প্রযুক্তি
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব (সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়), দাউদ ইব্রাহিম হাসান (রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়)
প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৩৩ এএম
প্রযুক্তির রঙিন আলোয় ঝলমল করছে আমাদের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কিন্তু সেই আলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গাঢ় অন্ধকার, এক বিষাক্ত ভবিষ্যৎ, যার নাম ই-বর্জ্য। ই-বর্জ্যের ভয়াবহ দূষণ রোধে এখনই প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ। ই-বর্জ্য হলো সেইসব বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, যা পরিত্যক্ত বা অকেজো হয়ে গেছে, যেমন- টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ফ্রিজ কিংবা অন্যান্য গৃহস্থালি যন্ত্রাংশ। এসব বর্জ্যের মধ্যে সিসা, পারদসহ নানা বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করে। যদি এগুলো যথাযথভাবে পুনর্ব্যবহার বা নিষ্পত্তি না করা হয়, তবে তা মাটি, বায়ু ও পানিকে দূষিত করে এবং ধীরে ধীরে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে সৃষ্টি করে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি।
এই বিষাক্ত পাহাড়ের
চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা যে উন্নয়নের জয়গান গাইছি, তার ভিত্তিপ্রস্তর নির্মিত হচ্ছে
বস্তির গলিতে, অবহেলিত শিশুদের জীবনের বিনিময়ে। এটা কোনো দূর দেশের গল্প নয়, আমাদেরই
চারপাশে ঘটে যাওয়া এক করুণ বাস্তবতাÑ আধুনিক ‘ইলেকট্রনিক দাসত্ব’।
২০১৫ সালে যখন দেশ
ডিজিটাল বিপ্লবের জোয়ারে ভাসতে শুরু করে, তখন ই-বর্জ্যের বার্ষিক উৎপাদন ছিল প্রায়
৪ লাখ টন (২০১০ সালের ৩ লাখ টনের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি ধরে)। এরপর প্রযুক্তির সহজলভ্যতা
ও দ্রুত পরিবর্তনশীলতার কারণে এই সংখ্যাটি প্রতিবছর প্রায় ২০% থেকে ৩০% হারে বাড়তে
শুরু করে। ২০১৮ সালের পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই বছর ই-বর্জ্য জমা
হয় ৪ লাখ টন, যার মাত্র ৩% আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকরণ হতো। অর্থাৎ, সেই সময় থেকেই
৯৭ শতাংশ বিষাক্ত বর্জ্য আমাদের মাটি, জল আর বাতাসে মিশে যাচ্ছিল।
পরিসংখ্যানের আয়নায় বিষাক্ত প্রবৃদ্ধির চিত্র (টন) :
|
বছর |
আনুমানিক ই-বর্জ্য উৎপাদন (টন) |
প্রক্রিয়াকরণের হার (%) |
|
২০১৫ |
৪,০০,০০০ |
< ৩.০% |
|
২০২০ |
৮,০০,০০০ |
< ২.৫% |
|
২০২৫ |
১৬,০০,০০০ |
< ২.৫% (তথ্যমতে) |
|
২০৩০ (প্রক্ষেপণ) |
৩০,০০,০০০ |
৫.০% (যদি কঠোর পদক্ষেপ
নেওয়া হয়) |
|
২০৩৫ (প্রক্ষেপণ) |
৪৫,০০,০০০ |
১৫.০% (লক্ষ্যমাত্রা
গ্রহণ করলে) |
|
২০৪০ (প্রক্ষেপণ) |
৫৬,০০,০০০ |
২৫.০% (ব্যাপক বিনিয়োগে) |
ওপরে উল্লিখিত পরিসংখ্যানগুলো তথ্য-উপাত্তের আলোকে প্রক্ষেপণ
করা হয়েছে, যাতে এই প্রবৃদ্ধির ভয়াবহতা পাঠকের মনে সহজে পৌঁছে যায়।
দেখুন, সংখ্যাগুলো
যেন এক একটি নীরব কান্না! ২০১০ সালে যে বর্জ্য ছিল মাত্র ৩ লাখ টন, তা ২০২৫ সালে এসে
দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ টনে। এই বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত আবর্জনার বেশিরভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক
খাতের হাতে। বস্তির নোংরা পরিবেশে, অরক্ষিত হাতে যখন এই বর্জ্য পোড়ানো হয় বা অ্যাসিড
দিয়ে গলানো হয়, তখন বাতাসে মেশে পারদ, সিসা, ক্যাডমিয়াম। যেন প্রতিটি পোড়া ধোঁয়ার
কুণ্ডলী আমাদের উন্নয়নের কপালের টিপ মুছে দিয়ে বিষাদ এঁকে দিচ্ছে।
এই প্রক্রিয়াকরণের
নামে বস্তি এলাকার শিশুরা, যাদের হাত দিয়ে খেলনা ধরার কথা, তারা আজ বিষাক্ত রাসায়নিকের
সংস্পর্শে এসে আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। তাদের কচি হাতগুলো ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ
থেকে সামান্য তামা বা সোনা বের করার চেষ্টায় পুড়ে যায়, শ্বাসযন্ত্রে ঢুকে যায় বিষ।
পরিসংখ্যান বলছে, অপ্রাতিষ্ঠানিক ই-বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে নিয়োজিত শ্রমিকদের মধ্যে
৫২%-এরও বেশি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় ভুগছে। আর এর মধ্যে ২০২৫ সালে প্রায় ২০%
শিশু শ্রমিক (১০-১৪ বছর), যারা আমাদের আগামীর সোনালি সকালের প্রতীক, তারা তাদের শৈশবকে
বিসর্জন দিচ্ছে এই বিষের আগুনে। এক একটি শিশুমৃত্যু যেন আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার
দলিল।
যখন এই বিষাক্ত রাসায়নিক
পদার্থ মিশে যায় আমাদের কৃষিজমিতে, তখন সেই বিষ কেবল ফসলের উৎপাদনশীলতা কমায় নাÑ
যেমন ২০৩০ সালের পূর্বাভাস বলছে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিজমিতে উৎপাদনশীলতা ১৫% হ্রাস
পাবে, বরং তা খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে আমাদের প্লেটেও জায়গা করে নেয়। আমরা নিজের
অজান্তেই বিষ খাচ্ছি, আর সেই বিষ আমাদের গড় আয়ু কমাচ্ছে! ২০৫০ সালের পূর্বাভাস বলছে,
পরিবেশগত কারণে দেশের গড় আয়ু ২ বছর কমে যেতে পারে, যা একটি জাতির জন্য কতটা ভয়াবহ!
এই নীরব বিপর্যয়কে রুখতে হলে আর কালক্ষেপণ করা চলে না। এই অন্ধকারের বিপরীতে আলো জ্বালাতে
হলে আমাদের নীতি ও মানবিকতার জায়গা থেকে কঠোর হতে হবে।
প্রথমত, আইনের কঠোর প্রয়োগ : ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আইনগত কঠোরতা ও কার্যকর প্রয়োগ
নিশ্চিত করতে হবে। ২০১৯ সালে ‘ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা’ প্রণয়ন করা হলেও তার
বাস্তবায়ন আজও সুদূরপরাহত। আইন থাকতেও যদি তার প্রয়োগ না থাকে, তবে তা কেবলই মলাটবন্দি
একটি কাগজ। সরকারকে দেখাতে হবে যে তারা দেশের মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে আপসহীন।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদকের বর্ধিত দায় (ইপিআর) : এই নীতিকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। যে কোম্পানি পণ্য
তৈরি করছে, তাদেরকেই সেই পণ্য ব্যবহারের পর ফেরত নেওয়ার এবং পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায়
তা ধ্বংস করার বা পুনর্ব্যবহারের দায় নিতে হবে। এতে উৎপাদক পণ্যকে আরও দীর্ঘস্থায়ী
এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তৈরি করতে উৎসাহিত হবে, যা বর্জ্য উৎপাদন কমাতে সাহায্য
করবে।
তৃতীয়ত, মানবিক সুরক্ষা ও পুনর্বাসন : বস্তি এলাকায় যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই কাজ করছে, তাদের
দিকে সরকার ও সমাজের দৃষ্টি ফেরাতে হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক ই-বর্জ্য শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্য
সুরক্ষা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি। বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা
এই শ্রমিকদের জন্য বিনামূল্যে বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা আমাদের নৈতিক
দায়িত্ব। ২০৫০ সালের মধ্যে ই-বর্জ্য সংক্রান্ত অসুস্থতার জন্য সরকারি স্বাস্থ্য খাতে
যে বার্ষিক ২,০০০ কোটি টাকা খরচ হবে বলে পূর্বাভাস, তার চেয়ে অনেক কম খরচেই এই মানুষগুলোকে
সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। শিশুদের ‘ইলেকট্রনিক দাসত্ব’ থেকে মুক্ত করতে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা
প্রণয়ন করে তাদের শিক্ষার আলোয় ফিরিয়ে আনতে হবে।
চতুর্থত, সচেতনতা ও বিনিয়োগ : ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধারের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি
কেন্দ্রে বিনিয়োগ করা এখন সময়ের দাবি। ২০৫০ সালের মধ্যে ই-বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের
হার ৪০% এ উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। কৃষিজমিতে ই-বর্জ্য ফেলার বিরুদ্ধে
‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ও কঠোর জরিমানা আরোপ করে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে সুরক্ষিত করতে
হবে। সেই সঙ্গে ই-বর্জ্য সংক্রান্ত সচেতনতা ও ঝুঁকি নিয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত
করা দরকার। ডাম্পিং সাইটগুলোর পরিবেশগত ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করে বিপদ চিহ্নিত করতে
হবে।
এই ই-বর্জ্যের পাহাড়
শুধুমাত্র পরিবেশ দূষণের কারণ নয়, এটি আমাদের সামাজিক বৈষম্য ও মানবিক সংকটের এক জ্বলন্ত
উদাহরণ। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক বিষাক্ত উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারি
না। এই ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নকে যদি আমরা সত্যিই সফল করতে চাই, তবে সবার আগে এই
বিষাক্ত পাহাড় সরিয়ে ফেলতে হবে। আমরা প্রযুক্তি-যুগের পথিক, বিষাক্ত বর্জ্যের
দায়ভার কাঁধে নেব না আর! যে শিশুরা আজ সিসা আর পারদের ধোঁয়ায় স্বপ্ন দেখছে, তাদের
হাত ধরে আনতেই হবে শুদ্ধ সকাল। জাগো বাঙালি, তোমার বিবেকের দামে কেনা এই ‘ইলেকট্রনিক
দাসত্ব’ ভাঙার সময় এসেছে!