ভূমিকম্প
ড. তানভীর মুশতাফী
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২৮ এএম
পর পর দুই দিন দেশে চার দফা ভূমিকম্পকে কেবল কয়েক সেকেন্ডের একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গত শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর শনিবারের ভূমিকম্পকে বলা যেতে পারে ‘ফোরশক’। বড় ভূমিকম্পের আগে ছোট ছোট যে ভূমিকম্প, এটা সেগুলোর একটি। বাংলাদেশ কম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হলেও ঝুঁকির দিক দিয়ে খুব ওপরে রয়েছে। গত শুক্রবারের ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫.৭ এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে, অর্থাৎ এটি ছিল একটি অগভীর ভূমিকম্প। অগভীর ভূমিকম্প সাধারণত স্বল্পস্থায়ী হলেও কম্পনের তীব্রতা বেশি অনুভূত হয়, এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কেন্দ্রস্থল নরসিংদীর ঘোড়াশাল-মাধবদী এলাকায় হওয়ায়, ঢাকার খুব কাছ থেকেই কম্পনের চাপ সরাসরি শহরে এসে পড়ে এবং তাই রাজধানীজুড়ে ঝাঁকুনি ছিল স্পষ্ট ও শক্তিশালী। পরবর্তী তিনটি ভূকম্পনের উৎপত্তিস্থল রাজধানীর বাড্ডা ও নরসিংদী।
প্রতিটি কম্পনের মুহূর্তে ঢাকার চিত্র প্রায় সর্বত্রই ছিল একরকম। বহুতল ভবন দুলে উঠেছে, জানালা ও আসবাব কেঁপে উঠেছে। আর অফিস, বাসা ও আবাসিক হল থেকে মানুষ আতঙ্কে সিঁড়ি ও রাস্তায় নেমে এসেছে। কোথাও অতিরিক্ত ভিড়ের চাপ, কোথাও তাড়াহুড়োর মধ্যে পড়ে অনেকে আহত হয়েছে। সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী সারা দেশে শিশুসহ দশজন নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে সহস্রাধিক মানুষ। শুধু নরসিংদীতেই আতঙ্কে দৌড়াতে গিয়ে শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। রাজধানীর পুরান অংশে ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অসমাপ্ত বা দুর্বল ভবন থেকে নির্মাণসামগ্রী পড়ে লোকজন আহত হয়েছে; কয়েকটি ভবনে ফাটল, পলেস্তারা খসে পড়া, কোথাও ঝুঁকিপূর্ণভাবে হেলে পড়ার লক্ষণ, এমনকি কোথাও ছোট আগুন লাগার ঘটনাও রিপোর্ট হয়েছে। এসব ঘটনা আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর সত্য স্পষ্ট করে দিয়েছে। মাত্র ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পেই যদি ভবনের অংশ ভেঙে প্রাণহানি ঘটে, তাহলে বড় মাত্রার ভূমিকম্পে আমাদের ভবনসমূহ কতটা নিরাপদ? এ প্রশ্নটি এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
ভূমিকম্প কেন ঘটে, তার ব্যাখ্যা নিহিত আছে টেকটোনিক প্লেটগুলোর দীর্ঘদিনের চলমান সংঘর্ষ ও চাপের ভেতরে। ভারতীয় প্লেট উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে ক্রমাগত ধাক্কা খাচ্ছে। এই সংঘর্ষের ফলেই হিমালয় পর্বতমালা সৃষ্টি হয়েছে এবং ভূগর্ভে শক্তি সঞ্চয়ের প্রক্রিয়াও এখনও অব্যাহত। একই সঙ্গে ভারতীয় প্লেট পূর্ব দিকে সরে গিয়ে মিয়ানমার বা বার্মিজ প্লেটের নিচে ঢুকে পড়ছে, যা ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন অঞ্চল নামে পরিচিত। এই দুই দিকের প্রবল চাপক্ষেত্রের মাঝখানে বাংলাদেশ অবস্থান করায় আমাদের ভূগর্ভে শক্তি জমতে থাকে এবং নির্দিষ্ট সময়ে তা ভূকম্পনের মাধ্যমে মুক্তি পায়। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দাউকি ফল্ট, মধুপুর গড় ফল্ট এবং ইন্দো-বার্মা ভাঁজ অঞ্চল আজও সক্রিয় রয়েছে। ভূতাত্ত্বিকরা বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, এসব সক্রিয় ভঙ্গুর রেখা ভবিষ্যতে বড় মাত্রার ভূমিকম্প ঘটানোর সক্ষমতা রাখে। আজকের ভূমিকম্পের কেন্দ্র নরসিংদীতে হলেও, এটি ওই বিস্তৃত চাপক্ষেত্রেরই একটি প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঢাকা পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ নগরী। এখানে একদিকে বিপুলসংখ্যক পুরনো ভবন রয়েছে, অন্যদিকে নতুন নির্মাণের বড় একটি অংশও যথাযথ নকশা, নির্মাণবিধি ও তদারকির ঘাটতি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। ফলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও দেয়াল, রেলিং কিংবা ছাদের অংশ খুলে পড়ে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঢাকার ভূগর্ভস্থ মাটির প্রকৃতি। শহরের বহু এলাকায় নরম পলিমাটি ও জলাবদ্ধ স্তর বিদ্যমান, যা শক্তিশালী ভূমিকম্পের সময় কম্পনের তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে এবং কিছু এলাকায় মাটির তরলীকরণ ঘটার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উপরন্তু ইতিহাসগতভাবে এই অঞ্চলে ৭ থেকে ৮ মাত্রার বড় ভূমিকম্প ঘটার নজির রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অসম্ভব নয়। সেই প্রেক্ষাপটে আজকের ধাক্কা ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য বিপদের আগাম সতর্ক সংকেত হিসেবেই আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে।
ভূমিকম্পের পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু ছোট আফটারশক ঘটতে পারে। তাই আগামী এক-দুই দিন বাড়তি সতর্কতা বজায় রাখা প্রয়োজন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আতঙ্কের চেয়েও বড় ঝুঁকি তৈরি করে গুজব। ভুয়া বার্তা, সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো অযাচিত পূর্বাভাস বা ভিত্তিহীন সতর্কবাণীর পেছনে না ছুটে কেবল সরকারি ঘোষণা ও নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রের তথ্য অনুসরণ করাই নিরাপদ ও যুক্তিসংগত পথ।
এবারের অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে, ভূমিকম্পের সময় দৌড়াদৌড়ি বা হুড়োহুড়ি পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। সিঁড়িতে অতিরিক্ত ভিড় জমানো কিংবা লিফট ব্যবহারের চেষ্টা প্রাণঝুঁকি বাড়ায়। কম্পনের মুহূর্তে ঘরের ভেতরে থাকলে সবচেয়ে নিরাপদ হলো শক্ত টেবিল বা খাটের নিচে আশ্রয় নিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখা এবং জানালা বা কাচের কাছাকাছি জায়গা থেকে সরে থাকা। আর যদি কেউ বাইরে থাকেন, তাহলে তাকে দ্রুত খোলা জায়গার দিকে সরে যেতে হবে। কারণ ভবন, গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা ঝুলন্ত তার যেকোনো মুহূর্তে ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠতে পারে। আজকের প্রাণহানির বড় অংশই ঘটেছে ভবনের রেলিং কিংবা দেয়াল-ছাদের অংশ ভেঙে পড়ায়। যা এই সতর্কতার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
ঝাঁকুনি থেমে যাওয়ার পর প্রথম দায়িত্বÑ পরিবারের সবাই নিরাপদ আছে কি না নিশ্চিত করা এবং কেউ আহত হলে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া। এরপর গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইনে কোনো লিক, ক্ষতি বা শর্ট সার্কিটের সম্ভাবনা আছে কি না পরীক্ষা করা জরুরি। কোনো ভবনে বড় ধরনের ফাটল, কলাম বা দেয়ালে গভীর দাগ, কিংবা হেলে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা গেলে সেখানে অবস্থান করা নিরাপদ নয়। সে ক্ষেত্রে দ্রুত বাইরে চলে গিয়ে অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর মাধ্যমে ভবন পরীক্ষা করানোই যুক্তিসংগত পদক্ষেপ। জরুরি সহায়তার প্রয়োজন হলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করার সুযোগ রয়েছে।
সামনের দিনের প্রস্তুতি শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, এটি হতে হবে শহর ও রাষ্ট্রব্যাপী সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিক জরিপ জরুরি, যাতে দুর্বল কাঠামোগুলো আগেভাগেই শনাক্ত করা যায়। দ্বিতীয়ত, পুরনো ও নকশাগতভাবে দুর্বল ভবনগুলো রেট্রোফিটিং বা কাঠামোগত শক্তিশালীকরণ ছাড়া বড় কম্পনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তৃতীয়ত, জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা ও যথাযথ তদারকি ছাড়া নতুন নির্মাণ কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করা উচিত। একই সঙ্গে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, বাজার ও আবাসিক এলাকায় নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া চালু না হলে ভবিষ্যতে আতঙ্কই বড় বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এবারের ভূমিকম্পে রাজধানীর ভবনগুলোর কাঁপুনি আমাদের ভয় দেখিয়েছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় সত্য হলো, এটি আমাদের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মাটির নিচে জমে থাকা চাপ থামানো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তবে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই শিরোনামের প্রশ্নটাই সবচেয়ে বাস্তব ও জরুরি। ঢাকায় ৫.৭-এর ধাক্কা হয়েছে, এবার কি শহর সত্যিই প্রস্তুত হবে? প্রস্তুতির সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।‘
ড. তানভীর মুশতাফী
সহযোগী অধ্যাপক, পুরকৌশল ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়