× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্লেষণ

যে পরিণতি অনিবার্য ছিল

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৩১ এএম

যে পরিণতি অনিবার্য ছিল

প্রখ্যাত সাংবাদিক-সম্পাদক সানাউল্লাহ নূরীর একটি বিখ্যাত বই ‘যখন সাংবাদিক ছিলাম’। বইটিতে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে তিনি ১৯৭৫ সালের জুলাই-আগস্টে তার তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরের স্মৃতিও বর্ণনা করেছেন। একটি সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের নেতা ছিলেন নূরী ভাই। তাদের গাইড ছিলেন ঢাকাস্থ সোভিয়েত দূতাবাসের তথ্য অফিসার মি. পাভলভ। সফরের এক পর্যায়ে তারা যাচ্ছিলেন পুশকিন সিটিতে। তারা যখন গোর্কি স্ট্রিট অতিক্রম করছিলেন, তখন বিশ্ববিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কি ছিলেন তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু। পাভলভ ম্যাক্সিম গোর্কি সম্পর্কে বলেন, ‘গোর্কি বিশ্বাস করতেন, একটি সমগ্র জনগোষ্ঠী যখন মুক্তিপাগল হয়ে ওঠে, তাদের সেই দুর্নিবার জাগরণকে তখন কোনো শক্তিই রুখতে পারে না। হয়তো ক্ষণিকের জন্য ছাইচাপা দেওয়া যায় একটি বিপ্লবের। কিন্তু চিরকালের জন্য স্তব্ধ করা যায় না। ধ্বংসস্তূপ থেকে আগুনের শতকোটি শিখা হয়ে সে বিপ্লব জ্বলে উঠবেই।’ (পৃষ্ঠা : ২৫০-২৬০)। ম্যাক্সিম গোর্কি যে সময়ে এ মন্তব্য করেছিলেন তখন রাশিয়ায় চলছিল জার সম্রাটদের দুঃশাসন। জার দ্বিতীয় নিকোলাস এমন স্বৈরশাসক ছিলেন যে, তার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করার সাহস বা সাধ্যি কারও ছিল না। সেই প্রচণ্ড প্রতাপশালী শাসক নিকোলাসকেও সপরিবারে পালিয়ে যেতে হয়েছে। ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব সংঘটিত হলে জীবন বাঁচাতে তিনি পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে আশ্রয় নেন। বস্তুত যুগে যুগে স্বৈরশাসকরা রাষ্ট্রশক্তির অপব্যবহার করে জনবিক্ষোভ বা জনবিদ্রোহ সাময়িকভাবে দমিয়ে রাখতে পারলেও একপর্যায়ে এসে তাদের শোচনীয় পরিণতি বরণ করতে হয়। বিশ্বের ইতিহাসে এর ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রয়াত আব্রাহাম লিংকনের অমর উক্তিটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, ‘কিছু মানুষকে সব সময়ের জন্য, আর সব মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখা যায়। কিন্তু সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখা যায় না।’ লিংকনের এ উক্তির যথার্থতা নিয়ে দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ নেই। লক্ষ করলে দেখা যাবে, যেসব শাসক জনগণের ন্যায্য অধিকারকে অস্বীকার করে তাদের ওপর প্রভুত্ব বিস্তার করেছে, তারা জনগণকে হয় কথার ছলনে ভুলিয়ে সেটা করেছে, নয়তো করেছে পেশিশক্তির ব্যবহার করে। তবে পরিণামে এই দুইটির কোনোটাই টেকসই হয়নি, হয়ও না। কথার ইন্দ্রজাল কিংবা শক্তির বেড়াজাল দুটোই একসময় সম্মিলিত জনতা ছিনভিন্ন করে দিয়ে মুক্তির পথ খুঁজে নেয়। আর তখনই পতন হয় স্বৈরশাসকের।

আমরা যদি পৃথিবীর স্বৈরশাসকদের ইতিহাস পাঠ করি, দেখতে পাবÑ তারা ক্ষমতাসীন হয়ে জনগণের মনস্তুষ্টির পরিবর্তে জনগণকে বাধ্য করেছে তাদেরকে তুষ্ট করতে। কোনো কোনো স্বৈরশাসক নিজেকে ঈশ্বরের সমকক্ষ বানিয়ে ফেলেছিলেন। ‘রাজা বা শাসক ঈশ্বরের অবতার’Ñ এমন একটি ধারণা জনমনে প্রোথিত করে দিয়ে তারা নিজেদের ভোগবিলাসের পথকে নিষ্কণ্টক করার চেষ্টা করেছেন। এ কাজে তারা যে একেবারেই সফল হননি তা নয়। কিছুদিন বা কিছুকাল তারা নিজেদের ক্ষমতার চৌহদ্দিকে নিরাপদে রাখতেও সক্ষম হন। তবে আব্রাহাম লিংকনের তত্ত্ব মতেÑ জনগণ একসময় আর বোকা থাকে না, মাথা তুলে দাঁড়ায়। আর তখনই ম্যাক্সিম গোর্কির উক্তিটি অকাট্য সত্য হয়ে দেখা দেয়। 

পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব স্বৈর বা ফ্যাসিবাদী শাসকের ইতিহাস আমরা পড়ি, খেয়াল করলে দেখা যাবে, তাদের সামনে প্রজাদরদি রাজা, সম্রাট কিংবা জনগণের কল্যাণে নিবেদিত রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার পথ কিন্তু খোলা ছিল। তারা ইচ্ছা করলেই সে পথে হেঁটে ইতিহাসে স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে থাকতে পারতেন। কিন্তু তারা বেছে নিয়েছিলেন ভিন্নপথ। জনগণের কল্যাণ নয়, নিজেদের ভোগবিলাসকেই দিয়েছেন প্রাধান্য। আর সে ভোগবিলাসের পথ বাধাহীন করতে রাষ্ট্রক্ষমতাকে মুষ্টিবদ্ধ করার চেষ্টায় ব্রতী হয়েছেন। আর এটা করতে গিয়ে প্রজা কিংবা জনগণের ওপর চালিয়েছেন নিষ্ঠুর নির্যাতন। রাশিয়ার জার, জার্মানির অ্যাডলফ হিটলার, ইতালির মুসোলিনী থেকে শুরু করে ইরানের শাহান শাহ রেজা শাহ পাহলবি, ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস, রুমানিয়ার নিকোলাই চসেস্কু, চিলির অগাস্টো পিনোশে, উগান্ডার ইদি আমিন, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন সবারই সুযোগ ছিল মানবদরদি শাসক হিসেবে বিশ্ব ইতিহাসে স্থান করে নেওয়ার। কিন্তু তারা সে পথে যাননি। বরং জনগণের অধিকারকে হরণ করে মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হয়েছেন। তার ফলও ভোগ করেছেন পরিণামে। কেউ পালিয়ে গিয়ে জীবন রক্ষা করেছেন, আর কেউ ফায়ারিং স্কোয়াডে অথবা ফাঁসির রজ্জুতে প্রাণ দিয়ে জীবনের ঋণ শোধ করে গেছেন। 

এসব ঘটনা যখন পৃথিবীতে ঘটেছে, সবাই ভেবেছেন ভবিষ্যতে হয়তো আর কেউ মানবতাবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে সাহস পাবে না। কিন্তু সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা কাল মার্ক্সের বিখ্যাত উক্তি ‘ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না’কে অভ্রান্ত প্রমাণ করে স্বৈরশাসকরা বারবার একই ভুল করেছে। কাল মার্ক্সের এ উক্তিটি নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ কেউ এটাকে ফ্রেডরিক হেগেলের বলেও উল্লেখ করে থাকেন। তবে উক্তি যারই হোক, এর মর্মার্থ ও যথার্থতা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। জর্জ সায়ান্তনা নামে একজন মার্কিন দার্শনিক এর প্রায় কাছাকাছি উক্তি করেছেন। বলেছেন, ‘যারা অতীত মনে রাখতে পারে না, তাদের অতীতের পুনরাবৃত্তি করতে হয়।’ 

পৃথিবীর বৃহৎ পরিসর ছেড়ে এবার নিজভূমে দৃষ্টি দেওয়া যাক। আমাদের এই ছোট্ট দেশটিতে গত ৫৫ বছরে বহু রাজনৈতিক ওলটপালট হয়েছে। পালাবদল ঘটেছে রাষ্ট্রক্ষমতার। কখনও তা ঘটেছে শান্তিপূর্ণ গণতন্ত্রিক উপায়ে, আবার কখনও রক্তাক্ত কিংবা রক্তপাতশূন্য অভ্যুত্থানে। স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম সরকার বদল হয়েছিল একটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনা-অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। এটা ছিল একটি অকল্পনীয় ঘটনা। কেননা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা মুক্তিযুদ্ধে যিনি ছিলেন ঐক্যের প্রতীক, তাকে হত্যা করবে তারই অনুগত সৈনিকদের একটি অংশ, তা তিনি নিজে যেমন কল্পনা করতে পারেননি, দেশবাসীও ভাবতে পারেননি। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এটা মানতে হবে যে, শেখ মুজিবুর রহমানের মতো বিপুল জনপ্রিয় নেতা আমাদের দেশে এখনও পর্যন্ত আসেননি। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র দুই বছরের মাথায় সেই শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তায় কেন ধস নামল? কারণটি অজানা নয় কারও। স্বীয় ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ ও বিঘ্নহীন করতে একের পর এক গণবিরোধী ভূমিকায় নেমেছিলেন তিনি। দলীয় ও গোষ্ঠী শাসনকে চিরস্থায়ী রূপ দিতে সর্বগ্রাসী একনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি। বিরুদ্ধবাদীদের দমনের লক্ষ্যে হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর অনুরূপ জাতীয় রক্ষীবাহিনী তৈরি করেছিলেন। শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা তখন হিমাঙ্কের একেবারে নিচে। আর স্বাধীনতার স্থপতি হিসেবে জাতির শ্রদ্ধার পাত্র শেখ মুজিব যেদিন নিহত হলেন, কেউ তার জন্য দুই ফোঁটা চোখের পানি ফেলল না। হিমালয় পবর্তসম জনপ্রিয়তার একজন নেতা কীভাবে এতটা অজনপ্রিয় হলেন, সে ব্যাখ্যা রয়েছে ইতিহাসের পরতে পরতে। এখানে শুধু এতটুকই বলব, শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় স্থায়ী হতে চেয়েছিলেন। জনগণের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ার চিন্তা করেননি। যদি তা করতেন বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার প্রশস্ত পথ তার সামনে ছিল। তাহলে আজকের মতো বিতর্কের পাত্র হতেন না। 

শেখ মুজিব যখন নিহত হন, কন্যা শেখ হাসিনা ওয়াজেদ তখন স্বামীর সঙ্গে বিদেশে ছিলেন। পিতার মৃত্যুর প্রায় ছয় বছর পরে দেশে ফিরে দলের নেতৃত্বে আসীন হন। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, পিতার পরিণতি থেকে শিক্ষা নিয়ে কন্যা হয়তো গণতান্ত্রিক আচরণে প্রবৃত্ত হবে। দীর্ঘ একুশ বছর পরে ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা হন সরকারের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু ক্ষমতাসীন হওয়ার পরই তার আচরণে পৃথিবীর স্বৈরশাসকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। দেশব্যাপী সন্ত্রাসীদের গডফাদার সৃষ্টি করে এক ভীতিকর পরিস্থিতির জন্ম দেন তিনি। তবে প্রথম মেয়াদে অতটা বেপরোয়া ছিলেন না শেখ হাসিনা। কিন্তু ২০০৯ সালে চক্রান্তের নির্বাচনী ফলাফলের ভিত্তিতে ক্ষমতাসীন হয়ে মাত্রা ছাড়িয়ে যান তিনি। জুলুম-নির্যাতন, খুন-গুমে হিটলার-মুসোলিনীর কাতারে স্থান নেন। ক্ষমতার দম্ভে এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন যে, পতনের গর্ত চোখের সামনে দৃশ্যমান হলেও তা দেখতে পাননি। তারই অনিবার্য পরিণতি ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন ও ৫ আগস্টের গণভ্যুত্থান। জীবন বাঁচাতে স্বজন-পরিজনসহ দেশ থেকে পালিয়ে যান। অভিযুক্ত হন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে। গত ১৭ নভেম্বর তেমন একটি মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ রায় কবে, কীভাবে কার্যকর হবে, সে প্রশ্ন এখানে অবান্তর। তবে শেখ হাসিনার পতন, পলায়ন ও ফাঁসির দণ্ডে ম্যাক্সিম গোর্কি ও আব্রাহাম লিংকনের উক্তিসমূহের যথার্থতা আবারও প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। 

অথচ তারও সুযোগ ছিল একজন গণতান্ত্রিক নেত্রী ও সরকারপ্রধান হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেওয়ার। কিন্তু তিনি সে সুযোগ হারিয়েছেন। অতিরিক্ত ক্ষমতালিপ্সা ও জিঘাংসার কারণে তিনি আজ পরিগণিত একজন ফ্যাসিস্ট হিসেবে। বলা যায়, শেখ হাসিনার এ পরিণতি অনিবার্য ছিল। 


মহিউদ্দিন খান মোহন

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা