জনস্বাস্থ্য
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৩৩ এএম
খাবারে ভেজাল বিশ্বের আর কোন দেশে আছে? ভেজাল মিশিয়ে আর কোথায় খাদ্য বিক্রি হয়? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাওয়া কঠিন। মানুষের খাবারে ভেজাল মেশাবার কথা অনেক দেশে কল্পনা করাও কঠিন। অথচ আমাদের দেশে হরহামেশাই তা হচ্ছে। এ যেন ডালভাতও। ভেজাল মুক্ত শুদ্ধ ও নিরাপদ খাদ্যই বরং বিরল হয়ে উঠছে। ভেজাল খাদ্যপণ্যে ভরে গেছে বাজার। চাল, ডাল, তেল, লবণ, দুধ, চা-পাতা থেকে শুরু করে ফলমূল, শাকসবজি, মসলাপাতি— সবখানেই ভেজাল। দেশজুড়ে ভেজাল খাবারে রমরমা। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে বাজারে ভেজালমুক্ত খাদ্য পাওয়াই এখন কঠিন। এমনকি ভেজাল থেকে মুক্ত নয় শিশুদের খাবারও। ফলে ভেজালের ভিড়ে কোনটি আসল, আর কোনটি নকল চেনা দুঃসাধ্য। খাদ্যপণ্যে ভেজাল মানেই তাতে মিশে থাকবে কীটনাশক, বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কৃত্রিম রঙ, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর। আর যে খাবারের যত চাহিদা তার জোগানে মেশানো হচ্ছে বেশি ভেজাল।
ভেজালের ছোবলে আজ নিরাপদ খাবারের প্রত্যাশা হয়ে উঠেছে একটি স্বপ্ন। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই), জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইপিএইচ) এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপের তথ্যে জানা যায়, দেশের বাজারে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ খাদ্যপণ্য কোনো না কোনোভাবে ভেজালযুক্ত। আর এই ভেজাল খাবার গ্রহণের কারণে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে মরণব্যাধি ক্যানসাররসহ নানান জটিল রোগে। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত ‘ভেজাল খাদ্যে বেড়েছে চিকিৎসা ব্যয়’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিও সেই সত্যই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ভেজালের এই ভয়াল শিকড় এখন বহু স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। মাঠে কৃষক অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে ফসল বাঁচান, প্রক্রিয়াজাতকরণে শিল্পমালিক মেশান সংরক্ষণকারী কেমিক্যাল, পিছিয়ে থাকেন না খুচরা বিক্রেতাও। ফলে প্রতিটি স্তরে কিছু না কিছু মুনাফা যায় ভেজালকারীদের পকেটেÑ আর ভোক্তা প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছে নিজের স্বাস্থ্য, সর্বোপরি জীবনীশক্তি। আর ভেজালকারীদের এই মুনাফালোভী মনোবৃত্তির কারণেই একটি জাতি তার জীবনীশক্তি হারিয়ে ক্রমশ কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে, ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ঝুঁকছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক খাদ্যে ভেজালজনিত রোগে আক্রান্ত হন। ভেজাল খাদ্যের কারণে গ্যাস্ট্রিক, ডায়রিয়া, লিভার ও কিডনি বিকল, হৃদরোগ, ক্যানসারÑ এমনকি স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী জটিলতাও বাড়ছে। কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, দেশের প্রায় ১৬ ভাগ মানুষ কিডনি রোগে ভুগছেন, যার অন্যতম কারণ রাসায়নিক মিশ্রিত খাদ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের প্রতিবেদন বলছে, শিশুমৃত্যুর হার বেড়েছে এবং মানুষের প্রত্যাশিত আয়ু কমেছে, যার পেছনে ভেজাল খাদ্যের ভূমিকা বড়। রোগে আক্রান্ত মানুষদের চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্যানুযায়ী, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের পরিবার প্রতিবছর ব্যয় করছে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা।
খাদ্যে ভেজাল মেশানোর কারণে সৃষ্ট এই যে সংকট, এর মূলে রয়েছে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা। আমরা জানি, ২০১৩ সালের খাদ্য নিরাপত্তা আইন, দণ্ডবিধির প্রাসঙ্গিক ধারা ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) প্রতিষ্ঠার পরও কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। জনবল সংকট, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও প্রযুক্তিগত ঘাটতির কারণে বিএফএসএ তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছে না। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই সংস্থাটিও তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশের বাজারে খাদ্য ভেজালের হার ৪০ শতাংশের কাছাকাছি, যা শহরে আরও বেশি। দুধ, মসলা, তেল, মিষ্টি, চিপসÑ এমনকি বোতলজাত পানীয়েও ভেজালের উপস্থিতি ধরা পড়েছে।
মানুষের বেঁচে থাকার জন্য পাঁচটি মৌলিক চাহিদা রয়েছে। যেগুলো নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। খাদ্য মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। অথচ এই খাদ্য নিয়েই চলছে নয়ছয়। কিন্তু খাদ্য নিয়ে এমন অনিয়ম মেনে নেওয়া যায় না। আমরা মনে করি, খাদ্যে ভেজাল মেশানো যেমন অমানবিকতা তেমনি এটি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। যারা জেনে-বুঝে-সজ্ঞানে এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য শুধু দাবি নয়, এটি আমাদের অধিকার। আর এই অধিকার নিশ্চিত করার দায় প্রধানত সরকারের। যে বা যারা এই অপকর্মের সঙ্গ জড়িত, তাদের চরমতম শাস্তিই ভেজালমুক্ত খাবার নিশ্চিত করতে পারে। সেই সঙ্গে আমাদের নিজেদেরও ভেজালের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমে প্রচারসহ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।