× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অ্যান্টিবায়োটিক

প্রাণ রক্ষার ওষুধ অকার্যকর হবার মহাসংকট

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২২ এএম

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২৫ এএম

প্রাণ রক্ষার ওষুধ অকার্যকর হবার মহাসংকট

চিকিৎসাশাস্ত্রে অতি ব্যবহৃত শব্দগুলোর একটি হলো ‘অ্যান্টিবায়োটিক’। অসুখ হলে দ্রুত সুস্থ হওয়ার ‘ম্যাজিক মেডিসিন’ও বলা হয় এটিকে। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হলো, দেশের আইসিইউগুলোতে ভর্তি রোগীদের মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজই করছে না। ফলে দেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ ক্ষমতা (এএমআর) বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এমন তথ্য জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। ২৪ নভেম্বর সোমবার আইইডিসিআর তাদের ‘ন্যাশনাল এএমআর সার্ভেলেন্স রিপোর্ট-২০২৫’-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উপস্থাপন করে। প্রতিবেদনটির উপস্থাপক অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন হাবিব বলেন, ‘গুরুতর সংক্রমণে দায়ী প্রধান ব্যাকটেরিয়ার বড় অংশ এখন এমন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করেছে যে, চিকিৎসায় সর্বাধুনিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলেও রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ছে।’ এই তথ্য শুধু চিন্তার বিষয় নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। কারণ, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এমন এক অদৃশ্য সংকট, যা নীরবে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে পিছিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি মানুষের জীবনরক্ষার অবলম্বনকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায়, ১৯২৮ সালে স্কটিশ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ‘পেনিসিলিন’ আবিষ্কার করেন। তিনি দেখেন ফাঙ্গাস বা ছত্রাক দ্রুত ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করছে। তার এই পেনিসিলিন আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব এনে দেয় এবং সংক্রমণে মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পেনিসিলিন ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু হলে এর গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হয়। আজ অ্যান্টিবায়োটিক মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভুল ও অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হওয়ার সমস্যা দেখা দেয়।

ইদানীং ভেজাল ও নকল ওষুধের বাজার অ্যান্টিবায়োটিককে আরও বেশি বিপর্যস্ত করছে। নিম্নমানের উৎপাদন, সঠিক উপাদান না থাকা, ভেজাল মিশ্রণ বা ভুয়া লেবেল— এসব কারণে অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। রোগী মনে করেন তিনি চিকিৎসা নিচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে ওষুধ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর নয়। ফলে সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হয়, ব্যাকটেরিয়া আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বাড়ে। ভেজালকারীরা মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। এই চক্রটির বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি, মান নিয়ন্ত্রণ ও আইনি শাস্তি ছাড়া এই বিপদ রোধ করা কঠিন।

২৫ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘অ্যান্টিবায়োটিক অকেজো আইসিইউর ৪১% রোগীর দেহে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত দেশের ৯৬ হাজার ৪৭৭ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। পাঁচটি আইসিইউতে ৭১ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হলে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্যান-ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট (পিডিআর) জীবাণু সব নমুনার ৭ শতাংশ এবং আইসিইউতে ৪১ শতাংশ পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ভবিষ্যতে চিকিৎসার ব্যর্থতা এবং রোগপ্রতিরোধে জটিলতা বাড়াতে পারে।

এ কথা সত্য যে, অ্যান্টিবায়োটিক এমন একটি ওষুধ, যা ব্যাকটেরিয়া জাতীয় সংক্রমণের বিরুদ্ধে কাজ করে। কিন্তু এটি ব্যবহারে অসতর্কতা গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যেমন- ওষুধ অকার্যকর হয়ে পড়া, রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু তৈরি হওয়া এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংক্রমণের ক্ষেত্রে চিকিৎসা কঠিন হয়ে যাওয়া। তাই অ্যান্টিবায়োটিক কখনোই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজের সিদ্ধান্তে খাওয়া উচিত নয়। অনেকেই সামান্য সর্দিকাশি বা ভাইরাল জ্বরেই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করে, যা ভুল ও বিপজ্জনক। ডাক্তার যে ডোজ নির্ধারণ করে দেন তা সম্পূর্ণ কোর্স অনুসরণ করা জরুরি। অনেক রোগী কয়েকদিন খেয়ে সুস্থ বোধ করলে নিজের ইচ্ছাতে ওষুধ বন্ধ করে দেন, এতে জীবাণু পুরোপুরি ধ্বংস হয় না বরং আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

আর আইসিইউ রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন ও ভয়াবহ। এখানে ভর্তি রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম থাকে, তাদের চিকিৎসায় বারবার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু যখন দেখা যায়, এই ওষুধগুলো আর কাজ করছে না, তখন চিকিৎসকের হাতে কার্যকর অস্ত্র প্রায় শেষ হয়ে যায়। ফলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায় বহুগুণ। এ এক মহাসংকট।

আমরা মনে করি, এই সংকটের সমাধানে জাতীয় পর্যায়ে কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ করা দরকার। দেশের সকল ফার্মেসিতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করা উচিত। রোগ নির্ণয়ে দ্রুত ব্যাকটেরিয়া কালচার ও সংবেদনশীলতা পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে দেখা যায় কোন অ্যান্টিবায়োটিক কোন রোগীর ক্ষেত্রে কার্যকর। হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক স্টিওয়ার্ডশিপ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর বিশেষজ্ঞদের দল নিয়মিত নজরদারি করতে পাবেন। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা।

প্রতিবেদন বলছে, আইসিইউতে ৪১ শতাংশ রোগীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে নাÑ আগামী বছর হয়তো বলবে, এই হার ৬০ কিংবা ৭০ শতাংশেও পৌঁছেছে। যদি এখনই পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তাহলে এই আশঙ্কা সত্য হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পাবে। এ ব্যাপারে আজ এবং এখনই আমাদের সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের স্বার্থে, মানুষের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থেÑ এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র, সমাজ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের একযোগে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিক কোনো সাধারণ ব্যথানাশক বা ভাইরাসবিরোধী ওষুধ নয়Ñ এটি একটি শক্তিশালী চিকিৎসা অস্ত্র। এর দায়িত্বশীল ব্যবহারে সবাইকে সচেতন হতে হবে, অন্যথায় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স একদিন চিকিৎসা ক্ষেত্রে ভয়াবহ সংকট ডেকে আনবে।

 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা