন গড়ে? বস্তি কেন পোড়ে? কেন পায় না বস্তির জীবন ও সামান্য সম্পদের নিরাপত্তা? কেন তাদের জন্য রাষ্ট্র, এ নগর নিরাপদ আবাসন গড়ার গরজ অনুভব করে না?
২৬ নভেম্বর গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, বউবাজারের কুমিল্লা পট্টি, বরিশাল পট্টি ও ‘ক’ ব্লকের বাসিন্দারা কেউ কাছের খামারবাড়ি (ঈদগাহ) মাঠে, অনেকে এরশাদ স্কুল মাঠ কিংবা মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠে আশ্রয় নিয়েছে। খামারবাড়ি মাঠে শতাধিক পরিবারের সদস্যরা মালপত্র নিয়ে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। টিঅ্যান্ডটি মাঠেও শত শত মানুষ খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। মশার কামড়ের পাশাপাশি হালকা শীত থেকে বাঁচতে তারা কাঠ, প্লাস্টিক পোড়াচ্ছেন।
উল্লেখ্য, রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান ও বনানী লাগোয়া প্রায় ৯০ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা কড়াইল বস্তিতে ১০ হাজার ঘর রয়েছে। ঘন জনবসতির কারণে সেখানে প্রায়ই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে ওই বস্তিতে লাগা আগুনে পুড়ে যায় অন্তত ডজনখানেক ঘর। গত বছরের ২৪ মার্চ ও ১৮ ডিসেম্বরেও আগুনে পোড়ে কড়াইল বস্তি।
আগুন যেন আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, এই শহর যেন অদৃশ্য দুটি আলাদা ঢাকা। একদিকে কাঁচের দেয়াল, উচ্চ ভবন, আলো ঝলমলে উন্নয়নের রাজধানী; অন্যদিকে ঘিঞ্জি, সহজ-ভঙ্গুর টিন আর বাঁশের বেড়ায় তৈরি অনিরাপদ বাসস্থানÑ যেখানে দেশের সবচেয়ে পরিশ্রমী নিম্ন-আয়ের মানুষরা ঘুমায়, জাগে, কাজ করে, পরে আবার আগুনে পুড়ে সব হারায়। আমরা মনে করি, এমন মর্মন্তুদ বিপর্যয় এখন আর ‘দুঃখজনক দুর্ঘটনা’ বলে পাশ কাটানো যাবে না। এটি নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল।
শহরে কেন বস্তি গড়ে ওঠে, গ্রামের মানুষ দলে দলে ছুটে এসে কেন সেই সব বস্তিতে ঠাঁই নেয়, তার কারণ অনেকেরই জানা। সেই দীর্ঘ আলোচনায় না গেয়েও নির্দ্বিধায় এ সত্য বলে দেওয়া যায় যে, ঢাকা শহরের বস্তিগুলোতে সাধারণত নিম্ন-আয়ের মানুষজনেরই বাস। বিশেষ করে রিকশাচালক থেকে গৃহকর্মী, ছোট দোকানি থেকে দিনমজুরÑ সবাই এসব বস্তি এলাকায় বাস করে। যাদেরকে বলা হয় শহরের ‘জরুরি কর্মী’ বাহিনী। কড়াইলের বস্তিতে বসবাসকারীরা তাদেরই অংশ। অথচ এসব বস্তিতে কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই, নেই নিরাপদ বৈদ্যুতিক লাইন, নেই জরুরি বেরুনোর পথ। শুধু ঘরে ঘরে ঝুলে থাকা জ্বলন্ত তড়িৎ সংযোগ আর শুকনো কাঠÑ এগুলো মিলিয়ে যেন আগুন ডেকে আনা এক নিষ্ঠুর পরিবেশ। পুড়িয়ে দেয় সামান্য সঞ্চয়, ছোট ছোট আসবাবপত্র, থালা, বাটি, কলস একটি পুরনো মোবাইল আর শিশুর স্কুলব্যাগ। যেন শত শত পরিবার আবার ‘শুরু থেকে শুরু’ করার দুঃসহ চক্রে পড়ে যায়।
এই আগুনের দায় কার? শুধু শর্ট সার্কিটের? নাকি রাষ্ট্রীয় অবহেলার? সঠিক নগর পরিকল্পনার অভাব, নাকি কোনো নাশকতা! প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর দায়িত্বশীলদের নজরদারি ও তৎপরতা বেড়ে যায়, দ্রুত তদন্ত কমিটি হয়। ক্ষতিগ্রস্তরা তাৎক্ষণিক কিছু নগদ সহায়তাও হয়তো পান। আর এদিকে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ হোক বা না হোকÑ স্থায়ী সমাধান দৃশ্যমান হয় না। এখন প্রশ্নÑ বস্তিবাসীরা কি ঢাকার নাগরিক নয়? তাদের কি নিরাপত্তার অধিকার নেই? আমরা তাদের কাজ গ্রহণ করব, শ্রম নেব, কিন্তু নিরাপদ বাসস্থানের নিশ্চয়তা দেব না?
আমরা মনে করি, এখনই প্রয়োজন মানবিক এই সংকটটির প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান। প্রতি বস্তিতে জরুরি অগ্নিনির্বাপণ কাঠামো স্থাপন; প্রশিক্ষিত ফায়ার ভলান্টিয়ার দল গঠন; বিদ্যুৎ লাইনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ; পানির সার্বক্ষণিক সহজপ্রাপ্যতা এবং দ্রুত সহায়তার জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা। প্রয়োজনে বস্তিবাসীর সঙ্গে কথা বলে, তাদের প্রয়োজন বুঝে, ক্রমান্বয়ে নিরাপদ আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা। শহরের শ্রমিকশ্রেণির জন্য স্বল্পমূল্যের সরকারি আবাসন এখন আর বিলাসিতা নয়Ñ এটি জরুরি বাস্তবতা।
আমরা এ দেশে শহরমুখি জনস্রোত রেধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারিনি। বস্তিতে এসে তাদের মানবেতর জীবনযাপন বেছে নেওয়ার ধারাও বদলাতে পারেনি এ রাষ্ট্র। আর ঢাকা কেবল উন্নত রাস্তা, সাইনবোর্ড বা আকাশছোঁয়া ভবনের নয়Ñ ঢাকা হলো সকল মানুষের শহর। কিন্তু সেই মানুষ যদি বস্তিতে আগুনে পুড়ে মরতে থাকে তাহলে উন্নয়নের গর্ব মিথ্যা হয়ে যায়। তাই এই ধরনের দুর্ঘটনার পর অস্থায়ী ত্রাণ বিতরণে থেমে গেলে চলবে না। যতক্ষণ না এই শহরের প্রতিটি মানুষ সমানভাবে নিরাপত্তা পায় ততক্ষণ আমরা প্রকৃত নগরসভ্যতা অর্জন করতে পারব না।
কড়াইল বস্তির আগুন আজ কেবল একটি ট্র্যাজেডি নয়Ñ এটি রাষ্ট্রকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান। আর নয়, বস্তিবাসীদের জন্য কেবল সহানুভূতি বা করুণা। এখন সময় তাদের অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার। বস্তিবাসীদের জন্য নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করাই হবে মানবিক, দায়িত্বশীল ও আধুনিক রাষ্ট্রের পরিচয়। আমরা বস্তিবাসীদের জন্য নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করতে সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করছি।